শুক্রবার, ২৫শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১০ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** সমুদ্রের উচ্চতার সঙ্গে সংকল্প আরও দৃঢ় হোক, পদক্ষেপ তার চেয়ে দ্রুত: বিশ্বনেতাদের তারেক রহমান *** নিউইয়র্কে তারেক রহমান, সেখানেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সঙ্গে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বৈঠক *** এশিয়ান গেমসের সেমিফাইনালে বাংলাদেশের দ্রুততম মানব *** রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি রাকিবুল ৫ দিনের রিমান্ডে *** জাতিসংঘে খলিলুরের কার্যালয়ে লিগ্যাল অফিসার হলেন জাইমা রহমান *** বিশ্বের বৃহত্তম মুক্তবাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার পথে বাংলাদেশ *** ৯৮ কমিটি থেকে ‘আওয়ামীপন্থীদের’ বাদ দেওয়ার নির্দেশ, কী বদল আসছে সরকারি কমিটিতে *** মূল আসামিকে আড়াল করায় স্বজনদের ক্ষোভ, জানেন না আপসের বিষয়ও *** জাতিসংঘে শুক্রবার ভোররাত ৩টায় বাংলায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী *** বিকাশ, রবিসহ চার প্রতিষ্ঠান পেল ডিজিটাল ব্যাংকের প্রাথমিক অনুমোদন

পাঠকপ্রিয় সেবা প্রকাশনীর কার্যক্রম যে কারণে সাময়িক স্থগিত

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০২:০৬ পূর্বাহ্ন, ১৪ই মে ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

দেশের ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সেবা প্রকাশনীর সব কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল বুধবার (১৩ মে) সেবা প্রকাশনীর মালিকপক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। জনপ্রিয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়ার ঘোষণায় পাঠকমহলে বিস্ময় ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সামনে আসছে নানা প্রশ্ন।

দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যের একটি বড় অংশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানটির এমন পরিস্থিতি শুধু একটি ব্যবসায়িক সংকট নয়, বরং দেশের পাঠকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অনিশ্চয়তার প্রতীক বলেও মনে করছেন অনেকে।

বুধবার সেবা প্রকাশনীর পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সব ধরনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হচ্ছে।

বিজ্ঞপ্তিতে সেবা প্রকাশনীর অংশীদার কাজী শাহনূর হোসেন বলেন, “সেবা প্রকাশনীতে অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অনিয়ম–দুর্নীতির বিষয়টি সম্প্রতি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এমতাবস্থায় অডিট কার্যক্রম নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার স্বার্থে সেবা প্রকাশনীর সমস্ত কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হচ্ছে।”

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটির এই সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু প্রশাসনিক জটিলতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের অদৃশ্য সংকটও কাজ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিশেষ করে ২০২২ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠাতা কাজী আনোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। তার অনুপস্থিতিতে ব্যবস্থাপনা, প্রকাশনা পরিকল্পনা এবং বিক্রয় কাঠামোর দুর্বলতা ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসতে থাকে।

সেবা প্রকাশনীর উপদেষ্টা মাসুমা মাইমুর বুধবার গণমাধ্যমকে জানান, পারিবারিকভাবে আলোচনা করেই কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এর পেছনে কোনো পারিবারিক দ্বন্দ্ব বা সংঘাত নেই।

তিনি বলেন, কাজী মাইমুর হোসেন অসুস্থ রয়েছেন এবং বড় ভাই কাজী শাহানূর হোসেন অত্যন্ত সহজ–সরল মানুষ হওয়ায় তার অগোচরে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন।

