ছবি: সংগৃহীত
অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ দেশের একজন প্রখ্যাত চিকিৎসক। তিনি একুশে পদক পেয়েছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) তার ইমেরিটাস অধ্যাপক পদ বাতিল করেছে। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, এই নিয়োগ বিধিসম্মত ছিল না। ২০২৪ সালের জুনে তাকে আজীবনের জন্য ইমেরিটাস করা হয়। বর্তমান প্রশাসন বলছে, সেই প্রক্রিয়া সঠিক ছিল না। নিয়মনীতি ভেঙে এই সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তের পর পাল্টা বক্তব্য দিয়েছেন ডা. আব্দুল্লাহ। তিনি তৎকালীন প্রশাসনের ওপর দায় চাপিয়েছেন। তার মতে, নিয়োগে ভুল হয়ে থাকলে প্রশাসনেরও শাস্তি হওয়া উচিত। এই ঘটনা শিক্ষা খাতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এটি কেবল একজন চিকিৎসকের পদ বাতিলের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুশাসন। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ও স্বচ্ছতার প্রশ্নও। মেয়াদের শেষে নিয়ম বদল করা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিষয়টি কী?
ইমেরিটাস অধ্যাপক একটি অনন্য সম্মানজনক পদ। শিক্ষকতা ও গবেষণায় অবদানের জন্য এটি দেওয়া হয়। সাধারণত প্রবীণ শিক্ষাবিদেরা এই সম্মান পান। বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট এই পদ অনুমোদন করে। ডা. আব্দুল্লাহকে প্রথমে তিন বছরের জন্য এই পদে নেওয়া হয়। সালটি ছিল ২০২২। তখন তার সুযোগ-সুবিধা নির্দিষ্ট ছিল। তবে ২০২৪ সালে সেই নিয়ম বদলে ফেলা হয়।
৯২তম সিন্ডিকেট সভায় অধ্যাদেশ সংশোধন করা হয়। তার এই পদটিকে আজীবনের জন্য করা হয়। এর ফলে তার বেতন ও ভাতা বৃদ্ধি পায়। তিনি একজন পূর্ণকালীন নিয়মিত অধ্যাপকের সমান সুবিধা পেতে শুরু করেন।
বর্তমান প্রশাসন এই আজীবন নিয়োগকে অবৈধ বলছে। তাদের মতে, এটি ছিল একটি নজিরবিহীন ঘটনা। পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ম মেনে করা হয়নি। এখন এই পদের বৈধতা ও আর্থিক সুবিধা নিয়ে বিতর্ক চলছে।
ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহর চিকিৎসা ক্ষেত্রে বড় অবদান আছে। তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তার লেখা বই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। তিনি চিকিৎসাশিক্ষার জন্য ১০টি বই লিখেছেন।
এর মধ্যে ৭টি বই বিদেশে পড়ানো হয়। ৩টি বই দেশের মেডিকেল শিক্ষায় পাঠ্য। কোভিড মহামারির সময়ে তিনি বড় ভূমিকা রাখেন। জনসচেতনতা তৈরির জন্য তিনি ‘কোভিড হিরো’ পুরস্কার পান। ২০১৬ সালে তিনি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক পান। ২০১৩ সালে পান ইউজিসি পুরস্কার। তার এই যোগ্যতার কারণেই তাকে ইমেরিটাস করা হয়েছিল। ২০২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি এই নিয়োগ সম্পন্ন হয়।
তখন ৬৬তম একাডেমিক কাউন্সিল এই সুপারিশ করে। ৮৫তম সিন্ডিকেট সভা তা অনুমোদন দেয়। শুরুতে তার মাসিক সম্মানী ছিল ৩০ হাজার টাকা। তখন মেয়াদের বিষয়ে প্রশাসনের কোনো আপত্তি ছিল না।
সমস্যা তৈরি হয় ২০২৪ সালের ২০ জুন। তার মেয়াদের আরও ছয় মাস বাকি ছিল। ঠিক সেই সময়ে ৯২তম সিন্ডিকেট সভা বসে। সেখানে ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ-অধ্যাদেশ সংশোধন করা হয়।
নতুন সংশোধনীতে আজীবন নিয়োগের বিধান যুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে আর্থিক সুযোগ-সুবিধাও বাড়ানো হয়। তাকে অবসরের সময়কার পূর্ণ বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সঙ্গে অফিস ও সহকারী দেওয়ার নিয়ম করা হয়। বর্তমান প্রশাসন বলছে, এই সংশোধন সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত ছিল। একজন ব্যক্তিকে সুবিধা দিতেই এই কাজ করা হয়। এই কারণে ২০২৬ সালের ১৩ জুন সিন্ডিকেট সভা বসে। সেই সভায় আজীবন নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন ও অধ্যাদেশ থাকে। ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগের জন্য সুনির্দিষ্ট ধাপ রয়েছে। প্রথমে সংশ্লিষ্ট বিভাগের চেয়ারম্যানকে লিখিত প্রস্তাব দিতে হয়। সেই প্রস্তাব ডিনের মাধ্যমে উপাচার্যের কাছে যায়। এরপর একটি উচ্চপর্যায়ের মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটির সুপারিশ খুবই জরুরি। এরপর একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেট চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। এটিই হচ্ছে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া।
