ছবি: সংগৃহীত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনতাই হয়েছে একাধিকবার। জামায়াতে ইসলামীর মতো মৌলবাদী রাজনৈতিক দলগুলো উৎপাদিত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পুঁজিবাদীদেরই কারখানাতে। মৌলবাদীরা ভোগবাদীও বটে, তাদের স্বর্গ ভোগের উপকরণ দিয়ে ঠাসা।
তিনি বলেন, সমাজতন্ত্রীদের উৎখাত করার জন্য মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ পাকিস্তানের মাদ্রাসাগুলোতে যে যুবকদের লালনপালন করেছে, অর্থ দিয়েছে, সুযোগ দিয়েছে অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানের, তারাই পরে আফগানিস্তান দখল করে নিয়ে মৌলবাদী এক ব্যবস্থা কায়েম করেছিল।
তিনি বলেন, মৌলবাদীদের ধর্মচর্চাটাকে অলৌকিক, আধ্যাত্মিক মনে হলেও আসলে সেটি তাদের পুঁজি সঞ্চয়। ধর্মীয় মৌলবাদীরা ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে পবিত্র বলে মনে করে; ধনী ধনীই থাকবে, যেমন গরিব থাকবে গরিব, তারা শুধু দেখে সকলেই তাদের প্রচারিত ধর্মের পথে আসে কিনা, নাকি বিচ্যুত হচ্ছে।
তার মতে, মৌলবাদী ও পুঁজিবাদীরা যে পরস্পরের আপনজন, সেটা পরিষ্কার হয় সমাজতন্ত্রের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা লক্ষ্য করলে। উভয়েই সমাজতন্ত্রবিরোধী। নিজের পুঁজি বাড়ানোর জন্য মৌলবাদীরা অন্যের ওপর অত্যাচার করে, মানুষ মারতে পর্যন্ত পিছপা হয় না, মূর্তি ভাঙতে তাদের হাত কাঁপে না।
তিনি বলেন, খবরে প্রকাশ, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের বড় দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়তে চায় এবং তারা মনে করে, ১২ই ফেব্রুয়ারির (ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ) নির্বাচনে দলটি অতীতে যে সাফল্যের মুখ কখনও দেখেনি, এবার তা দেখতে পারে। এ নিয়ে ক্ষমতার প্রধান দাবিদার বিএনপি শিবিরে বেশ উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে, নাগরিক সমাজেও এ নিয়ে আলোচনা বিস্তর।
তিনি বলেন, কিন্তু উগ্র মৌলবাদীরা তো উৎপাদিত হয়েছে পুঁজিবাদীদেরই কারখানাতে। সমাজতন্ত্রীদের উৎখাত করার জন্য মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ পাকিস্তানের মাদ্রাসাগুলোতে যে যুবকদের লালনপালন করেছে, অর্থ দিয়েছে, সুযোগ দিয়েছে অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানের, তারাই পরে আফগানিস্তান দখল করে নিয়ে মৌলবাদী এক ব্যবস্থা কায়েম করেছিল।
তিনি বলেন, তখন তাদের শত্রু ছিল সমাজতন্ত্রীরা; সমাজতন্ত্রীরা যখন মাঠে নেই, সেই শত্রুকে সামনে না পেয়ে ওই মৌলবাদীরা পরবর্তী সময়ে তাদেরই স্রষ্টা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে শত্রু করে তুলেছিল। দখলদার মার্কিনিদের হটিয়ে আফগানিস্তান বর্তমানে তালেবান রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
'যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতকে নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠল কেন' শিরোনামে এক উপসম্পাদকীয়তে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এসব কথা বলেন। আজ শনিবার (২৪শে জানুয়ারি) দৈনিক সমকালে তার লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী উপসম্পাদকীয়তে লেখেন, আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে মৌলবাদ এবং পুঁজিবাদের মধ্যে মিলবার কোনো জায়গা নেই। মৌলবাদ পশ্চাৎপদ, পুঁজিবাদ হচ্ছে আধুনিক। চেহারাসুরত, পোশাক-পরিচ্ছদ সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী।
তিনি বলেন, কিন্তু দুয়ের মধ্যে আদর্শগত ঐক্য বিদ্যমান রয়েছে এবং কেমন করে অস্বীকার করব এই সত্য যে আদর্শিক ঐক্যই হচ্ছে মূল ব্যাপার, তার বাইরে যা রয়েছে তা অমৌলিক, অনেকাংশে পোশাকি। আদর্শিক ঐক্যটা এইখানে যে, উভয় মতবাদই ব্যক্তির স্বার্থকে প্রধান করে তোলে সমষ্টির স্বার্থকে উপেক্ষা ও পদদলিত করে।
তিনি বলেন, মৌলবাদীরা অন্ধকারকে লালন করে, অন্ধবিশ্বাসকে উত্তেজিত করে তোলে, সমষ্টিগত অগ্রগতিকে ঠেলতে থাকে পেছন দিকে। সকলকে পিছিয়ে দিয়ে নিজেরা এগোতে চায়।
তিনি লেখেন, নিজেরা নয়, চূড়ান্ত বিচারে প্রত্যেক মৌলবাদীই ব্যক্তিগত, নিজের জন্য কাজ করছে; নিজের মুক্তি ছাড়া অন্য কিছু বোঝে না। মৌলবাদীরা আবার ভোগবাদীও বটে, তাদের স্বর্গ ভোগের উপকরণ দিয়ে ঠাসা। পুঁজিবাদীদের স্বর্গের সঙ্গে তাদের স্বর্গের মৌলিক কোনো ব্যবধান নেই।
খবরটি শেয়ার করুন