ছবি: সংগৃহীত
ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। আজ রোববার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠককে ঘিরে দুই পক্ষের কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনার বিষয়বস্তু প্রকাশ করেনি। তবে বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সংক্ষিপ্ত বক্তব্য এবং ভারতীয় হাইকমিশনারের আলাদা কিছু মন্তব্যে আগামী দিনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর একটি বার্তা স্পষ্ট হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, আগামীকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করবেন ভারতীয় হাইকমিশনার। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানিয়েছে, সকাল ১১টায় সচিবালয়ে ওই বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে রোববার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হাইকমিশনারের বৈঠককে কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখছেন না কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে এই বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থান বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রোববার দুপুরে রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রে শিশুদের জন্য একটি খেলার জায়গা উদ্বোধন করেন দীনেশ ত্রিবেদী। সেখানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সমস্যার সমাধান হয় যখন দুই পক্ষ কথাবার্তা বলে। তার ভাষায়, দুই দেশের নেতাদের মধ্যে আলোচনা হলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জনবান্ধব নেতা হিসেবেও উল্লেখ করেন এবং বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সম্মান করে।
দীনেশ ত্রিবেদীর এই বক্তব্যের তাৎপর্য রয়েছে। কারণ গত কয়েক দিন ধরে শেখ হাসিনাকে ঘিরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে প্রকাশ্য অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। ৫ আগস্ট দিল্লিতে আয়োজিত এক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বক্তব্য দেন। ওই অনুষ্ঠানকে ঘিরে বাংলাদেশ আগেই ভারতের কাছে উদ্বেগ জানিয়েছিল। দেশের গণমাধ্যমকে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার না করার জন্যও সরকারের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছিল। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারেক রহমান সরকার ওই বক্তব্য প্রচার না করার অনুরোধ জানায় এবং ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের একটি আদালতের নির্দেশের কথাও উল্লেখ করে।
অন্যদিকে নয়াদিল্লি শুরু থেকেই বলে আসছে, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, দিল্লির পররাষ্ট্রসংক্রান্ত সাংবাদিকদের একটি বেসরকারি সংগঠন অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছে এবং ভারত সরকার এতে কোনো ভূমিকা রাখছে না। একই সঙ্গে অনুষ্ঠানে প্রকাশিত কোনো বক্তব্যের সঙ্গেও ভারতের সরকারি অবস্থানকে এক করে দেখার সুযোগ নেই বলে জানানো হয়।
শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট দিল্লির ওই আয়োজনে বক্তব্য দেন। রয়টার্স জানিয়েছে, তিনি আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান এবং ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। বর্তমান সরকার ও তার বিরুদ্ধে চলমান বিচারপ্রক্রিয়াকে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও দাবি করেন। বাংলাদেশ সরকার ওই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে এবং বিষয়টিকে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর বলে অভিহিত করে।
এই ঘটনার আগে থেকেই শেখ হাসিনাকে নিয়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে একটি জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। এরপর বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণের জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানায়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জুলাইয়ে জানায়, বাংলাদেশের অনুরোধ তারা পেয়েছে এবং বিষয়টি আইনগত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
এর মধ্যেই জুলাইয়ে শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানান। বাংলাদেশের সরকারও বলেছে, তিনি দেশে ফিরলে তাকে আইনগত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদুর রহমান বলেছিলেন, সরকার তাকে ফেরত আনার চেষ্টা করছে এবং তিনি দেশে ফিরলে তাকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
তবে শেখ হাসিনা এখনো ভারতে অবস্থান করায় তার রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে ঢাকার উদ্বেগ কাটেনি। এপ্রিলেই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নয়াদিল্লিকে অনুরোধ করা হয়েছিল, ভারতের মাটি ব্যবহার করে শেখ হাসিনা যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার মতো কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারেন। একই সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করসহ শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
তারপরও দুই দেশের সম্পর্ক পুরোপুরি মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায়নি। বরং দুই পক্ষই বিভিন্ন সময়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহের কথা জানিয়েছে। জুনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছিলেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা ও কার্যকর সম্পর্ক চায়, তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে।
এর আগে মে মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার প্রত্যাশা প্রকাশ করেন। তিনি ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও পারস্পরিক স্বার্থের বন্ধনে আবদ্ধ বলে উল্লেখ করেন এবং জনগণকেন্দ্রিক সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ জানান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও জবাবে পারস্পরিক সম্মান, বন্ধুত্ব ও সদিচ্ছার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে বিএনপির বড় জয় এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা এসেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে দুই দেশের শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেন।
অর্থাৎ, একদিকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, তার ভারতে অবস্থান এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য—অন্যদিকে বাণিজ্য, সীমান্ত, যোগাযোগ, পানি, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ—এই দুই বাস্তবতার মধ্যেই ঢাকা-দিল্লির বর্তমান সম্পর্ক এগোচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো, শেখ হাসিনার ইস্যুতে নিজের অবস্থান স্পষ্ট রেখেও ভারতের সঙ্গে বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে অচল হতে না দেওয়া।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশও এ কথাই বলছেন। চলতি বছরের শুরুতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারতের সংবাদপত্র দ্য হিন্দুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, শেখ হাসিনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্ক একটি মাত্র ইস্যুর কাছে জিম্মি হওয়া উচিত নয়। বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতাসহ বৃহত্তর সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পক্ষেও তিনি মত দেন।
এই বাস্তবতায় ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর ‘কথাবার্তার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান’ বক্তব্যটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এটি সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে ভারতের অবস্থান পরিবর্তনের ঘোষণা নয়। বরং সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর আলোচনার পথ খোলা রাখার কূটনৈতিক ইঙ্গিত হিসেবে এটিকে দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে তিনি যখন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য আলোচনার কথা তুলে ধরে বলেছেন, নেতাদের মধ্যে কথা হলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়, তখন বোঝা যায়—নয়াদিল্লিও সম্পর্ককে শুধু শেখ হাসিনা ইস্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না।
সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠক তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেখানে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্য ও ভারতের মাটিতে তার রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়টি উঠতে পারে। একই সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ককে স্বাভাবিক ও কার্যকর পর্যায়ে নেওয়ার পথ নিয়েও আলোচনা হতে পারে। আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনার বিষয়বস্তু প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন। তবে রোববারের বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য এবং হাইকমিশনারের ‘কথাবার্তার মাধ্যমে সমাধান’ খোঁজার বার্তা থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে, দুই দেশই যোগাযোগের দরজা খোলা রাখতে চাইছে।
কারণ ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্পর্ক নয়। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ, পানি বণ্টন, জ্বালানি, নিরাপত্তা ও মানুষের যাতায়াতের মতো বহুস্তরীয় স্বার্থ জড়িত। জুনে ভারতের নতুন হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. শাহাবুদ্দিনও বলেছিলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত মর্যাদা, সমতা, জাতীয় স্বার্থ ও জনকল্যাণ। একই বৈঠকে সীমান্তসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নিয়মিত যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে।
তাই শেখ হাসিনাকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য বড় পরীক্ষা হলেও এটিই পুরো সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে—এমনটা এখনই বলা যাচ্ছে না। বরং সোমবারের বৈঠক থেকে বোঝা যেতে পারে, ঢাকা ও নয়াদিল্লি এই সংকটকে কতটা রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ দেয় এবং কতটা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রত্যাশা স্পষ্ট—ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু তা হবে সমতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। আর ভারতের পক্ষ থেকেও সাম্প্রতিক সময়ে বারবার এসেছে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা। ফলে শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অস্বস্তির মধ্যেও দুই দেশের মধ্যে যে যোগাযোগের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, রোববারের বৈঠক এবং সোমবারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, কথাবার্তার সেই পথ বাস্তবে কতটা উত্তেজনা কমাতে পারে এবং ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতায় কোন দিকে নিয়ে যায়।
খবরটি শেয়ার করুন