রবিবার, ৩০শে আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৪ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** বিএনপি সরকারে এলে কি দেশে জ্বালানি সংকট বাড়ে, কেন বাড়ে? *** সরকারের ছয় মাসে প্রথম ‘গুমের শিকার’ মিরাজ শেখ: আসলে কী ঘটেছিল, কেন অস্বীকার করছে সরকার? *** সংবিধানের হস্তলেখক স্বাধীনতা পদক পেলেও রচয়িতা ড. কামাল পাননি: রেহমান সোবহান *** কাপ্তাই হ্রদে পানি বেড়ে ডুবে গেছে ঝুলন্ত সেতু, চলাচলে নিষেধাজ্ঞা *** বর্তমান সরকারের সময় গুমের কোনো ঘটনা ঘটেনি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী *** দুর্যোগে বন্ধ নেপালের বিদ্যুৎ সরবরাহ, কমছে না দেশের লোডশেডিং *** ছয় লাখ মানুষের চাকরি হারানোর আশঙ্কা কেন *** গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে বিচার শুরু করেছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী *** সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে পড়ে প্রধান শিক্ষিকা নিহত *** তুলিতে আঁকা স্বপ্ন, চোখে জাগরণের আলো: তক্ষশিলায় শিশুদের রঙিন উৎসব

সরকারের ছয় মাসে প্রথম ‘গুমের শিকার’ মিরাজ শেখ: আসলে কী ঘটেছিল, কেন অস্বীকার করছে সরকার?

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ১২:৫২ পূর্বাহ্ন, ৩০শে আগস্ট ২০২৬

#

ফাইল ছবি

সাত বছরের মাহির শেখ বাবার ছবি বুকে চেপে দাঁড়িয়ে ছিল মানুষের ভিড়ে। চোখে পানি। মুখে আতঙ্ক। পাশে মা মুক্তা খাতুন। তাদের একটাই প্রশ্ন—মিরাজ শেখ কোথায়? বাগেরহাটের মোংলার জয়মনির ঘোলের মাছধরা শ্রমিক ও মোটরসাইকেলচালক মিরাজ শেখ ১০ এপ্রিল সন্ধ্যার পর থেকে নিখোঁজ। তার পরিবারের দাবি, সেদিন সাদাপোশাকে থাকা কোস্ট গার্ডের দুজন সদস্য তাকে স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যান। এরপর আর তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।

গতকাল শনিবার রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে এক সেমিনারের আয়োজন করে। সেখানে এসেছিলেন মিরাজের মতো গুমের শিকার ব্যক্তিদের ২০টির মতো পরিবার এবং গুম থেকে ফিরে আসা দুজন। অনুষ্ঠানে দেখা যায়, মাহির মাহির শেখ ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। ছলছল চোখ, মুখে আতঙ্ক। বুকের সঙ্গে একটি ছবি চেপে ধরে বারবার চারপাশে তাকাচ্ছে। যেন ভিড়ের মধ্যেই খুঁজছে ছবির মানুষটিকে।

কোস্ট গার্ড বলছে, মিরাজ শেখকে তারা আটক করেনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলছেন, গত ছয় মাসে দেশে কোনো গুম হয়নি। মিরাজের ঘটনা নিয়ে স্বাধীন তদন্ত হয়েছে। সেই তদন্তে বনদস্যুদের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা এবং তাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে।

কিন্তু মিরাজের পরিবার, মানবাধিকারকর্মী এবং সাবেক গুম তদন্ত কমিশনের সদস্যদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের প্রশ্ন, যদি মিরাজকে কোস্ট গার্ড আটক না করে থাকে, তাহলে তাকে শেষবার কারা নিয়ে গেল? তার মোটরসাইকেলই বা কোস্ট গার্ডের পরিচয় দেওয়া একজন ব্যক্তি কেন নিয়ে গেলেন? আর হাইকোর্টের নির্দেশের পরও মিরাজের সন্ধান মিলছে না কেন?

