ছবি: বণিক বার্তা
এক-এগারোর সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনা ও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তখন যেমন আলোচনা ও বিতর্ক ছিল, তেমনি এখনো তা অব্যাহত রয়েছে। ওই সময়ের সাংবিধানিক, সামরিক ও বেসামরিক কাঠামোর প্রভাবশালী কয়েকজন বর্তমান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। সেই এক-এগারোর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অনেকে বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারক হওয়ায় শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের আপত্তি, প্রশ্ন আছে।
তাদের অধীনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কতটা প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। এ বিষয়ে সন্দিহান কয়েকটি রাজনৈতিক দলও। খোদ রাজনৈতিক দলগুলো থেকে প্রশ্ন উঠেছে, এবারের সংসদ সর্বজনগ্রহণযোগ্য হবে, নাকি আবারো বিতর্ক ও উদ্বেগজনক পথ তৈরি করবে? বিতর্কিত সংসদ নির্বাচন আয়োজন করলে তাদের, বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের প্রস্থান কী নিরাপদ হবে? জাতীয় নির্বাচন বিতর্কমুক্ত না হলে রাজনৈতিক দলগুলো উপদেষ্টাদের ‘সেফ এক্সিটের’ বিষয়টি মেনে নেবে?
এক-এগারোর সময় রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ও কখনো কখনো বিতর্কিত ভূমিকা রাখা একাধিক ব্যক্তি বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। প্রকাশ্যে সেভাবে না বললেও তাদের নিয়ে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির মধ্যে ক্ষোভ, আপত্তি আছে। তাই প্রশ্ন আসছে, ২০০৭-০৮-এর গুরুত্বপূর্ণরা আবারো বিতর্কিত প্রস্থান তৈরি করছেন কি? এই প্রশ্ন দৈনিক বণিক বার্তারও। আজ সোমবার (২৬শে জানুয়ারি) পত্রিকাটির ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এই প্রশ্ন তুলেছে গণমাধ্যমটি। এক-এগারোর সরকার সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করেছিল।
বণিক বার্তার প্রতিবেদনটির শিরোনাম ‘২০০৭-০৮-এর গুরুত্বপূর্ণরা আবারো বিতর্কিত প্রস্থান তৈরি করছেন কি’। এতে বর্তমান সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বিগত সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কোন ধরনের দায়িত্বে ছিলেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি সাজিয়েছেন বণিক বার্তার সাংবাদিক শেখ তৌফিকুর রহমান। পত্রিকাটির প্রতিবেদনে এক এগারোর সরকারের আমলে তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কথা উঠে না এলেও সেসব কথা সামাজিক মাধ্যমে আসছে নেটিজেনদের আলোচনায়।
বণিক বার্তার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনের লিংক এর মধ্যে ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। নানা শ্রেণি-পেশার নেটিজেনদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা, পর্যালোচনা চলছে। অনেকে বলছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে ছাড়া অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ নির্বাচন নিয়ে দেশ-বিদেশে প্রশ্ন উঠতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্টদের নিরাপদ প্রস্থানের প্রশ্নটি তাই গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে বলছেন, কয়েক উপদেষ্টা পরিবারসহ বিদেশে চলে যাবেন। কারো কারো প্রশ্ন, বিএনপি কী এসব উপদেষ্টার এক-এগারোর ভূমিকা ‘ভুলে’ যাবে?