ডা. আব্দুল্লাহর আজীবন নিয়োগে এই নিয়ম মানা হয়নি। বিএমইউ-এর বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কোনো বিভাগীয় প্রস্তাব ছিল না। মূল্যায়ন কমিটির কোনো সুপারিশও নেওয়া হয়নি। কেবল একজন সদস্যের প্রস্তাবে নিয়ম বদলে ফেলা হয়। বাজেট অধিবেশনের মূল এজেন্ডার বাইরে এই প্রস্তাব আনা হয়। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। নিয়মের এই ব্যত্যয়কে প্রশাসন বড় অপরাধ হিসেবে দেখছে। তারা একে সুশাসনের পরিপন্থী বলছে।
এজেন্ডাবহির্ভূত প্রস্তাব
২০২৪ সালের ২০ জুনের সভাটি ছিল বাজেট অধিবেশন। নিয়ম অনুযায়ী, বাজেট সভায় শুধু আর্থিক হিসাব নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে বড় কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। অধ্যাদেশ সংশোধনেরও সুযোগ থাকে না। কিন্তু মূল আলোচনার বাইরে গিয়ে এই কাজ করা হয়। ডা. আব্দুল্লাহর জন্য বিশেষ আর্থিক সুবিধা পাস করা হয়। এর মাধ্যমে তিনি বড় অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করেন। প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, এই অর্থের পরিমাণ ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি।
বর্তমান প্রশাসন একে অবৈধ আর্থিক সুবিধা বলছে। বাজেট সভার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম ভেঙে টাকা বরাদ্দ দেওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা নষ্ট হয়েছে। এটি একটি বড় নীতিগত বিচ্যুতি।
কর্মস্থলে উপস্থিতি ও গবেষণার বাধ্যবাধকতা
ইমেরিটাস পদটি শুধু সম্মানের নয়, এটি কাজেরও পদ। এই পদের অধ্যাপকদের গবেষণা করতে হয়। তাদের শিক্ষাদান কার্যক্রমে যুক্ত থাকতে হয়। প্রশাসনকে কাজের অগ্রগতি জানাতে হয়। বিএমইউ দাবি করেছে, ডা. আব্দুল্লাহ দুই বছর নিয়মিত ছিলেন না। তিনি তার গবেষণা বা শিক্ষা-সংক্রান্ত কাজ প্রশাসনকে জানাননি। অথচ তিনি নিয়মিত রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে বেতন নিয়েছেন। এটি দায়িত্বহীনতার লক্ষণ বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে ডা. আব্দুল্লাহ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, তিনি নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। সেখানে তার একটি নির্দিষ্ট কক্ষ আছে। সেই কক্ষে বসেই তিনি নতুন বই লিখছেন। এখানে দুই পক্ষের মধ্যে স্পষ্ট মতবিরোধ রয়েছে। প্রশাসনের কাছে লিখিত কোনো কাজের প্রমাণ নেই। অন্যদিকে ডা. আব্দুল্লাহ তার লেখালেখিকেই কর্মসম্পাদনের অংশ হিসেবে দাবি করছেন। কাজের সংজ্ঞা নিয়ে দুই পক্ষের ধারণা আলাদা।
এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন শক্তিশালী হতে পারে। নিয়ম মেনে প্রতিষ্ঠান চালানোর সংস্কৃতি তৈরি হবে। ব্যক্তি যত বড়ই হোন না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন—এই বার্তা সবার কাছে পৌঁছাবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরে আসতে পারে। বাজেট সভার বাইরে টাকা বরাদ্দের পথ বন্ধ হবে। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় কমবে। প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
ভবিষ্যতের জন্য এটি একটি ভালো উদাহরণ হয়ে থাকবে। কোনো উপাচার্য বা সিন্ডিকেট নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহার করবে না। পছন্দের মানুষকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রবণতা কমে আসবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পাবে।
ডা. আব্দুল্লাহ একজন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তি। তার পদ বাতিলের খবর দেশের বাইরেও নেতিবাচক বার্তা দেবে। চিকিৎসাশিক্ষার ভাবমূর্তি নষ্ট হতে পারে। অনেকে একে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা বলতে পারেন। নতুন প্রশাসন এসে আগের সিদ্ধান্ত বাতিল করছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এক ধরনের ক্ষোভ তৈরি হতে পারে। প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে।
