ছবি: সংগৃহীত
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে বেশ আশাবাদী ছিলেন প্রধানত দুটি কারণে। প্রথমত, তিনি বিএনপির দুর্দিনের জোটসঙ্গী, দ্বিতীয়ত তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরাসরি ছাত্র ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। বগুড়া-২ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেতে অন্তর্বর্তী সরকারে প্রভাবশালী কয়েকজনকে দিয়ে চেষ্টা তদ্বিরের অভিযোগও আছে মান্নার বিরুদ্ধে।
শেষ পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে বিচ্ছেদ হলো মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্যের। দলটি বলছে, বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতা না হওয়ায় তারা এককভাবে দলীয় প্রতীক ‘কেটলি’ নিয়ে দেশের মোট ১১টি আসনে নির্বাচন করবে। দলের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না ঢাকা-১৮ (বৃহত্তর উত্তরা) ও বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ার একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে বিএনপির বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটল।
মাঝে ৩৬ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের কারণে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন মাহমুদুর রহমান মান্না। এমন পরিস্থিতিতে ঋণখেলাপি না হতে চেনাজানা মানুষের কাছে আর্থিক সহযোগিতা চেয়েছিলেন তিনি। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা শোধ করতে চাচ্ছেন না মান্না, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরাসরি ছাত্র ছিলেন, এ পরিচয়ে ঋণের টাকা 'আত্মসাতের' চেষ্টা করছেন বলেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
ঋণখেলাপি তালিকায় (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো বা সিআইবি) মাহমুদুর রহমান মান্নার নাম অন্তর্ভুক্তের কার্যক্রম আট সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। শুনানি নিয়ে চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক এ আদেশ দেন। ফলে মান্নার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে আইনত কোনো বাধা থাকেনি। তবে তিনি মনোনয়ন পাননি বিএনপির জোট থেকে। ফলে তিনি এককভাবে নির্বাচন করছেন। তিনি ও তার দল নাগরিক ঐক্যের এককভাবে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপির সঙ্গে তার প্রায় এক যুগের সখ্য ও রাজনৈতিক পথচলার আপাত সমাপ্ত হলো।
কেন এমনটি হলো, এ ব্যাপারে বিএনপির কেউ মুখ খুলছেন না। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমস্যা দেখা দেওয়ার পর মান্না জেলেও যান। বিএনপির দীর্ঘ দিনের মিত্র নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মান্নার এখন না ঘরকা না ঘাটকা অবস্থা। এ নিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মান্না একাধিকবার যোগাযোগ করলেও কোনো ফল ফলেনি। তাই গত সোমবার জরুরি সংবাদ সম্মেলনে ‘একলা চলো নীতি’ ঘোষণা দিয়ে জানান, তিনি ঢাকা-১৮ ও বগুড়া-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
নির্বাচনে অংশ না নিলে মান্নাকে মন্ত্রিত্ব দেওয়া হবে বলে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিএনপির সঙ্গে নাগরিক ঐক্যের শেষ পর্যায়ের এই সমঝোতা প্রস্তাবে এক সাংবাদিক মধ্যস্থতা করেন বলে জানা গেছে। 'স' আদ্যক্ষরে নামের ওই সাংবাদিক জাতীয় একটি দৈনিকে কর্মরত। সম্প্রতি তিনি একটি বিতর্কে জড়িয়ে আলোচনায় আসেন। প্রশ্ন উঠেছে, সাংবাদিকদের দায়িত্ব কি রাজনৈতিক সমঝোতায় মধ্যস্থতা করা?
বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আমলেও সংসদ নির্বাচনগুলোর আগে কয়েক সাংবাদিক দলটির মনোনয়নের বিষয়ে রাজনীতিবিদ ও দলটির সঙ্গে মধ্যস্থতা করতেন বলে অভিযোগ আছে। পরে এসব সাংবাদিককে আওয়ামী লীগের সরকার থেকে অন্যায় সুবিধা আদায় করতে দেখা যায়। অনেকে কালো টাকার মালিক হওয়ার অভিযোগ উঠে।
মাহমুদুর রহমান মান্না ওই সাংবাদিকের নাম উল্লেখ না করে বলছেন, গত শুক্রবার রাতে বুকে ব্যথা নিয়ে আমি হাসপাতালে ভর্তি হই। সেখানে আমার এনজিওগ্রাম হয়। চিকিৎসা শেষে বাসায় ফিরেছি। এর মধ্যে আমাকে দেখতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হাসপাতালে যান। আমার এনজিওগ্রাম হওয়ার আগে একজন সাংবাদিক এসে বলেন যে, আমি যেহেতু অসুস্থ নির্বাচন না করাই ভালো হবে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাকে মন্ত্রী বানাবেন। এতে রাজি থাকলে তিনি আমাকে দেখতে আসবেন।
মান্না আরো বলেন, 'ওই সাংবাদিক পরে আরও একবার আমাকে ফোন করে মতামত জানতে চান। তখন তিনি নির্বাচন না করে মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব নাকচ করে দেন। একই সঙ্গে বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের একজন নেতাকে বিষয়টি আমি জানাই। বিএনপির ওই নেতা প্রস্তাবের সত্যতা নিশ্চিত করেন। পরে বিএনপির ওই নেতার কাছেও আমি ওই প্রস্তাবে সম্মত নই বলে জানিয়ে দিয়েছি। আমি রাজনীতি করব। রাজনীতি মানেই যেহেতু বর্তমানে নির্বাচন, তাই নির্বাচন ছাড়ব না। মন্ত্রী হলে পরে হব, না হলে না হব। কিন্তু নির্বাচন ছাড়ব না।’
মান্না বলেন, ‘আমাকে কেউ কেউ বলেছিল আপনাকে মন্ত্রী বানানো হবে, এমপি হওয়ার দরকার কী। মন্ত্রী বানানোর আশ্বাস দিয়ে আমি রাজনীতি করা বন্ধ করে দেব কেন? এটা তো সদকা দেওয়ার মতো, ভিক্ষা দেওয়ার মতো হবে।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তথ্যমতে, ২০১৩ সালের পর থেকে আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে বিএনপির ঘনিষ্ঠতা দৃশ্যমান হয়। এর পর ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক ছিল নাগরিক ঐক্য। সে নির্বাচনে জোটের প্রার্থী হিসেবে দলটি পাঁচটি আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে, যার একটি ছিল বগুড়া-২। পরে ২০২২ সালের আগস্টে জেএসডি, গণসংহতি আন্দোলন, নাগরিক ঐক্যসহ ছয়টি দল মিলে গঠিত হয় ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’।
এই জোটকে সঙ্গে রেখেই বিগত দিনে সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় বিএনপি। সে সময়কার সমমনা মিত্র দলগুলোকে মূল্যায়নের আশ্বাস দেওয়া হলেও সর্বশেষ আসন সমঝোতায় নাগরিক ঐক্যের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। একইভাবে আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডিও আসন সমঝোতা না হওয়ায় এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দেয়।
উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালে চাকসু নির্বাচনে জাসদ ছাত্রলীগের প্রার্থী হয়ে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন মাহমুদুর রহমান মান্না। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সেখানকার ছাত্ররাজনীতিতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৭৯ সালে জাসদ ছাত্রলীগ এবং ১৯৮০ সালে বাসদ ছাত্রলীগ থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দুবারের জন্য ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হয়ে বিরল রেকর্ড গড়েন তিনি। ডাকসুর ইতিহাসে একমাত্র দুবারের ভিপিও তিনি।
খবরটি শেয়ার করুন