ছবি: সংগৃহীত
সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুসন্ধানী ও সমালোচনামূলক সাংবাদিকতার পথ আরও সংকুচিত করবে বলে মন্তব্য করেছেন ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম। তার মতে, খসড়ায় এমন কিছু বিধান রাখা হয়েছে, যেগুলো কার্যকর হলে সাংবাদিকদের মধ্যে ভয় ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বাড়বে এবং দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হবে। তার ভাষায়, খসড়া আইনটি শেষ পর্যন্ত সাইবার অপরাধীদের পরিবর্তে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।
আজ শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ডেইলি স্টারের ছাপা সংস্করণে ‘দ্য ড্রাফট সাইবার ল’ উইল রেস্ট্রিক্ট দ্য মিডিয়া’ শিরোনামে এবং ‘দ্য প্রপোজড অ্যামেন্ডমেন্টস আর ওমিনাস’ উপশিরোনামে প্রকাশিত লেখায় মাহফুজ আনাম এসব কথা বলেন। একই দিনে পত্রিকাটির অনলাইন সংস্করণেও লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে।
মাহফুজ আনাম লেখার শুরুতেই বলেন, বর্তমান সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনীর পুরো প্রক্রিয়াটি আমলাদের মাধ্যমে করা হয়েছে। অন্য অনেক আইনের ক্ষেত্রে আমলাদের দিয়ে খসড়া তৈরি করানো বোধগম্য হলেও মানুষের চিন্তা, বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত আইনের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। আমলাতন্ত্র সাধারণত প্রশ্ন, ভিন্নমত, বিরোধিতা ও সমালোচনাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে না; বরং আনুগত্য নিশ্চিত করাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।
সাইবার আইনের নামের মধ্যে দীর্ঘদিন ‘নিরাপত্তা’ শব্দ ব্যবহারের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন মাহফুজ আনাম। তার মতে, ‘সুরক্ষা’ বলতে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ধারণা বোঝায়। ‘নিরাপত্তা’ শব্দটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নামে সরকারের ইচ্ছা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এবং ক্ষমতাসীন রাজনীতিক, দলের সদস্য, আমলা ও সরকারি কর্মকর্তাদের সুরক্ষার ধারণার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
মাহফুজ আনামের মতে, সাইবার জগতের সঙ্গে গণমাধ্যমের জগতের সম্পর্ক এখন এতটাই ঘনিষ্ঠ যে সাইবার জগতের জন্য করা কোনো আইন গণমাধ্যমের ওপর প্রভাব ফেলবে। একসময় সাইবার জগৎ ও গণমাধ্যম আলাদা ক্ষেত্র হলেও ইন্টারনেট, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশে দুই ক্ষেত্র একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়েছে। ফলে অপরাধ দমন এবং বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা—এই দুই ভিন্ন উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রকে একই পুরোনো কাঠামোর আইনে নিয়ন্ত্রণ করা যায় কি না, সেই প্রশ্ন তোলার কথা বলেছেন তিনি।
লেখায় দেশের সাইবার আইনের ধারাবাহিক পরিবর্তনের কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। ২০১৮ সালে তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করা হয়। ২০২৩ সালে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সময়ে ওই আইন বাতিল করে সাইবার নিরাপত্তা আইন করা হয়। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের সময়ে সাইবার নিরাপত্তা আইন বদলে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি হয়। চলতি বছর বিএনপি সরকার সেটিকে আইনে পরিণত করে। গত জুনে সংসদে ওই আইনের একটি সংশোধনী পাস হওয়ার পর আবারও সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাহফুজ আনামের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন সংশোধনী আইনটিকে আরও কঠোর ও গণমাধ্যমের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীর ৮(২) ধারাকে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বলেছেন তিনি। তার মতে, বিদ্যমান আইনেই জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, অখণ্ডতা, জনশৃঙ্খলা, উসকানি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভিত্তিতে অনলাইন কনটেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন খসড়ায় সেই ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে শুধু তথ্যের ভিত্তিতে নয়, আশঙ্কার ভিত্তিতেও কোনো কনটেন্ট বন্ধ বা অপসারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের জন্য ‘মানহানিকর’ বা ‘অবমাননাকর’ তথ্যও যুক্ত করা হয়েছে। আশঙ্কার ভিত্তিতে এবং মানহানির মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে আইন প্রয়োগের সুযোগ থাকলে এর প্রয়োগ ব্যক্তিনির্ভর ও বিষয়ভিত্তিক হয়ে পড়তে পারে।
নতুন খসড়ায় আরও কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানকে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন মাহফুজ আনাম। এর মধ্যে তথ্য মন্ত্রণালয়ের নাম রয়েছে। তার আশঙ্কা, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে এই আইন ব্যবহার করতে পারেন। চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরকে ঘিরে অতীতে বিতর্ক থাকলেও একের পর এক সরকার ক্ষমতায় এলেও বিষয়টির সমাধান হয়নি।
তার লেখায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে প্রস্তাবিত ২৫ ধারা। বর্তমান আইনের ২৫ ধারা মূলত অনলাইনে যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, পর্নোগ্রাফি এবং শিশু যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত উপাদান নিয়ে। মাহফুজ আনামের মতে, এসব বিষয় আইনটির আওতায় থাকা প্রাসঙ্গিক। কিন্তু সংশোধনীতে ধারাটি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করে মানহানি, অপমান, হেয় প্রতিপন্ন করা ও বুলিং যুক্ত করা হয়েছে। কোনো বক্তব্য, প্রকাশনা বা সংবাদ প্রতিবেদন কাউকে অসম্মানজনকভাবে উপস্থাপন করতে পারে—এমন বিষয়ও এর আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
এখানেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সঙ্গে সংঘাতের বিষয়টি তুলে ধরেছেন তিনি। সরকারি তহবিল চুরি, খাদ্য বা ওষুধে ভেজাল, নিম্নমানের রাস্তা, সেতু বা রেলপথ নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ কিংবা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির মতো ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন করতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় প্রকাশ করতে হয়। কিন্তু কোনো ব্যক্তির সুনাম ক্ষুণ্ন হতে পারে—এই অভিযোগে যদি প্রতিবেদনই অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে দুর্নীতির ঘটনা কীভাবে প্রকাশ করা হবে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন মাহফুজ আনাম।
তিনি বলেন, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সাংবাদিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ধরনের প্রতিবেদনে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসার সুনাম ক্ষুণ্ন হতে পারে। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি কে এবং তিনি কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত, তা প্রকাশ না করলে দুর্নীতির ঘটনা সামনে আনা সম্ভব নয়। একই প্রশ্ন তিনি তুলেছেন দুর্নীতিগ্রস্ত আমলা, পুলিশ কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের ক্ষেত্রেও।
খসড়া আইনের কারণে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগ তোলা সহজ হতে পারে বলেও আশঙ্কা করেছেন মাহফুজ আনাম। তার মতে, কোনো সংবাদপত্র, টেলিভিশন বা অনলাইন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে পুলিশ বা অন্য কোনো সংস্থা প্রবেশ করে কনটেন্ট জব্দ করতে পারলে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ নথি নিয়ে গেলে পুরো প্রকাশনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে তার ভাষায়, খসড়া আইন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও সমালোচনামূলক সাংবাদিকতা বন্ধ করে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