আজ রোববার, ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস সামনে রেখে সুখবর ডটকম মিরাজ শেখের ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত তথ্য, আদালতের নথি, বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য এবং দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেছে। তাতে একটি বিষয় স্পষ্ট—মিরাজের নিখোঁজ হওয়ার রহস্য এখনো কাটেনি।

মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুনের ভাষ্য, ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা সাতটার দিকে জয়মনির ঠোটা এলাকার একটি চায়ের দোকানের সামনে ছিলেন তার স্বামী। সেখানে সাদাপোশাকে থাকা দুজন কোস্ট গার্ড সদস্য তাকে তুলে নেন। তাকে স্পিডবোটে করে নিয়ে যাওয়া হয়। মিরাজের মোটরসাইকেলটি দোকানি আল-আমিনের কাছে রেখে যাওয়া হয়। পরদিন মুক্তা কোস্ট গার্ডের কার্যালয়ে যান। তাঁর দাবি, সেখানে প্রথমে তাকে বলা হয়েছিল মিরাজ একটি অভিযানে আছেন। পরে আবার বলা হয়, মিরাজ সেখানে কখনো ছিলেনই না।

ঘটনার ১১ দিন পর ২১ এপ্রিল চায়ের দোকানে রাখা মিরাজের মোটরসাইকেল নিতে একজন ব্যক্তি আসেন। তিনি নিজেকে কোস্ট গার্ডের সদস্য রবিন হিসেবে পরিচয় দেন বলে দোকানি জানিয়েছেন। মোটরসাইকেলটি নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটিও মিরাজের পরিবারকে আরও সন্দেহে ফেলে। মুক্তা ২৩ এপ্রিল মোংলা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে সংবাদ সম্মেলন করেন। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন। কিন্তু মিরাজের সন্ধান মেলেনি।

মে মাসে ডেইলি স্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও মুক্তা একই অভিযোগ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মিরাজকে কোস্ট গার্ডের পন্টুনে দেখতে গিয়েছিলেন। কোস্ট গার্ড অবশ্য তখনও অভিযোগ অস্বীকার করে।

বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আদালতে গড়ায়। মিরাজের বাবা মোস্তফা শেখ হাইকোর্টে রিট করেন। ১২ জুলাই হাইকোর্ট মিরাজকে খুঁজে বের করে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন। তার অবস্থান, নিরাপত্তা এবং তাকে খুঁজে বের করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনও চাওয়া হয়। মামলায় স্বরাষ্ট্রসচিব, কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক, পুলিশের মহাপরিদর্শক ও র‍্যাবের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিবাদী করা হয়। কিন্তু আদালতের নির্দেশের পরও মিরাজকে পাওয়া যায়নি। এখানেই ঘটনাটির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

মিরাজের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে বাংলাদেশে গত দুই বছরে প্রথম জানা ‘জোরপূর্বক গুমের’ অভিযোগ হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। ১৯ জুলাই প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য অনুযায়ী কোস্ট গার্ড সদস্যরা মিরাজকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে তার অবস্থান সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ কোনো তথ্য দেয়নি। সংস্থাটি হাইকোর্টের নির্দেশ কার্যকর করার পাশাপাশি স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। ডেইলি স্টারও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বক্তব্য তুলে ধরে মিরাজের ঘটনাকে দুই বছরের মধ্যে প্রথম জানা গুমের অভিযোগ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ডয়চে ভেলেও মিরাজের ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন করেছে। সেখানে তার পরিবারের অভিযোগ এবং কোস্ট গার্ডের অস্বীকারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ ঘটনাটি এখন শুধু স্থানীয় একটি নিখোঁজের মামলা নয়। এটি দেশের নতুন সরকারের মানবাধিকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহির পরীক্ষার বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে সরকারের বক্তব্যও স্পষ্ট।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলছেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাসে কোনো গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি। মিরাজের বিষয়ে তিনি বলেছেন, স্বাধীন তদন্তে বনদস্যুদের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা এবং তাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়টি পাওয়া গেছে। মিরাজের অতীত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার ভাষ্য, ‘মিরাজ শেখের রেকর্ডও সেই রকম। তার বাবা ও দাদার রেকর্ডও একই রকম।’ এর বেশি বিস্তারিত তিনি বলতে চাননি।

কোস্ট গার্ডের বক্তব্যও প্রায় একই ধরনের। বাহিনীটি বলেছে, ১০ এপ্রিল ওই এলাকায় তাদের কোনো বিশেষ অভিযান ছিল না। ছিল নিয়মিত টহল। মিরাজকে আটক বা হেফাজতে নেওয়ার অভিযোগও তারা অস্বীকার করেছে। বাহিনীটির দাবি, মিরাজের সুন্দরবনকেন্দ্রিক বনদস্যুদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। একটি বনদস্যু চক্রকে রসদ ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার অভিযোগও তারা করেছে। চাঁদা ও মুক্তিপণের টাকা নিয়ে ওই চক্রের সঙ্গে মিরাজের বিরোধ তৈরি হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।

