প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ক্ষতিগ্রস্ত ভবন। ছবি: সংগৃহীত
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম অগ্রসেনানী শরিফ ওসমান হাদির অকালমৃত্যুতে জনরোষকে কাজে লাগিয়ে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পক্ষে থাকা ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দিয়েছে একটি বিশেষ মহল।
বিষয়টিকে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচাল করতে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির আরেকটি অপচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করছেন তিনি। তার আক্ষেপ, অতীতেও ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো বিভিন্ন মহলের হুমকির মুখে পড়েছে, কিন্তু সেসব ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হয়নি।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের শিথিল মনোভাব আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। তবে ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিতে ডেইলি স্টারের অঙ্গীকার অব্যাহত এবং স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার প্রতি পত্রিকাটির নিষ্ঠা অবিচল থাকবে বলেও তিনি জানান।
হামলা, অগ্নিসংযোগের বিষয়ে প্রথম আলোর কর্তৃপক্ষ আজ যে বক্তব্য দিয়েছে পত্রিকাটির ওয়েবসাইটে, এতেও বলা হয়েছে, পত্রিকাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সংগঠিত আক্রমণের শিকার হয়েছে। এতে বলা হয়, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে শুধু আগামী নির্বাচনকে পথভ্রষ্ট করার প্রচেষ্টাই চালানো হয়নি, বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক পরিসরে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করারও লক্ষ্য ছিল।
প্রথম আলোর বক্তব্যে একই রাতে দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়েও সন্ত্রাসী আক্রমণ, ভাঙচুর ও অগ্নি–সংযোগের নিন্দা জানানো হয়। পত্রিকা দুটির বক্তব্যে নির্বাচন বানচালকারী গোষ্ঠী, বা 'বিশেষ মহল' সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলার মাধ্যমে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বানচালের ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসও এক বক্তব্যে সম্প্রতি এমনটি জানিয়েছেন।
সরকার ও বিএনপির ভাষ্যমতে, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বানচালের সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ জড়িত। সরকার সমর্থক প্রথম আলো, ডেইলি স্টারও নির্বাচন বানচালকারী শক্তি হিসেবে পত্রিকাটির বিভিন্ন লেখায় এতদিন অভিযুক্ত করেছে আওয়ামী লীগকে।
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা নির্বাচন বানচালের কোনো অপকৌশল কি না, তা খতিয়ে দেখতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ‘এগুলোর মধ্য দিয়ে সারাদেশে একটা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করা যায় কি না, সেইটার একটা পরিকল্পনা বা অপকৌশলের কোনো বিষয় আছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার।’
ডেইলি স্টারের প্রধান কার্যালয়ে আগুন লাগার পর তা নেভানো ও উদ্ধার কার্যক্রম সমন্বিতভাবে না হওয়া ও দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়ারও সমালোচনা করেন সম্পাদক মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, শাহবাগের ঘটনা এবং কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ের অভিমুখে একদল লোক আসার খবর পেয়ে ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষ সরকারের সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে যোগাযোগ করে।
তিনি জানান, আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করেছি, সমন্বিত ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হলে ছাদে আটকে পড়া আমাদের সহকর্মীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা চরম অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুভয়ে কাটাতে হতো না।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুর পর রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ভবনে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। গত ১২ই ডিসেম্বর দুপুরে নির্বাচনি প্রচারণা শেষে ফেরার সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হন ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি।
ডেইলি স্টারের ওপর গতকাল রাতের নজিরবিহীন হামলার পর সার্বিক বিষয়ে আজ শুক্রবার (১৯শে ডিসেম্বর) সন্ধ্যার পর বক্তব্য দিয়েছে পত্রিকাটি। যা ডেইলি স্টারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে 'অটুট মনোবলে এগিয়ে যাবে দ্য ডেইলি স্টার' শিরোনামে। মাহফুজ আনাম পত্রিকাটির সম্পাদক ও প্রকাশক। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য মানে নিঃসন্দেহে তার বক্তব্য।
এতে বলা হয়, স্বাধীন সাংবাদিকতার ইতিহাসে বাংলাদেশের জন্য এক কালো দিন ছিল বৃহস্পতিবার। এদিন দেশের শীর্ষ দুই দৈনিক—দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো—ভয়াবহ হামলার শিকার হয়েছে। আমাদের সহকর্মীরা যখন ছাদে আটকা পড়ে নিজেদের জীবন নিয়ে শঙ্কায়, তখন নিচে একদল উন্মত্ত জনতা একের পর এক ফ্লোরে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। ধোঁয়ায় দমবন্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর প্রচেষ্টায় কেউ হতাহত হননি এবং সবাই নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পেরেছেন।
এতে বলা হয়, পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে হামলাকারী ও তাদের ইন্ধনদাতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে আমরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি। হাদির ওপর গুলির ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কহীন প্রতিষ্ঠানের ওপর এমন সহিংসতা কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।
আরো বলা হয়, গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের শিথিল মনোভাব আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। অতীতেও ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো বিভিন্ন মহলের হুমকির মুখে পড়েছে, কিন্তু সেসব ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হয়নি। চরম ঝুঁকির মধ্যেও যারা আমাদের সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন, এমনকি শারীরিক হামলার শিকার হয়েও পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের প্রতি আমরা আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
পত্রিকাটি বক্তব্যে বলেছে, বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত চলা এই হামলা শুধু দুটি পত্রিকার ওপর হামলা নয়; এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা, বাকস্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর আঘাত। এই ঘটনাকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
আরো বলা হয়, আমরা আমাদের পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং সমালোচকদের আশ্বস্ত করতে চাই—আমাদের পথচলা থামবে না। গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার প্রতি আমাদের অবিচল বিশ্বাস অটুট থাকবে। ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিতে আমাদের অঙ্গীকার অব্যাহত থাকবে। স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার প্রতি আমাদের নিষ্ঠা থাকবে অবিচল।
খবরটি শেয়ার করুন