ফাইল ছবি (সংগৃহীত)
ইরানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলায় ধূলিসাৎ হয়ে গেছে তেহরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি থেকে শুরু করে সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ, প্রতিরক্ষামন্ত্রীসহ ইরানের প্রথম সারির অন্তত ৩০ শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত। তথ্যসূত্র: বিবিসি, আল জাজিরা ও জেরুজালেম পোস্টের।
নেতৃত্বের এ বিশাল শূন্যতা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন স্থাপনা ও ইসরায়েলে হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছে ইরান। প্রশ্ন উঠেছে, প্রথম ও দ্বিতীয় সারির অধিকাংশ নেতা নিহত হওয়ার পরও কীভাবে এখনো সচল রয়েছে ইরানের যুদ্ধযন্ত্র?
যেখানে পুরো কমান্ড চেইন বা নেতৃত্বই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, সেখানে ইরান কীভাবে এত সুসংগঠিতভাবে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে?
তেহরানভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক হোসেন রায়ভারান বলেন, ‘রোববারের (১লা মার্চ) হামলায় ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা স্তরের প্রায় সবাইকে হারিয়েছে দেশটি। কিন্তু ইরানের এ সিস্টেমটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এটি পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক।’
তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে একটি অটোপাইলট মোডে চলে গেছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন বা নিঃশেষ হয়েও যায়, তবুও সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো আগে থেকে নির্ধারিত প্রটোকল অনুযায়ী কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম। এ সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কারণেই শীর্ষ নেতৃত্বের মৃত্যু সত্ত্বেও কমান্ড চেইনে কোনো বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়নি।’
সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো আব্বাস আসলানির মতে, ‘পরবর্তী ধাপে ইরান এমন কিছু সামরিক সক্ষমতা বা মারণাস্ত্র ব্যবহার করতে পারে, যা আগে কখনই ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়নি। অর্থাৎ, শীর্ষ নেতাদের হারিয়ে ইরান এখন আরো বেশি বেপরোয়া ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এ টিকে থাকার লড়াই কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং এটি তাদের কয়েক দশকের সুপরিকল্পিত যুদ্ধ কৌশলের ফল। ইরান বছরের পর বছর ধরে তাদের সামরিক শক্তিকে এমনভাবে সাজিয়েছে যেন শিরশ্ছেদ হলেও শরীরের বাকি অংশ সচল থাকে।
একে বলা হয় ‘মোজাইক ডিফেন্স’। এ মডেলে তেহরানের কেন্দ্রীয় নির্দেশের ওপর নির্ভর না করে দেশের প্রতিটি অঞ্চলের সামরিক ইউনিটগুলো স্বাধীনভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে। ফলে খামেনি বা সামরিক বাহিনীর প্রধানের মৃত্যুতেও মাঠ পর্যায়ের কমান্ডাররা বিচলিত হননি।
বরং দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির যে তরুণ ও কট্টরপন্থী অফিসাররা লাইমলাইটের আড়ালে ছিলেন, তারা এখন সরাসরি ফ্রন্টলাইনে চলে এসেছেন। তাদের জন্য এ মৃত্যু প্রতিশোধের ইন্ধন।
সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো ইরানের ‘ক্ষেপণাস্ত্র শহর’ বা মিসাইল সিটিগুলো। তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ ভবন বা সামরিক সদর দপ্তরগুলো মাটির ওপরে হওয়ায় সেগুলো মার্কিন বোমারু বিমানের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ইরানের আসল শক্তি লুকিয়ে আছে পাহাড়ের শত শত ফুট গভীরে তৈরি বিশাল টানেল নেটওয়ার্কে।
সেখানে ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন মজুদ রাখা হয়েছে। তেহরানের প্রধান দপ্তরে হামলা হলেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি থেকে মোবাইল লঞ্চার বের করে নিয়মিত বিরতিতে হামলা চালানো হচ্ছে।
এ অপারেশনগুলো পরিচালনা করছেন এমন কিছু কমান্ডিং অফিসার, যারা হয়তো কোনোদিন প্রচারণায় ছিলেন না। কিন্তু এ পরিস্থিতির জন্যই যাদের দীর্ঘকাল ধরে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ধারণা করেছিল, শীর্ষ নেতৃত্বের পতনে এ নেটওয়ার্কগুলো অচল হয়ে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ফার্স্ট বা সেকেন্ড টায়ারের নেতারা না থাকলেও থার্ড টায়ারের কমান্ডাররা আরো আগ্রাসীভাবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছেন। খামেনির মৃত্যুর খবর তাদের কাছে একটি ‘সর্বাত্মক যুদ্ধের’ অলিখিত ঘোষণা হিসেবে কাজ করেছে।
এমনকি খামেনি নিজেও এ সংকটের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তার ‘মাস্টারপ্ল্যান’ অনুসারে চার-স্তরের উত্তরাধিকার ব্যবস্থা ছিল। প্রথম স্তরে তার ছেলে মোজতাবা খামেনি, দ্বিতীয় স্তরে আইআরজিসির রক্ষণশীলতা, তৃতীয় স্তরে এক্সপার্ট কাউন্সিল এবং চতুর্থ স্তরে লোকাল গার্ডিয়ান কাউন্সিল।
এ পরিকল্পনা শীর্ষ ৩০ জন নেতার মৃত্যুর পরও কার্যকর হয়েছে। ফলে কোনো পাওয়ার ভ্যাকুয়াম তৈরি হয়নি। এ পরিকল্পনা ইরানকে ‘হেডলেস চিকেন’ থেকে ‘হাইড্রা’ বানিয়েছে—একটা মাথা কাটলে আরো উঠে আসে।
মূলত আইআরজিসির রক্ষণশীল সদস্যরা এ যুদ্ধের প্রকৃত চালক। এই গ্রুপটি খামেনির মৃত্যুর পর টেলিগ্রাম চ্যানেলে ঘোষণা করে, ‘যুদ্ধ শুরু হয়েছে, ইতিহাসের সবচেয়ে ভারী অফেনসিভ আসছে।’ হামলার তীব্রতা বেড়েছে কারণ আইআরজিসির প্রতিটি প্রদেশীয় ইউনিট নিজস্বভাবে অপারেট করে।
উদাহরণস্বরূপ, খোরাসান প্রভিন্সের ব্রিগেড ইরাকের মার্কিন বেজে হামলা চালাল, যখন ফারস প্রভিন্সের ইউনিট সংযুক্ত আরব আমিরাতে টার্গেট নেয়। এতে প্রতিপক্ষ বিভ্রান্ত হয়, কারণ কোনো কেন্দ্রীয় কমান্ড নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব ডিফেন্স মাইকেল মুলরয় আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীগুলো এমনভাবে প্রশিক্ষিত যে তারা চরম বিপদেও নিজেদের সংহতি বজায় রাখতে পারে।’
মুলরয়ের ভাষায়, ‘যদি কথা বলার মতো একজন কর্মকর্তাও বেঁচে থাকেন, তবে বুঝতে হবে সে শাসন ব্যবস্থা এখনো টিকে আছে। কেবল আকাশ থেকে বোমা ফেলে একটি আদর্শিক রাষ্ট্রকাঠামোকে উপড়ে ফেলা যায় না।’
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন