ফাইল ছবি
কোভিড-১৯ মহামারির কারণে ২০২১ সালে অমর একুশে বইমেলার ব্যবসা বড় ধরনের ধাক্কা খায়। পরবর্তী বছরগুলোতে বই বিক্রি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। তবে চলতি বছরে আবারও বিক্রি কমে যাওয়ায় প্রকাশকদের মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
গত এক দশকের বিক্রির তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বইমেলার বাজারে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা হয়েছে। মহামারির আগে কয়েক বছর ধরে বিক্রি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছিল।
২০২০ সালে, দেশে মহামারি ছড়িয়ে পড়ার ঠিক আগে, মেলায় বিক্রি ৮০ কোটি টাকার সীমা ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে, ২০২১ সালে তা নেমে আসে মাত্র ৩ কোটি টাকায়।
এরপর বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা যায় এবং ২০২৪ সালের মেলায় বিক্রি ৬০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। কিন্তু চলতি বছর রাজনৈতিক ঘটনাবলির কারণে মেলার সময়সীমা কমে যাওয়ায় প্রকাশকদের আশায় ভাটা পড়েছে।
বাংলা একাডেমির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বই বিক্রি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০১৭ সালে প্রায় ৬৫ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়, যেখানে দৈনিক গড় বিক্রি ছিল প্রায় ২.৩২ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭০ কোটি টাকা, দৈনিক গড় ২.৫০ কোটি টাকা।
২০১৯ সালে বিক্রি আরও বেড়ে প্রায় ৭৯ কোটি টাকায় পৌঁছায়, দৈনিক গড় ২.৬৩ কোটি টাকা। ২০২০ সালে সর্বোচ্চ বিক্রি হয় প্রায় ৮২ কোটি টাকা। সে বছর ২৭ দিনের মেলায় দৈনিক গড় বিক্রি ছিল প্রায় ৩.০৩ কোটি টাকা, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, “জনপ্রিয় লেখকদের নতুন বই প্রকাশ, পাঠকের ব্যাপক উপস্থিতি এবং মেলার পরিসর বৃদ্ধি—এসবই তখন বিক্রি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছিল।”
কিন্তু ২০২১ সালে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। সে বছর মেলা ১ ফেব্রুয়ারির পরিবর্তে ১৮ মার্চ শুরু হয়। ২৮ দিন চলার কথা থাকলেও পরিস্থিতির অবনতির কারণে তা ২৬ দিনে সীমিত করা হয়।
ফলে মোট বিক্রি নেমে আসে মাত্র ৩ কোটি টাকায়, অর্থাৎ দৈনিক গড় বিক্রি ছিল মাত্র ১১ লাখ টাকা—যা সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
আগামী প্রকাশনীর প্রধান ওসমান গনি বলেন, “দর্শনার্থীর সংখ্যা সীমিত ছিল এবং অনেকেই সংক্রমণের ভয়ে মেলায় আসেননি, ফলে বই বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।”
মহামারি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলে বিক্রিও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ২০২২ সালে ৩১ দিনের মেলায় প্রায় ৫২ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়, দৈনিক গড় ১.৬৭ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে মোট বিক্রি সামান্য কমে প্রায় ৪৭ কোটি টাকায় দাঁড়ায়, তবে দৈনিক গড় প্রায় একই ছিল—১.৬৮ কোটি টাকা।
২০২৪ সালে বিক্রি আবার বেড়ে প্রায় ৬০ কোটি টাকায় পৌঁছায়, দৈনিক গড় ১.৯৩ কোটি টাকা। তবে এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০২৫ সালে মোট বিক্রি কমে প্রায় ৪০ কোটি টাকায় নেমে আসে, দৈনিক গড় ১.৪২ কোটি টাকা। আর ২০২৬ সালে তা আরও তীব্রভাবে কমে যায়। ১৮ দিনের মেলায় মোট বিক্রি হয় প্রায় ১৭ কোটি টাকা, অর্থাৎ দৈনিক গড় প্রায় ১ কোটি টাকা।
ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, “রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২৫ সালের মেলায় বিক্রি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ কমে যায়। এ বছর সেই প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “স্বাভাবিক বছরের তুলনায় এ বছর বই বিক্রি প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে। অংশগ্রহণকারী প্রায় ৯০ শতাংশ প্রকাশকই স্টল নির্মাণের মৌলিক খরচও তুলতে পারেননি। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ প্রকাশকের বিক্রি ছিল ৫ হাজার টাকারও কম।”
আদর্শ প্রকাশনীর প্রধান নির্বাহী মাহবুবুর রহমান বলেন, “এ বছরের মেলা মূলত প্রতীকী ছিল। বাস্তবে বিক্রি এতটুকুও হওয়ার কথা ছিল না।”
তবে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম কেবল বই বিক্রির ভিত্তিতে মেলার সাফল্য বিচার করার সঙ্গে একমত নন। তিনি বলেন, “অনেকে ধারণা করেছিলেন, এ বছর মেলা একেবারেই ফাঁকা থাকবে। বাস্তবে তা হয়নি।”
তার মতে, দর্শনার্থীর সংখ্যা কম হলেও যারা এসেছেন তারা প্রকৃত বই ক্রেতা।
“দর্শনার্থী কম মানেই বিক্রি কম—এটা সবসময় ঠিক নয়, কারণ যারা বই কেনেন তারা সাধারণত বইমেলা মিস করেন না,” তিনি যোগ করেন।
খবরটি শেয়ার করুন