ছবি: সংগৃহীত
গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, 'যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত অভ্যুত্থানমধমর্স্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্। পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম, ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভাবমি যুগে যুগে।' যখন ধর্মের গ্লানি এবং অধর্ম বৃদ্ধি পায়, তাৎপর্যগতভাবে ভগবৎপ্রেমী, ধর্মাত্মা, সদাচারী, নিরপরাধ মানুষদের ওপর নাস্তিক, পাপী, দুরাচার, বলবান ব্যক্তিদের অত্যাচার বৃদ্ধি পায়, তখন আমি আবির্ভূত হই। তখন আমি সাধুদের রক্ষা করি এবং সমাজে ধর্ম সংস্থাপন করি।
হিন্দু পুরাণ অনুসারে, আজ থেকে প্রায় ৫ হাজার ২শ বছর আগে, দ্বাপর যুগে যখন রাজা কংসের অত্যাচারে চারদিকে অরাজকতা, নৃসংশতা, নিপীড়নে মানুষ জর্জরিত, সে সময়ে বাসুদেব ও দেবকীর ঘরে ভূমিষ্ট হন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। দ্বাপর যুগে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথির রোহিণী নক্ষত্রে বাসুদেব-দেবকীর কোলে কংসের কারাগারে জন্মগ্রহণ করেন শ্রীকৃষ্ণ।
অষ্টমী তিথিতে দেবকীর অষ্টম গর্ভে জন্মেছিলেন বলে এই তিথি জন্মাষ্টমী নামে পরিচিত। শ্রীকৃষ্ণ কংসের কারাগারে যখন আবির্ভূত হয়েছিলেন, তখন কংসের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিল রাজ্যবাসী। পৃথিবীকে পাপাভার থেকে মুক্ত করাই ছিল শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের উদ্দেশ্য।
পৌরাণিক কাহিনি মতে, দৈববাণী ছিল, কংসের বোন দেবকীর অষ্টম সন্তানের হাতে তার মৃত্যু হবে, সেটা শুনে তিনি আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। ফলে সে তার বোনের গর্ভে সদ্যভূমিষ্ট প্রতিটি সন্তানকেই নৃশংসভাবে হত্যা করতো।
সবশেষে অধর্মের বিনাশ ঘটাতে জন্ম হয় কৃষ্ণের। তার প্রাণরক্ষার্থে ভগবান বিষ্ণুর নির্দেশ অনুসারে বাসুদেব কৃষ্ণপক্ষের সেই দুর্বার প্রলয়ের রাতে সদ্যভূমিষ্ট সন্তানকে মা যশোদার কাছে রেখে আসেন।
পাশাপাশি মা যশোদার কন্যাকে নিয়ে আসেন। এদিকে দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানের ভূমিষ্ঠ হওয়ার সংবাদ পেয়ে কংস কারাগারে ছুটে আসেন। তারপর যখনই সেই কন্যা সন্তানকে আছাড় মারার উদ্দেশ্যে ঊর্ধ্বে তুলে ধরলেন, তখনই সেই কন্যা মহাশূন্যে ভাসতে ভাসতে বললেন, ‘কংস, তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে!’ এই কন্যাসন্তান ছিলেন স্বয়ং দেবী যোগমায়া।
বেদে বলা হয়েছে, ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়। তিনি নিরাকার, জ্যোতির্ময়, সর্বত্র বিরাজমান এবং সর্বশক্তিমান। বেদজ্ঞ জ্ঞানী মুনিঋষিরা নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনা করে থাকেন। সাধারণ মানুষের পক্ষে নিরাকার ঈশ্বরের উপলব্ধি খুবই কঠিন কাজ।
মহাকাল ও মহাজগৎ ব্যাপ্ত হয়ে যিনি অনন্ত সর্বশক্তিমান সত্তায় শাশ্বত সত্যরূপে বিরাজিত, আমরা তাকেই ভগবান বা ঈশ্বর নামে ডেকে থাকি। ভক্তরা তাকে যে নামে ডাকেন, তিনি সে নামে সাড়া দেন। যেভাবে তাকে পেতে চান, সেভাবেই তিনি ধরা দেন।
তাই তো তিনি দেবকী ও বাসুদেবের আকুল প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে কংসের কারাকক্ষে তাদের সম্মুখে আবির্ভূত হন পুত্ররূপে, কৃষ্ণ নামে। তার জন্মলীলাই জন্মাষ্টমী নামে অভিহিত। তারপর থেকে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম তার ভক্তদের কাছে জন্মাষ্টমী হিসেবে যুগ যুগ ধরে বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়ে আসছে।
আদিকাল থেকেই অন্যায়ের সঙ্গে ন্যায়ের যুদ্ধ চলে আসছে। আর অন্যায় কোনোদিনও টিকতে পারেনি, ইতিহাস তারই সাক্ষ্য বহন করে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জীবনচরিত আমাদের সেই শিক্ষায় দেয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই জন্মতিথিতে আমাদের চাওয়া সমাজ-দেশ থেকে সব অনাচার দূর হোক, সত্য-ন্যায়ের সমাজ প্রতিষ্ঠিত হোক।
খবরটি শেয়ার করুন