বুধবার, ২৮শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১২ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আর্জি জানিয়ে জাতিসংঘে আওয়ামী লীগের চিঠি *** মানিক পশারীর জানাজা-দাফনে বাধার অভিযোগ তদন্তে জামায়াতের কমিটি *** তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা জাপান প্রধানমন্ত্রীর *** রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার: জাতিসংঘের প্রতিবেদন *** মাও সেতুংকে নিয়ে মন্তব্যের জেরে ক্ষমা চাইলেন এমবাপ্পে, দুঃখ প্রকাশ লা লিগার *** আইজিপির বক্তব্য সরকারের জন্য বিব্রতকর: রিজভী *** বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমকে সমর্থন করে না সরকার: তথ্য উপদেষ্টা *** ‘ক্রসফায়ারের’ ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স, আইজিপির বক্তব্য ঠিক হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী *** শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে মবের শিকার হবেন না: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা *** আওয়ামী লীগের যারা ভালো মানুষ, তারা আপন ঠিকানা খুঁজে নেবেন: জামায়াত আমির

কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আর্জি জানিয়ে জাতিসংঘে আওয়ামী লীগের চিঠি

প্রণব সাহা

🕒 প্রকাশ: ১২:১৩ পূর্বাহ্ন, ২৮শে অক্টোবর ২০২৬

#

ফাইল ছবি

আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের কাছে চিঠি দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা। নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা, দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে চলমান মামলা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরে তিনি জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ালের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ওয়ালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতিসংঘের তিনজন বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো চিঠিতে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়ে প্রকাশ্য বিবৃতি দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। চিঠিতে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় মানবাধিকার সুরক্ষা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক ও ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করে ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লি থেকে ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে যুক্ত হয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় বিদেশি সংবাদদাতাদের সংগঠনের এক অনুষ্ঠানে তিনি দেশে ফেরার ঘোষণা দেন। এর আগে ১০ জুলাই বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন, তিনি ও তার দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন। তবে দেশে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ ও বিস্তারিত কর্মসূচি তিনি তখন জানাননি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও তিনি ফেরার বিষয়ে অনড় থাকার কথা জানিয়েছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। এরপর থেকে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। তার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম, নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং দলটির নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্ন দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।

২০২৫ সালের ১২ মে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধিত বিধানের আওতায় আওয়ামী লীগ এবং দলটির সহযোগী, ভ্রাতৃপ্রতিম ও সমমনা সংগঠনগুলোর সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান বিচারপ্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। এর আওতায় গণমাধ্যমে প্রকাশনা ও প্রচার, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা, মিছিল, সভা, সমাবেশ এবং সম্মেলন নিষিদ্ধ করা হয়।

একই দিন নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে। ফলে দলটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পাশাপাশি নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও বাধার মুখে পড়ে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে হত্যাকাণ্ড, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ গুরুতর অপরাধের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে সে সময় সরকারি প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।

পরবর্তী সময়ে নিষেধাজ্ঞাটি শুধু অন্তর্বর্তী সরকারের আদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল পাসের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখার বিধানকে আইনি ভিত্তি দেওয়া হয়। সংসদ অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ অনুমোদন করে। ফলে দলটির কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে।

দ্য ওয়ালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানো চিঠিতে শেখ হাসিনা নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা এবং পরবর্তী সময়ে সেটিকে আইনি ভিত্তি দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তার দাবি, আওয়ামী লীগকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়ায় নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি। দলটির সমর্থকদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ সীমিত হওয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও চিঠিতে দাবি করা হয়েছে।

কারো কারো মতে, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে শেখ হাসিনার এই বক্তব্য তার রাজনৈতিক অবস্থান ও অভিযোগের অংশ। নির্বাচন এবং আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের প্রশ্নে সরকারের অবস্থান, আইনি প্রক্রিয়া ও দলটির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অপরাধের অভিযোগ—এসব বিষয় পৃথকভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আবেদন জানিয়ে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের কাছে চিঠি পাঠানোর বিষয়টি নিজে থেকে নিষেধাজ্ঞা বাতিল বা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নয়।

চিঠিতে আরও দাবি করা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার কারণে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ, অভিযোগের প্রতিকার চাওয়া এবং আদালতে আইনি লড়াই চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। দলটির সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগও এতে তুলে ধরা হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞার আইনগত বৈধতা ও আনুপাতিকতা নিয়ে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে বলে ওয়ালের প্রতিবেদনে বলা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চিঠিতে দেশের সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের আলোকে মতপ্রকাশ, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠন করার স্বাধীনতার প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে সংবিধানের অনুচ্ছেদগুলোর বিষয়ে চিঠিতে কী ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক বিধানগুলোর সঠিক উল্লেখ গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার, ৩৮ অনুচ্ছেদে সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক ও বাক্‌স্বাধীনতার বিষয় রয়েছে। ২৫ অনুচ্ছেদে আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও সংহতি উন্নয়নের নীতির কথা বলা হয়েছে। ফলে নিষেধাজ্ঞা সংবিধানের কোন বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সে বিষয়ে চিঠির বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট আইনি ব্যাখ্যা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টাররা নির্দিষ্ট মানবাধিকার বিষয়ে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। তারা বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন, অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারকে প্রশ্ন বা যোগাযোগ পাঠাতে পারেন এবং তাদের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করেন। তবে তাদের কাছে চিঠি পাঠানো মানেই সংশ্লিষ্ট অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হওয়া বা কোনো দেশের আইন বাতিল হয়ে যাওয়া নয়।

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পটভূমিতে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে প্রাণহানি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ওই সময়ের ঘটনাবলি নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন বলে অনুমান করা হয়। এতে বলা হয়, নিহতদের বড় অংশ নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান। হাজারো মানুষ আহত হন।

জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন সরকার, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সহিংস ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি এসব ঘটনার কিছু ক্ষেত্রে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে উল্লেখ করে আরও তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা জানায়। একই সঙ্গে প্রতিবাদকারীদের ওপর দমন-পীড়ন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বিচার গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তের সুপারিশ করা হয়। এসব পর্যবেক্ষণ ছিল জাতিসংঘের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ফলাফল; নির্দিষ্ট ব্যক্তির ফৌজদারি দায় নির্ধারণের বিষয়টি বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।

অন্যদিকে, শেখ হাসিনা ৫ আগস্টের ভার্চ্যুয়াল অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সংলাপ ও পুনর্মিলনের প্রস্তাব দেওয়ার কথাও বলেছেন বলে দ্য ওয়ালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক বিরোধ মেটাতে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন এবং সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার গুরুত্বপূর্ণ। তবে তারেক রহমান সরকারের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কোনো সিদ্ধান্তের কথা ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে জাতিসংঘের সহায়তা চাওয়ায় দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, বিচারপ্রক্রিয়া এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্ন আবারও আলোচনায় এসেছে। শেখ হাসিনার চিঠির বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এবং বাংলাদেশ সরকারের পরবর্তী অবস্থান জানা গেলে বিষয়টির অগ্রগতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।

শেখ হাসিনা

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250