ছবি: সংগৃহীত
অস্ট্রেলিয়া–প্রবাসী বাংলাদেশি কনটেন্ট নির্মাতা বনি আমিনকে ইতালির রাজধানী রোমে একদল যুবকের মারধরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি প্রকাশের পর বাংলাদেশি নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ, হামলাকারীদের পরিচয় এবং এর পেছনের প্রেক্ষাপট নিয়ে নানা ধরনের দাবি ও পাল্টা দাবি ছড়িয়ে পড়লেও এখন পর্যন্ত এসবের কোনোটি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, এক ব্যক্তি বনি আমিনকে শক্ত করে ধরে রেখেছেন। এ সময় দুজনের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ বাক্যবিনিময় চলছিল। পরে বনি আমিন নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে রাস্তা দিয়ে দৌড়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করলে কয়েকজন তাকে ধাওয়া করেন। কিছু দূর গিয়ে রাস্তার পাশে পার্ক করা একটি গাড়ির সামনে তাকে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর তাকে লাথি ও ঘুষি মারতে দেখা যায়। ভিডিওতে হামলাকারীদের বাংলা ভাষায় চিৎকার করতে এবং অশালীন ভাষা ব্যবহার করতে শোনা যায়। তাদের কথাবার্তায় বাংলাদেশি আঞ্চলিক উচ্চারণও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
ভিডিওতে আরও শোনা যায়, হামলাকারীদের কয়েকজন বারবার বনি আমিনকে ‘মৌলবাদী’ বলে সম্বোধন করছেন। একই সঙ্গে অন্যদেরও হামলায় অংশ নিতে উৎসাহিত করতে দেখা যায়। তবে ভিডিওতে ঠিক কী কারণে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছিল, তা পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন সূত্রের বরাতে দাবি করা হচ্ছে, ঘটনাটি গতকাল মঙ্গলবার (২১ জুলাই) রাতে রোমের তরপিনাতারা আবাসিক এলাকায় ঘটেছে। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া থেকে ইতালি সফরে যান বনি আমিন। তবে ইতালির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি বা নির্ভরযোগ্য নথি এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে ঘটনার সময়, স্থান ও প্রেক্ষাপট নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যে তথ্য প্রচারিত হচ্ছে, তার সবকিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের ব্যাখ্যা সামনে আসছে। কিছু পোস্টে দাবি করা হয়েছে, ঘটনার সময় বনি আমিন মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। আবার অন্য অনেকে এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। এ বিষয়ে বনি আমিনের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে এ ধরনের দাবির সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
বনি আমিনের জন্ম নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করে ভিডিও নির্মাণ এবং সেসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। ফেসবুক ও ইউটিউবে তার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অনুসারী রয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যু নিয়েও তিনি নিয়মিত মতামত প্রকাশ করে থাকেন। সেই কারণে অতীতেও তাকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের প্রতিক্রিয়ায়ও দেখা গেছে স্পষ্ট বিভাজন। একদল বলছেন, মতের অমিল থাকলেও কোনো ব্যক্তিকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করার সুযোগ নেই। অন্যদিকে আরেকটি অংশ ঘটনার পেছনের কারণ খতিয়ে দেখার দাবি জানাচ্ছেন।
ফেসবুক ব্যবহারকারী মাহমুদুল হাসান নামে একজন মন্তব্য করেন, "কোনো ব্যক্তির বক্তব্য পছন্দ না হলে তার জবাব যুক্তি দিয়ে দিতে হবে। বিদেশের মাটিতে একজন বাংলাদেশিকে মারধর করার ঘটনা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।" তানিয়া রহমান নামে আরেকজন লেখেন, "ভিডিওর একটি অংশ দেখে পুরো ঘটনা বোঝা যায় না। এর আগে কী হয়েছিল, সেটিও জানা প্রয়োজন। তদন্ত ছাড়া কারও পক্ষে বা বিপক্ষে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।"
রোমপ্রবাসী পরিচয়ে মন্তব্য করা আরিফ হোসেন নামের একজন দাবি করেন, "যদি ঘটনাটি সত্যিই রোমে ঘটে থাকে, তাহলে ইতালির আইন অনুযায়ী বিষয়টি তদন্ত হওয়া উচিত। ব্যক্তিগত বিরোধ থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।" অন্যদিকে রাশেদ কবির নামে একজন লেখেন, "সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই অসমর্থিত তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এতে বিভ্রান্তি আরও বাড়ছে। নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সংযত থাকা উচিত।"
নেটিজেনদের আরেকটি অংশ ভিডিও ধারণ ও তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের ভাষ্য, এমন ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ফলে একদিকে যেমন জনমনে কৌতূহল তৈরি হয়, অন্যদিকে অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে বিভ্রান্তিও ছড়িয়ে পড়ে।
যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষকেরা প্রায়ই বলে থাকেন, সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিও বা ছবির একটি অংশ অনেক সময় পুরো ঘটনার সঠিক চিত্র তুলে ধরে না। প্রেক্ষাপট, ঘটনার আগে–পরে কী ঘটেছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ছাড়া কোনো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা কঠিন। তাই এমন ঘটনায় যাচাই-বাছাই ছাড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এ ঘটনায় ইতালির স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো অভিযোগ করা হয়েছে কি না, কিংবা কোনো মামলা হয়েছে কি না, সে সম্পর্কেও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে বনি আমিন চিকিৎসা নিয়েছেন কি না বা তার শারীরিক অবস্থা কেমন, সে বিষয়েও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশি অনলাইন পরিসরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। কেউ এটিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন, কেউ আবার প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে বিরোধের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ, হামলাকারীদের পরিচয় এবং আইনি অগ্রগতি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া না পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদনে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত তথ্য ও ভিডিওতে দৃশ্যমান বিষয়গুলো সতর্কতার সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেখানে তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, সেখানে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। নেটিজেনদের মন্তব্যগুলো আপনার অনুরোধ অনুযায়ী কাল্পনিক নাম ব্যবহার করে উদাহরণ হিসেবে সংযোজন করা হয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন