ফাইল ছবি
কারাবন্দি চার সাংবাদিকের অবিলম্বে মুক্তি এবং তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠন কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (সিজেএ)। সংগঠনটি বলেছে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাগুলো প্রত্যাহারের যে নির্বাচনি অঙ্গীকার তারেক রহমান সরকার করেছিল, সেটির প্রতি সম্মান দেখানো উচিত।
গতকাল রোববার (২৮ জুন) দেওয়া এক বিবৃতিতে সিজেএ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানায়, সংগঠনটির সহ-সভাপতি ও ভোরের কাগজ-এর সম্পাদক শ্যামল দত্ত, একাত্তর টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মোজাম্মেল হক বাবু, ফারজানা রূপা এবং শাকিল আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে আনা মামলাগুলোর দ্রুত পর্যালোচনা এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণবিহীন অভিযোগ প্রত্যাহার করে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, আগামীকাল মঙ্গলবার শ্যামল দত্তকে হাইকোর্টে হাজির করার কথা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে সিজেএর বিশ্বাস, সাংবাদিকতার প্রতিশোধ হিসেবেই তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আনা হয়েছে।
সংগঠনটি বলেছে, চার সাংবাদিক প্রায় ১৮ মাস বা প্রায় ৬০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে কারাবন্দি থাকলেও এখনো তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়নি। একই সঙ্গে অভিযোগের পক্ষে জনসমক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণও উপস্থাপন করা হয়নি বলে তারা উল্লেখ করেছে।
সিজেএর ভাষ্য, যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া সাংবাদিকদের এভাবে দীর্ঘ সময় আটক রাখা আইনের শাসন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। সংগঠনটির মতে, এসব মামলায় প্রমাণিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের চেয়ে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিই বেশি প্রভাব ফেলেছে বলে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, তা উদ্বেগজনক।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা পেশাগত সম্পর্কের ভিত্তিতে সাংবাদিকতাকে কখনোই অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। একজন সাংবাদিকের সম্পাদকীয় অবস্থান বা রাজনৈতিক মত যাই হোক না কেন, তিনি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, মানবিক আচরণ এবং আইনের পূর্ণ সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী।
আটক সাংবাদিকদের শারীরিক অবস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সিজেএ। সংগঠনটি জানায়, শ্যামল দত্ত হৃদরোগ ও গুরুতর স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ভুগছেন এবং তার বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রয়োজন। অন্যদিকে মোজাম্মেল হক বাবু ২০২৩ সালের শেষ দিকে প্রোস্টেট ক্যান্সারের জন্য বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি প্রয়োজনীয় ফলোআপ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ফারজানা রূপাকে দুই সপ্তাহ ধরে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের জন্য নির্ধারিত কনডেম সেলে রাখা হয়েছিল বলে যে তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা হেফাজতে তার প্রতি আচরণ এবং মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেছে সংগঠনটি।
বিবৃতির শেষাংশে সিজেএ বলেছে, একটি স্বাধীন ও মুক্ত গণমাধ্যম যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম ভিত্তি। সময়মতো প্রমাণ উপস্থাপন না করে সাংবাদিকদের দীর্ঘদিন কারাবন্দি রাখা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা ক্ষুণ্ন করে এবং বিচারব্যবস্থার ওপর জনগণের বিশ্বাস দুর্বল করে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি ন্যায়বিচার দ্রুত, স্বচ্ছ ও বিলম্বহীনভাবে নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
দেশে গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি সাংবাদিকদের বিষয়ে এর আগেও উদ্বেগ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে), রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ), ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস (আইএফজে) এবং ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউট (আইপিআই) পৃথক বিবৃতি দিয়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর সুষ্ঠু বিচারিক পর্যালোচনা, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং সাংবাদিকদের অধিকার ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
এসব সংগঠন ধারাবাহিকভাবে বলছে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড এবং ন্যায়বিচারের নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন।
খবরটি শেয়ার করুন