বণিক বার্তার প্রতিবেদনটিকে কেন্দ্র করে উপদেষ্টা বা সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ‘সেফ এক্সিটের’ প্রসঙ্গটি আজ নতুন করে আলোচনায় এলেও বিষয়টি এর আগে আরো কয়েকবার আলোচনায় এসেছে। যেই ছাত্র নেতৃত্বের পরামর্শ রেখেই এই অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে, সেই ছাত্রদের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) উপদেষ্টাদের ‘সেফ এক্সিট’ নিয়ে গত বছর প্রশ্ন তুলে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক তথ্য উপদেষ্টা এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম উপদেষ্টা পরিষদের বেশ কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করেন। গত বছর একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, উপদেষ্টাদের অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে লিয়াজোঁ করেছেন এবং তারা এখন নিজেদের ‘সেফ এক্সিট’ (নিরাপদ প্রস্থান) নিয়ে ভাবছেন।
প্রসঙ্গত, সাধারণভাবে সেফ এক্সিট বলতে কোনো স্থান থেকে নিরাপদে প্রস্থান বা চলে যাওয়াকে বোঝায়। তবে রাজনীতির ক্ষেত্রে বিষয়টা আরেকটু জটিল। রাজনীতিতে সেফ এক্সিট বলতে জটিল কোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে বোঝায়, যখন নানা অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জবাবদিহির বাইরে রেখে নিরাপদে প্রস্থানের সুযোগ করে দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, মূলত জটিল পরিস্থিতি আরও জটিল যেন না হয় এবং সম্ভাব্য সংঘাত এড়ানো যায়–তাই সমঝোতার মাধ্যমে ‘সেফ এক্সিটের’ দিকে আগানো হয়। আর এর মাধ্যমে সাধারণত দুই পক্ষই লাভজনক অবস্থানে থাকে।
বণিক বার্তার প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘তাদের (সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট) বর্তমান ভূমিকা কতটা কার্যকর বা বিতর্কিত হবে, তা নির্ভর করবে সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর। ক্ষমতার পালাবদলের সময় কিছু ব্যক্তি পরিস্থিতি বুঝে অবস্থান বদলাতে পারদর্শী হন এবং বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, যা নিয়ে জনপরিসরে নানা সন্দেহ ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।’
আজ প্রকাশিত বণিক বার্তার প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নির্বাচন কমিশনার ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। বর্তমান সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। ২০০৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০০৮ সালের নভেম্বরে অবসরের আগপর্যন্ত ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ছিলেন বর্তমান খাদ্য ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার।
এতে বলা হয়, ২০০৭-০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই সরকার পরিচালনায় প্রজাতন্ত্রের জনপ্রশাসন ঢেলে সাজানোর মূল কারিগর ছিলেন আলী ইমাম মজুমদার। একইভাবে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুতির মধ্য দিয়ে দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারেও নিজের প্রভাব ধরে রাখেন তিনি। এ সরকারের আমলেও শুরু থেকেই জনপ্রশাসন ঢেলে সাজানোর দায়িত্ব পান। তার পরিকল্পনায় প্রশাসন ক্যাডারের ১৯৮২ ব্যাচের পুনর্বাসন হয়। নানা কারণে বিতর্কিত এ ব্যাচের ওপর নির্ভর করছে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ভালো-খারাপ।
বণিক বার্তা বলছে, এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন মো. তৌহিদ হোসেন। শেখ হাসিনার সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে গত বছর অক্টোবরে দেখা করে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয় বিএনপি। তবে সে সময়ে কোনো পক্ষ তা প্রকাশ না করলেও পরবর্তী সময়ে কয়েকজনের নাম উঠে আসে। বিএনপি সূত্রে জানা যায়, তাদের অভিযুক্তদের তালিকায় ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। এক-এগারোর সময় তিনি একই মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।
এতে বলা হয়, এক-এগারো সরকারের আমলের আরেক প্রভাবশালী কর্মকর্তা ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। ওই সময় তিনি সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত পর ২০২৪ সালের ১৬ই আগস্ট স্বরাষ্ট্র ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পা তিনি।
এতে বলা হয়, সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) প্রধান হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন বর্তমান পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম। বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ১৯৮৪ ব্যাচের এ কর্মকর্তা পরে পুলিশ সদর দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন।
একাধিক বিশ্লেষক সুখবর ডটকমকে জানান, ‘এক্সিট’ শব্দটি দেশে প্রথম আলাপে এসেছিল ২০০৭ সালে দায়িত্ব নেওয়া এক এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। ওই সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই সময় আমূল পরিবর্তনের কথা বলা হয়। দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ রাজনীতিবিদদের অনেককে। তবে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাওয়া শুরু করে তৎকালীন সরকার। সব হাতের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় ক্ষমতা ছাড়ার আগ দিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়ে পড়েন সরকারের শীর্ষ পদধারীরা।
খবরটি শেয়ার করুন