কিন্তু এসব দাবির পক্ষে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। মিরাজের পরিবারের কাছেও এমন কোনো তথ্য নেই, যা দিয়ে তাকে বনদস্যুদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের শিকার হিসেবে নিশ্চিত করা যায়।

এই জায়গাতেই স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি।

সাবেক গুম তদন্ত কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন সুখবর ডটকমকে বলছেন, তারা মিরাজের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য শুনেছেন। ডিজিটাল তথ্যও যাচাই করেছেন। তাদের কাছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য এসেছে বলে দাবি করেছেন তিনি। তার প্রশ্ন, মিরাজের ঘটনায় যদি কোস্ট গার্ডের কোনো সংশ্লিষ্টতা না থাকে, তাহলে সেটি স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা হোক।

মিরাজের স্ত্রী মুক্তার বক্তব্য আরও সরল। তিনি বলেন, ‘আমি আমার স্বামীকে ফেরত চাই।’ গতকালের আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের অনুষ্ঠানে সাত বছরের মাহিরের হাতে বাবার ছবি সেই দাবিকেই আরও ভারী করে তুলেছে। শিশুটি জানে না গুম কী। সে শুধু জানে, তার বাবা নেই।

মিরাজের ঘটনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তার পরিবার এখন নিজেরাই মামলার আসামি। মিরাজকে খুঁজে বের করার দাবিতে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কোস্ট গার্ডের একটি স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগে তার স্ত্রী, মা ও বোনসহ কয়েক শ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। হাইকোর্টে মিরাজকে হাজির করার দাবিতে তার স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন।

অর্থাৎ একজন নিখোঁজ মানুষের সন্ধান চাইতে গিয়ে তার পরিবারের সদস্যদেরই আইনি ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়েছে। এখন প্রশ্ন শুধু মিরাজ গুম হয়েছেন কি না, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি একজন নাগরিকের অবস্থান জানাতে পারছে? সরকার যদি বলে মিরাজ গুম হননি, তাহলে তার বর্তমান অবস্থান কোথায়—এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। যদি বনদস্যুদের বিরোধের কারণে তিনি নিখোঁজ হয়ে থাকেন, তাহলে সেই তথ্য-প্রমাণও প্রকাশ করতে হবে। আর যদি কোনো নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে থাকেন, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গুমের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনা শনাক্ত করেছিল। এর মধ্যে ১ হাজার ২৮২ জন পরে ফিরে এলেও অন্তত ২৫১ জন আর ফেরেননি। আরও ৩৬ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছিল। কমিশন নিজেই বলেছিল, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি হতে পারে।

এই দীর্ঘ ইতিহাসের পর নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল আরও বেশি। গুমের অভিযোগ উঠলেই যেন আগের মতো ‘এমন কেউ আমাদের কাছে নেই’ ধরনের অবস্থান না নেওয়া হয়। বরং অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে স্বাধীন তদন্ত করা হবে। মিরাজের ঘটনা সেই প্রতিশ্রুতির প্রথম বড় পরীক্ষা।

আজ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে মিরাজের ছেলে মাহিরের হাতে থাকা ছবিটির দিকে তাকালে প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট হয়—একজন মানুষ কোথায় হারিয়ে গেলেন? সরকার বলছে, গুম হয়নি। পরিবার বলছে, তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কোস্ট গার্ড বলছে, তারা তাকে নেয়নি। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ঘটনাটি স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে হবে। হাইকোর্টও তাকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবু মিরাজ নেই।

তার পরিবার এখন কোনো রাজনৈতিক ব্যাখ্যা চায় না। তারা চায় একটি সুনির্দিষ্ট উত্তর—মিরাজ শেখ বেঁচে আছেন কি না। বেঁচে থাকলে কোথায়। আর যদি না থাকেন, তার সঙ্গে কী ঘটেছে। এই উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত মিরাজের ঘটনা সরকারের ‘গুম হয়নি’ দাবির পাশে একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়েই থাকবে।

গুম মিরাজ শেখ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250