আইনি জটিলতা তৈরির বড় ঝুঁকি রয়েছে। ডা. আব্দুল্লাহ যদি আদালতে যান, তবে মামলা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে দীর্ঘ সময় ধরে আইনি লড়াই করতে হবে। এতে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হতে পারে।
এখানে মেডিকেল শিক্ষার্থীরা বড় ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। ইমেরিটাস অধ্যাপকদের হাত ধরে উচ্চতর গবেষণা হয়। পিএইচডি শিক্ষার্থীদের গাইড করার মানুষের অভাব হবে। চিকিৎসা গবেষণার মান কমে যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ধারাবাহিকতা সংকটে পড়বে। আগের প্রশাসনের সিদ্ধান্ত যদি পরের প্রশাসন অবৈধ বলে, তবে নথির গুরুত্ব থাকে না। প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্রের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
দেশের জ্যেষ্ঠ শিক্ষাবিদেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন। তারা ইমেরিটাস পদের মর্যাদা নিয়ে শঙ্কিত হবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সম্মানের পদ যদি এভাবে বাতিল হয়, তবে কেউ এই সম্মান নিতে চাইবেন না।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে ইমেরিটাস পদ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। হার্ভার্ড বা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠিন। সেখানে একজন শিক্ষাবিদের বৈজ্ঞানিক অবদান গভীরভাবে মূল্যায়ন করা হয়।
সেসব দেশে ইমেরিটাস অধ্যাপকেরা গবেষণাগার ও লাইব্রেরি ব্যবহারের সুবিধা পান। কিন্তু তাদের পূর্ণকালীন শিক্ষকের মতো বড় অঙ্কের বেতন দেওয়া হয় না। আজীবন রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে টাকা দেওয়ার নজির বিরল।
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের এইমস (AIIMS)-এ কঠোর নিয়ম রয়েছে। সেখানে ইমেরিটাস অধ্যাপকদের প্রতি বছর কাজের প্রতিবেদন দিতে হয়। কাজের অগ্রগতি না থাকলে সুবিধা বন্ধ হয়ে যায়। বিএমইউ-এর আজীবন পূর্ণ বেতনের নিয়মটি আন্তর্জাতিক চর্চার বাইরে ছিল।
আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ পরিবর্তনের একটি নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। হুট করে বাজেট সভায় একজন ব্যক্তির জন্য নিয়ম বদলানো বেআইনি। বর্তমান প্রশাসন যদি আইন মেনে এটি বাতিল করে, তবে তা সুশাসনের অংশ।
শিক্ষা গবেষকদের মতে, ডা. আব্দুল্লাহর যোগ্যতা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু নিয়ম ভঙ্গের দায় শুধু তার নয়। তৎকালীন উপাচার্য ও সিন্ডিকেট এই অনিয়ম করেছিল। তাদের বাদ দিয়ে শুধু ডা. আব্দুল্লাহকে শাস্তি দেওয়া পক্ষপাতমূলক। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দোষী দুই পক্ষই—যিনি সুবিধা নিয়েছেন এবং যারা সুবিধা দিয়েছেন। শুধু একজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে নিরপেক্ষতা বজায় থাকে না। এটি তখন ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব বলে মনে হয়।
তবে তৎকালীন প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। ডা. আব্দুল্লাহর দাবি অনুযায়ী, যারা এই নিয়ম ভেঙেছিলেন, তাদের বিচার হওয়া দরকার। ২০২৪ সালের জুনের সিন্ডিকেট সদস্যদের তদন্তের আওতায় আনতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) একটি অভিন্ন নীতিমালা করা উচিত। সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ইমেরিটাস পদের নিয়ম একই হওয়া উচিত।
সেখানে নিয়োগের প্রক্রিয়া এবং আর্থিক সুবিধার স্পষ্ট সীমা থাকতে হবে। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি সীমারেখা টানতে হবে। গুণী মানুষকে সম্মান দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে নিয়মের বাইরে গিয়ে নয়। প্রাতিষ্ঠানিক আইন রক্ষা করাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ও প্রধান কাজ হওয়া উচিত।
লেখক: বিজনেস এডিটর, প্রতিদিনের বাংলাদেশ।
খবরটি শেয়ার করুন