ছবি: লেখকের ফেসবুক থেকে নেওয়া
আবু সালেহ রনি
বিজয়ের মাস ডিসেম্বর কিংবা অগ্নিঝরা মার্চের মতো জুলাইকে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিকভাবে মহিমান্বিত করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ২০২৪ সালের জুলাই ও পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বেশি আঘাতের মুখে পড়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকার, সংবিধানের মর্যাদা এবং স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক ভিত্তি।
ডিপ স্টেটের মেটিকুলাস প্লানের ধারাবাহিকতায় জুলাইয়ের নামে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেও জনগণ কী পেয়েছে? মব সংস্কৃতির উত্থান, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা। একের পর এক ঘটনায় মনে হয়েছে, আইনের শাসনের পরিবর্তে শক্তির প্রদর্শনই যেন নতুন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
দুর্নীতিবিরোধী স্লোগান ছিল জুলাই রাজনীতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। অথচ সাম্প্রতিক জরিপে (টিআইবি) জানিয়েছে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে, অর্থাৎ ২০২৫ সালে, বিভিন্ন সেবা খাতে ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। টিআইবির ভাষায়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রত্যাশিত কঠোর অবস্থান দৃশ্যমান হয়নি; বরং দুর্নীতির ব্যাপ্তি ও প্রভাব নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতেও পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ২০২৬ সালে দেশে হামের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৭০০-এর বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। টিকা সরবরাহ, সংরক্ষণ ও টিকাদান ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, স্বাস্থ্য খাতের নীতিগত ব্যর্থতা ও সমন্বয়হীনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে নিহত পুলিশ সদস্যদের বিচার, ৫ থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত কয়েক হাজার সাধারণ মানুষের প্রাণহানি এবং পরবর্তী সময়ের সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু ইনডেমনিটি দিয়ে জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ করে রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রের সদস্য হোক কিংবা সাধারণ নাগরিক, প্রতিটি প্রাণের মূল্য সমান। প্রতিটি হত্যার বিচার হওয়া জরুরি।
নদীতেও লাশের মিছিল থামেনি। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে দেশের বিভিন্ন নদী ও জলাশয় থেকে ৭০০-এর বেশি লাশ উদ্ধারের তথ্য সামনে এসেছে। এসব মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এবং বিচারিক অগ্রগতি সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।
একই সময়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নজিরবিহীন পরিস্থিতিতে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের ৫ বিচারপতির পদত্যাগ, পরবর্তীতে আরও ১২ বিচারপতি এবং অধস্তন আদালতের প্রায় দুই ডজন বিচারকের অপসারণ, অব্যাহতি বা দায়িত্ব পরিবর্তনের ঘটনা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে গভীর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে—এটাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রত্যাশা।
যে রাজনৈতিক দল দেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই দলকে রাজনীতির মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা আজ আর গোপন নয়। দলটিকে নিষ্ক্রিয় বা বিলুপ্ত করার আলোচনা পর্যন্ত হয়েছে। নির্বাহী সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক কার্যক্রম সীমিত করা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখার পদক্ষেপগুলো গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তি ও রাজনৈতিক বহুত্ববাদের প্রশ্ন সামনে এনেছে।
রাজনৈতিকভাবে দায়ের হওয়া কয়েক হাজার মামলায় লাখো মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে। কয়েক হাজার সাধারণ মানুষ কারাগারে বন্দী। আর এ সুযোগে স্বাধীনতাবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শক্তিগুলোর জন্য নতুন রাজনৈতিক পরিসর তৈরি হয়েছে। সংসদে আসীন হয়েছে এই অপশক্তি।
আজ তাই প্রশ্ন উঠছে—জুলাই কি সত্যিই গণতন্ত্র ও জনগণের বিজয়ের গল্প, নাকি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দুর্বল করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নতুন বিন্যাস প্রতিষ্ঠার একটি রাজনৈতিক প্রকল্প?
প্রচার দিয়ে ইতিহাস লেখা যায় না। ইতিহাস লেখে সময়, বাস্তবতা এবং জনগণ। জনগণ সবই দেখে, সবই মনে রাখে। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ইতিহাস স্থায়ী। শেষ পর্যন্ত ইতিহাসই নির্ধারণ করবে কে কোথায় দাঁড়াবে, কার অবস্থান টিকে থাকবে এবং কার ভূমিকা জাতির স্মৃতিতে কীভাবে লিপিবদ্ধ হবে।
লেখক: সাংবাদিক, দৈনিক সমকালে কর্মরত।
খবরটি শেয়ার করুন