মাসুমা মাইমুরের দাবি, প্রায় ছয় মাস ধরে গোপনে অনুসন্ধান চালিয়ে তারা দেখতে পান, বাংলাবাজারের বিক্রয়কেন্দ্রসহ বিভিন্ন বিক্রয়কেন্দ্রে বই বিক্রির অর্থ যথাযথভাবে জমা করা হচ্ছিল না। কৌশলে অর্থ সরিয়ে ফেলার অভিযোগও তোলা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন নতুন প্রকল্পও অনিয়মের কারণে ব্যর্থ হচ্ছিল বলে অভিযোগ করা হয়। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পরিবার আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ইতিমধ্যে রাজধানীর রমনা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেবা প্রকাশনীর মতো প্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ শুধু ব্যবসায়িক সমস্যা নয়, এটি দেশের জনপ্রিয় প্রকাশনা শিল্পের দুর্বল ব্যবস্থাপনারও প্রতিফলন। বহু বছর ধরে ব্যক্তি–নির্ভর কাঠামোয় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে উত্তরাধিকার ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার প্রশ্নটি প্রায়ই সংকট তৈরি করে। সেবা প্রকাশনীর বর্তমান পরিস্থিতিও সেই বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেক পাঠকই এটিকে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট হিসেবে নয়, বরং তাদের শৈশব–কৈশোরের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আবেগের অনিশ্চয়তা হিসেবে দেখছেন। ফেসবুকে মাহির রহমান নামে এক পাঠক লিখেছেন, “সেবা প্রকাশনী বন্ধ হওয়ার খবর শুনে মনে হচ্ছে কৈশোরের একটা দরজা যেন হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। মাসুদ রানা, কুয়াশা, অনুবাদ সিরিজ—সব মিলিয়ে একটা সময়কে বহন করত প্রতিষ্ঠানটি।”

আরেক পাঠক সাদিয়া তাসনীম মন্তব্য করেন, “বাংলাদেশে পাঠক তৈরির ক্ষেত্রে সেবা প্রকাশনীর অবদান অনস্বীকার্য। অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে দ্রুত তদন্ত হওয়া উচিত।” তবে কেউ কেউ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সমালোচনাও করেছেন। আরিফুল কবির নামে একজন লেখেন, “প্রতিষ্ঠাতা–নির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোতে পেশাদার ব্যবস্থাপনা না থাকলে এমন সংকট তৈরি হবেই। সেবা প্রকাশনীর ঘটনাও তার ব্যতিক্রম নয়।”

আবার অনেকে আশা প্রকাশ করেছেন, অডিট ও তদন্ত শেষে নতুন কাঠামোয় সেবা প্রকাশনী আবারও পাঠকদের কাছে ফিরবে। কারণ, বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্য ও অনুবাদ সাহিত্যের ইতিহাসে প্রতিষ্ঠানটির প্রভাব এতটাই গভীর যে সেটিকে সহজে বিচ্ছিন্ন করে দেখা সম্ভব নয়।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, সেবা প্রকাশনীর বর্তমান সংকট দেশের প্রকাশনা শিল্পের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। ডিজিটাল বিনোদনের যুগে যখন বইপড়ার অভ্যাস ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ, তখন জনপ্রিয় একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক দুর্বলতা গোটা শিল্পের জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দেয়, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠানগুলো টিকিয়ে রাখতে সৃজনশীলতার পাশাপাশি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনাও কতটা জরুরি।

দেশে জনপ্রিয় পেপারব্যাক বইয়ের বাজার তৈরিতে সেবা প্রকাশনীর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদ, রহস্য–রোমাঞ্চ সিরিজ, কিশোর সাহিত্য এবং গোয়েন্দা কাহিনির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি কয়েক প্রজন্মের পাঠকের পাঠাভ্যাস গড়ে তুলেছে। বিশেষ করে ‘মাসুদ রানা’ সিরিজ বাংলা সাহিত্যে জনপ্রিয় সংস্কৃতির একটি অনন্য অধ্যায় হয়ে আছে।