প্রস্তাবিত ২৫ ধারায় শাস্তিও আগের চেয়ে কঠোর করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। সাধারণ অপরাধের ক্ষেত্রে বর্তমান দুই বছরের কারাদণ্ড বাড়িয়ে পাঁচ বছর করার প্রস্তাব রয়েছে। ভুক্তভোগী নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী হলে শাস্তি ১০ বছর পর্যন্ত করার কথা বলা হয়েছে। জরিমানার পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে। মাহফুজ আনামের মতে, বক্তব্য বা সংবাদ প্রতিবেদনের সঙ্গে যুক্ত বিষয়গুলোতে এমন শাস্তির বিধান সাংবাদিকদের মধ্যে ভয় বাড়াবে। এর ফলে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা নিজেরাই সংবাদ প্রকাশে কাটছাঁট করার প্রবণতা বাড়বে এবং দুর্নীতিবিরোধী অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সীমিত হবে।
শুধু ২৫ ধারাই নয়, প্রস্তাবিত ২৬(এ) ধারাকেও গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিনি। বর্তমান আইনে এ ধরনের বিধান নেই। নতুন ধারায় সাইবার জগতে ‘গুজব’ ও ‘ভুল তথ্য’ প্রকাশ বা প্রচারকে অপরাধ করার কথা বলা হয়েছে এবং সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। মাহফুজ আনামের বক্তব্য, গুজব ও ভুল তথ্যের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় কোনটি অপরাধ এবং কোনটি অপরাধ নয়, তা নির্ধারণে অস্পষ্টতা তৈরি হবে।
তিনি উল্লেখ করেছেন, খসড়ায় ‘গুজব’, ‘বুলিং’, ‘ভুল তথ্য’, ‘ডিজিটাল মানহানি’, ‘অপমান’ ও ‘ভুয়া খবর’—এসব শব্দের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। বিশেষ করে এমন তথ্য, সংবাদ বা দাবিকে গুজবের আওতায় নেওয়া হয়েছে, যা বিভ্রান্তি, ভয় বা সামাজিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে বা তৈরি করার সম্ভাবনা রয়েছে। তার মতে, এসব শব্দের ব্যাখ্যার সুযোগ এত বিস্তৃত যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে গেলে তা ভয়ভীতি ও হয়রানির পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
সাংবাদিকদের কম্পিউটার, মুঠোফোন ও সংরক্ষিত তথ্য তল্লাশি ও জব্দ করার ক্ষমতার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেছেন। প্রস্তাবিত ৩৩ ও ৩৪ ধারায় কম্পিউটার, ডিজিটাল যন্ত্র এবং সংরক্ষিত তথ্যের ওপর প্রবেশ, তল্লাশি ও জব্দের ক্ষমতা দেওয়ার কথা রয়েছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলেন, যাদের অনেকে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তথ্য দেন। কোনো তদন্ত কর্মকর্তা সাংবাদিকের মুঠোফোন, কম্পিউটার বা নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে পারলে এসব সূত্রের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে মাহফুজ আনাম উল্লেখ করেন।
তবে তার লেখায় সবচেয়ে কঠোর সমালোচনা এসেছে ভ্রাম্যমাণ আদালতে বিচারের প্রস্তাব নিয়ে। মাহফুজ আনাম বলেন, কুখ্যাত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ আগের কোনো সাইবার আইনে এমন বিধান ছিল না। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা, যারা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের অধীন। তার মতে, ভ্রাম্যমাণ আদালতে বিচার মানে প্রশাসনের মাধ্যমে বিচার এবং সে কারণে সরকারের প্রভাবের আশঙ্কা থেকে যায়।
আগের সব সাইবার আইনে অপরাধের বিচার হতো ট্রাইব্যুনালে এবং সেই ট্রাইব্যুনালের নেতৃত্বে থাকতেন একজন বিচারক। প্রস্তাবিত সংশোধনী অপরিবর্তিতভাবে অনুমোদিত হলে প্রথমবারের মতো ভ্রাম্যমাণ আদালত ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমের মতো বিচার পরিচালনা করবে বলে মাহফুজ আনাম উল্লেখ করেছেন। তার দেওয়া উদাহরণ অনুযায়ী, নিত্যপণ্যের দাম কারসাজি নিয়ে অনুসন্ধান করা কোনো সাংবাদিককে রাস্তায় আটকে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এই সম্ভাবনাই একজন সম্পাদক হিসেবে সাংবাদিকের মৌলিক স্বাধীনতা নিয়ে ঝুঁকি তৈরির জন্য যথেষ্ট বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মাহফুজ আনাম আরও বলেন, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে সাইবার আইন প্রয়োগের সময় বিচারিক তদারকির বিধান ছিল। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সেই বিধান বাদ দেওয়া হয়েছে। কেন তা করা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। বিচারিক তদারকি বাদ দেওয়ার ফলে আইনের কঠোর প্রয়োগ ও অপব্যবহারের সুযোগ বাড়তে পারে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। তার প্রশ্ন, ওই আইনের অধীনে কতজন সাইবার অপরাধী শাস্তি পেয়েছেন এবং কতজন সাংবাদিক, কার্টুনিস্ট, লেখক, কবি ও সমালোচক কারাগারে গেছেন, সেটি কি প্রস্তাবিত সংশোধনীর প্রবক্তারা বিবেচনা করেছেন? মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতাদের সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখা পোস্টের কারণে গ্রেপ্তার ও কারাবাসের ঘটনাও তিনি স্মরণ করেছেন। তার লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে শাস্তির বিধান থাকা ২০টি ধারার মধ্যে ১৪টি ছিল জামিন অযোগ্য। প্রস্তাবিত খসড়াতেও জামিন অযোগ্য ধারা রাখা হয়েছে।
মাহফুজ আনামের মতে, জামিন অযোগ্য ধারায় গ্রেপ্তারের আশঙ্কা থাকলে সাংবাদিকেরা দুর্নীতির ঘটনা প্রকাশে ঝুঁকি নিতে চাইবেন না। তার বক্তব্য অনুযায়ী, খসড়া আইন সাইবার অপরাধীদের লক্ষ্য করে করা হলেও শেষ পর্যন্ত এর লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠতে পারে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিকেরা।
ভবিষ্যৎ গণমাধ্যম ব্যবস্থার কথাও লেখায় তুলে ধরেছেন তিনি। ইন্টারনেট, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গণমাধ্যমকে আরও গভীরভাবে সাইবার জগতের সঙ্গে যুক্ত করবে। মুদ্রিত গণমাধ্যমের অস্তিত্ব একসময় বিলীন হয়ে গিয়ে গণমাধ্যম কেবল ডিজিটাল জগতে টিকে থাকতে পারে—এমন পূর্বাভাসের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তাই বিদ্যমান গণমাধ্যম আইনগুলোকে ডিজিটাল বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে নতুন করে লেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মত দিয়েছেন।
মাহফুজ আনাম গণমাধ্যমের জন্য পৃথক সাইবার আইন অথবা অন্তত এমন পৃথক বিধিমালা ও নির্দেশিকার প্রস্তাব করেছেন, যাতে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ করা যায়, কিন্তু বাক, মতপ্রকাশ ও প্রকাশনার স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘসহ যেসব দেশ ও প্রতিষ্ঠান সাইবার আইন প্রণয়নে অগ্রসর হয়েছে, তাদের অভিজ্ঞতা নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
লেখার শেষাংশে মাহফুজ আনাম বলেন, প্রস্তাবিত সাইবার আইন সাংবাদিকতা, গণতন্ত্র, জবাবদিহিমূলক সরকার ও স্বচ্ছ প্রশাসনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরুতেই স্বাধীন গণমাধ্যম ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি ইতিবাচক সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাই বর্তমান খসড়ার ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে পুরোপুরি অবহিত করা হয়নি—এমনটি ধরে নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো নতুন করে পর্যালোচনা ও পুনর্গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন ডেইলি স্টারের সম্পাদক। তার প্রস্তাব, দুটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করা যেতে পারে—একটি সাইবার অপরাধ নিয়ে এবং অন্যটি গণমাধ্যম, এর স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন নিয়ে কাজ করবে। সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে এ উদ্যোগে পূর্ণ সহযোগিতার অঙ্গীকারও করেছেন তিনি। একই সঙ্গে সাইবার আইনে অগ্রসর দেশগুলোর পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘকে সম্পৃক্ত করে ডিজিটাল যুগের গণমাধ্যমের জন্য উপযুক্ত আইন তৈরিতে বাংলাদেশ নেতৃত্ব দিতে পারে বলে লেখায় উল্লেখ করেছেন তিনি।
খবরটি শেয়ার করুন