ফাইল ছবি
২০২৪ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র বিষয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারকে সতর্ক করার পর বিষয়টি নিয়ে দলটির ভেতরে ও বাইরে নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়। ওই পরিস্থিতিতে ‘বিএনপি বা এর শীর্ষ নেতৃত্বকে’ রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দলটি পেয়েছে, এ বিষয়ে তখন আলোচনা হয়। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একজন উপদেষ্টা তখন বলেন, মাইনাস টু নিয়ে কোনো চিন্তা বর্তমান সরকারের নেই।
ওই আলোচনা প্রকাশ্যে আর এগিয়ে না গেলেও বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এ বিষয়ে কিছু সংশয় থেকেই যায়। যদিও তারা প্রকাশ্যে বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা সেভাবে করেননি, বা তাদের বক্তব্যেও দলীয় নেতাকর্মীদের এ বিষয়ে ইঙ্গিত দেননি। মায়ের অসুস্থতার মধ্যেও দেশে ফেরার বিষয়ে 'সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়' বলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেওয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে আবার মাইনাস টু ফর্মুলা আলোচনায়।
বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, মাইনাস টু ফর্মুলা নয়, এজেন্ডা হচ্ছে মাইনাস ফোর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের পরিবারের ধারাবাহিক শাসনের বিরুদ্ধে একটা ব্যবস্থা নেওয়া। যারা এই ফর্মুলা বাস্তবায়নের ষড়যন্ত্র করছেন, তারা ভাবছেন এর মধ্যে দুজন মাইনাস হয়ে গেছেন (শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়)। বাকি অর্ধেকের মধ্যে খালেদা জিয়া অসুস্থতার কারণে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়। ফলে বাকি থাকলেন তারেক রহমান। তার দেশে ফেরার অনিশ্চয়তা শেষ পর্যন্ত মাইনাস ফোর-এ গড়ায় কি-না সেটি সময় এলেই আরো স্পষ্ট হবে।
এদিকে মায়ের অসুস্থতার মধ্যেও দেশে ফেরার বিষয়ে 'সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়' বলে শনিবার (২৯শে নভেম্বর) ফেসবুক স্ট্যাটাসে মন্তব্য করেন ব্রিটেনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার এই মন্তব্য রাজনীতিতে আলোচনার ঝড় তুলেছে। কেন তিনি দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না এবং এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে–এই প্রশ্ন উঠেছে।
এ নিয়ে শনিবার দিনভর রাজনৈতিক জল্পনা-কল্পনার মধ্যে বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। জবাবে তিনি শুধু বলেন, 'তারেক রহমানের ফেসবুক স্ট্যাটাসেই সব ব্যাখ্যা রয়েছে। এ বিষয়ে আর কিছু বলার নেই।'
তারেক রহমানের ফেসবুক স্ট্যাটাসের কয়েক ঘণ্টা পর বিকেলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বলেছেন, 'এ ব্যাপারে (তারেক রহমানের ফেরা) সরকারের তরফ থেকে কোনো বিধি-নিষেধ অথবা কোনো ধরনের আপত্তি নেই।'
তারেক রহমান অবশ্য গত অক্টোবরের শুরুতে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে 'দ্রুতই দেশে ফিরে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার' কথা জানিয়েছিলেন। তার দলের নেতারা বলেছিলেন যে, তিনি নভেম্বরেই দেশে ফিরবেন। কিন্তু নভেম্বর শেষ হওয়ার মাত্র একদিন আগে তারেক রহমান নিজেই জানালেন যে, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিয়ন্ত্রণ তার নেই।
সম্প্রতি বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছিলেন যে, বাংলাদেশের বড় দুটি দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে একটি অগণতান্ত্রিক তৎপরতা রয়েছে, দুই দলেরই নেতৃত্ব পরিবর্তনে 'বিদেশ থেকে একটা খেলা চলছে'।
বড় দুটি দল বলতে তিনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কথা বুঝিয়েছেন। যদিও বিএনপির কোনো নেতাই এসব বিষয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য করতে রাজি হননি। জয়ের এমন মন্তব্য এবং তারেক রহমানের দিক থেকে তার দেশে ফেরা নিয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাস দেওয়ার পর বহুল আলোচিত 'মাইনাস টু ফর্মুলার' বিষয়টিও অনেকের আলোচনায় আসছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক ও কলামিস্ট মহিউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমে বলছেন, শনিবার ফেসবুকে তারেক রহমান যা বলেছেন, তাতে মনে হয় দেশে আসার বিষয়টি তার নিজের ওপর নির্ভর করে না এবং আরও অনেক ফ্যাক্টর আছে, যার ওপর তার নিয়ন্ত্রণ নেই।
তিনি বলেন, উইকিলিকসের ফাঁস হওয়া প্রতিবেদনে তারেক রহমানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির বিষয়টি সামনে এসেছিল এবং যে যা-ই বলুন না কেন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতির পরিবর্তন না হলে তারেক রহমান দেশে ফিরবেন কোন ভরসায়? বাংলাদেশের রাজনীতি অনেকটাই নির্ভর করে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়ার ওপরে।
মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, '১/১১ এর সময়ে কিছু ব্যাপার ছিল। তিনি (তারেক) এক ধরনের মুচলেকা দিয়ে দিয়েছিলেন। খালেদা জিয়াও বলেছিলেন যে তারেক লন্ডনে পড়ালেখা করবে, রাজনীতি করবে না। আমরা জানি না সেই অঙ্গীকারের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে কি না। তিনি বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়েছেন কি-না, তাও পরিষ্কার না।'
তিনি বলেন, 'মাইনাস টু নিয়ে যত কথা বলি না কেন... তখন আসলে এজেন্ডা ছিল মাইনাস ফোর। সেটা ছিল দুই পরিবারের ধারাবাহিক শাসনের বিরুদ্ধে একটা ব্যবস্থা নেওয়া। এর মধ্যে একটা মাইনাস হয়ে গেছে (শেখ হাসিনা পরিবার)। বাকি অর্ধেকের মধ্যে খালেদা জিয়া অসুস্থতার কারণে নিষ্ক্রিয়। ফলে বাকি থাকলেন তারেক রহমান। তবে তারেক রহমানের দেশে ফেরার অনিশ্চয়তা শেষ পর্যন্ত মাইনাস ফোর-এ গড়ায় কি-না সেটি সময়েই জানা যাবে।'
প্রসঙ্গত, ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত জরুরি অবস্থার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। তখন দুই প্রধান নেত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে জেলে নেওয়ার পর ‘মাইনাস -টু ফর্মুলা’র আলোচনা জোরদার হয়েছিল। তখন তাদের দলসহ অনেকেই অভিযোগ করেছিলেন যে, ‘দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে’, যা পরে 'মাইনাস-টু ফর্মুলা' হিসেবে পরিচিতি পায়।
খবরটি শেয়ার করুন