পাঠকনন্দিত গুপ্তচর চরিত্র ‘মাসুদ রানা’র স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন ২০২২ সালের ১৯ জানুয়ারি মারা যান। কাজী আনোয়ার হোসেন একই সঙ্গে লেখক, অনুবাদক ও প্রকাশক ছিলেন। সেবা প্রকাশনীর কর্ণধার হিসেবে তিনি ষাটের দশকের মধ্যভাগে ‘মাসুদ রানা’ নামক গুপ্তচর চরিত্র সৃষ্টি করেন। এর কিছু আগে ‘কুয়াশা’ নামের আরেকটি জনপ্রিয় চরিত্র তার হাতেই জন্ম নিয়েছিল। ‘বিদ্যুৎ মিত্র’ ও ‘শামসুদ্দীন নওয়াব’ ছদ্মনামেও বই লিখেছেন তিনি।

দেশে পেপারব্যাক বই প্রকাশের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল সেবা প্রকাশনী। এই প্রকাশনী পাঠকদের হাতে স্বল্পমূল্যে তুলে দিয়েছে বিশ্বসাহিত্যের বিখ্যাত সব উপন্যাসের অনুবাদ। ১৯৬৬ সালে বিদ্যুৎ মিত্র ছদ্মনামে মাসুদ রানার প্রথম বই ‘ধ্বংস পাহাড়’ প্রকাশ করেন কাজী আনোয়ার হোসেন।

অভাবনীয় জনপ্রিয়তা পায় সে বই। এরপর তরুণ প্রজন্মের পাঠকদের কাছে আইকন হয়ে ওঠে মাসুদ রানা চরিত্র। অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে সাড়ে চার শতাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে এ সিরিজের।

কাজী আনোয়ার হোসেন গানও গাইতেন। ছিলেন বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পীও। যদিও পরে সে পেশা ছেড়ে দেন। এ ছাড়া ১৯৭৪ সালে শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার ও সংলাপ রচয়িতা হিসেবে বাচসাস পুরস্কার পান। পেয়েছেন ‘সিনেমা’ পত্রিকা ও জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কারও। তার জন্ম ১৯৩৬ সালের ১৯ জুলাই, ঢাকায়। তার বাবা প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন, মা সাজেদা খাতুন।

১৯৬৩ সালে কাজী আনোয়ার হোসেন প্রথমে সেগুনবাগিচায় প্রেসের ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৬৪ সালের জুনে প্রকাশিত হয় সেগুনবাগান প্রকাশনীর প্রথম বই ‘কুয়াশা-১’। পরে প্রকাশনীর নাম পাল্টে হয় সেবা প্রকাশনী।

এখন পাঠকদের অপেক্ষা—অডিট ও তদন্ত শেষে সেবা প্রকাশনী সত্যিই নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে কি না। কারণ, কয়েক প্রজন্মের পাঠকের কল্পনার জগৎ তৈরি করা এই প্রতিষ্ঠান শুধু একটি প্রকাশনা সংস্থা নয়; দেশের জনপ্রিয় সাহিত্য–সংস্কৃতির ইতিহাসে এটি এক অনন্য নাম।

সেবা প্রকাশনী

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

সমুদ্রের উচ্চতার সঙ্গে সংকল্প আরও দৃঢ় হোক, পদক্ষেপ তার চেয়ে দ্রুত: বিশ্বনেতাদের তারেক রহমান

🕒 প্রকাশ: ০৩:০৩ পূর্বাহ্ন, ২৫শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিউইয়র্কে তারেক রহমান, সেখানেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সঙ্গে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বৈঠক

🕒 প্রকাশ: ০২:৩২ পূর্বাহ্ন, ২৫শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

এশিয়ান গেমসের সেমিফাইনালে বাংলাদেশের দ্রুততম মানব

🕒 প্রকাশ: ১০:২১ অপরাহ্ন, ২৪শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি রাকিবুল ৫ দিনের রিমান্ডে

🕒 প্রকাশ: ১০:০৮ অপরাহ্ন, ২৪শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘে খলিলুরের কার্যালয়ে লিগ্যাল অফিসার হলেন জাইমা রহমান

🕒 প্রকাশ: ১০:০৩ অপরাহ্ন, ২৪শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

Footer Up 970x250