ছবি: সংগৃহীত
একটি দেশের অর্থনীতির স্বাস্থ্য বোঝার জন্য শুধু প্রবৃদ্ধির হার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা বাজেট ঘাটতির হিসাব দেখলেই হয় না। মানুষ কতটা আয় করতে পারছে, নতুন কাজের সুযোগ কতটা তৈরি হচ্ছে এবং কত পরিবার দারিদ্র্যসীমা পেরিয়ে স্বচ্ছল জীবনে ফিরতে পারছে—এসব সূচকও অর্থনীতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশের সামনে এখন সেই বাস্তবতার একটি কঠিন ছবি হাজির করেছে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন।
২০২৬ সালে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠার সুযোগ পাবে—এমন প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও এর অর্থনৈতিক অভিঘাত সেই সম্ভাবনাকে অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, চলতি বছরে মাত্র পাঁচ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বের হতে পারবে। অর্থাৎ আরও ১২ লাখ মানুষের সেই অগ্রযাত্রা আটকে যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রায় ছয় লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
এই হিসাবকে শুধু একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির কয়েকটি পুরোনো দুর্বলতার প্রতিফলন রয়েছে। বাইরের একটি ভূরাজনৈতিক সংকট কীভাবে দেশের জ্বালানি, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি করতে পারে, তার একটি উদাহরণ এটি।
বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকে অনেক বদলেছে। রপ্তানি, প্রবাসী আয়, অবকাঠামো ও ভোগব্যয়ের ওপর দাঁড়িয়ে অর্থনীতির আকার বেড়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতাও বেড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি ও শিল্পের কিছু কাঁচামালের ক্ষেত্রে বিদেশের ওপর নির্ভরতা এখন অর্থনীতির বড় বাস্তবতা।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তাই কেবল আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিষয় নয়। এর প্রভাব জ্বালানি তেলের দাম, এলএনজির মূল্য, সার আমদানির খরচ এবং পরিবহন ব্যয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বাজারে আসে। উৎপাদন খরচ বাড়লে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চাপের মুখে পড়ে। সেই চাপের একটি অংশ যায় পণ্যের দামে, আরেকটি পড়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে।
এখানেই দারিদ্র্যের সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তার সম্পর্ক তৈরি হয়। একটি পরিবার যখন খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য বেশি অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হয়, তখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা সঞ্চয়ের মতো খাতে ব্যয় কমে যায়। নিম্নআয়ের পরিবারে এই চাপ আরও বেশি।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবের সবচেয়ে ভাবনার জায়গা হলো—দারিদ্র্য থেকে বের হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও ১২ লাখ মানুষ সেই সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি থাকলেই যে তা মানুষের আয় বাড়াবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
২০২২ থেকে ২০২৫ সময়কালে সীমিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়া এবং দীর্ঘ সময়ের মূল্যস্ফীতি দারিদ্র্য কমানোর গতি ধীর করেছে। ২০২৫ সালে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে বলেও বিশ্বব্যাংক উল্লেখ করেছে।
এখানে একটি বড় প্রশ্ন হলো, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সুফল কার কাছে পৌঁছাচ্ছে? যদি বিনিয়োগ বাড়লেও নতুন চাকরি না বাড়ে, কিংবা মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল রাখতে না পারে, তাহলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতির দূরত্ব তৈরি হয়।
দেশের শ্রমবাজারের আরেকটি বৈশিষ্ট্য এই সমস্যাকে বাড়িয়ে দেয়। দেশে প্রায় ৮০ শতাংশ শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। এই শ্রমিকদের আয় ও চাকরির নিরাপত্তা তুলনামূলক কম। ফলে কোনো সংকট এলে তার প্রথম ধাক্কা পড়ে তাদের ওপর।
ছয় লাখ চাকরি হারানোর ঝুঁকি
কর্মসংস্থানই দারিদ্র্য কমানোর সবচেয়ে টেকসই পথ। সামাজিক সহায়তা একটি পরিবারকে সাময়িকভাবে সংকট সামলাতে পারে, কিন্তু স্থায়ী আয় আসে কাজ থেকে। তাই ছয় লাখ কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কাকে শুধু শ্রমবাজারের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি দারিদ্র্য পরিস্থিতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সৃষ্ট নতুন কর্মসংস্থানের প্রতি ১০টির মধ্যে সাতটি হয়েছে কম উৎপাদনশীল কৃষিতে। এর অর্থ হলো, শ্রমশক্তির বড় অংশ এখনো উচ্চ উৎপাদনশীল শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত সুযোগ পাচ্ছে না।
এই প্রবণতা বদলাতে না পারলে জনসংখ্যার কর্মক্ষম অংশ বাড়লেও তার সুফল অর্থনীতিতে পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। বরং তরুণদের বড় অংশ কম আয়ের কাজে আটকে থাকতে পারে।
জ্বালানি নির্ভরতার প্রশ্নটি সামনে এসেছে
দেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে গ্যাস থেকে। অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। ফলে ওই অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হলে দেশের জ্বালানি বাজারে তার প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।
সংঘাতের মধ্যে এলএনজির দাম স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি হয়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ থেকে ২৮ ডলারে উঠেছে। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে ভর্তুকির ব্যয় ২০২৬ সালে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন থেকে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে।
এখানে সরকারের জন্য দ্বৈত চাপ তৈরি হয়। একদিকে সাধারণ মানুষ ও শিল্পকে স্বস্তি দিতে জ্বালানি মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়, অন্যদিকে বাড়তি ভর্তুকির অর্থ জোগাড় করতে হয়। রাজস্ব আয় কম হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা কিংবা অবকাঠামোর মতো খাতে ব্যয়ের জায়গা সংকুচিত হয়।
বিদ্যুৎ ও বিনিয়োগের পুরোনো সমস্যা
বাইরের সংকট দেশের কিছু অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকেও সামনে এনেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মাসে গড়ে ২৬ বার বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের মুখে পড়ে এবং এতে বার্ষিক বিক্রির প্রায় ৯ শতাংশ সমপরিমাণ ক্ষতি হয়। আবার নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন বিধিবিধানের কারণে বিনিয়োগের সম্ভাবনা ১৯ শতাংশ কমে যায়।
এর মানে হলো, ব্যবসার পরিবেশ ঠিক না থাকলে শুধু অর্থায়ন দিলেই বিনিয়োগ বাড়বে না। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, সহজ অনুমোদন, স্থিতিশীল নীতি এবং দ্রুত সেবা—সবগুলো একসঙ্গে প্রয়োজন।
কর-জিডিপি অনুপাতও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭ শতাংশের নিচে নেমেছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। অর্থাৎ সরকারের হাতে ব্যয় করার জায়গা সীমিত, অথচ মানুষের সহায়তার প্রয়োজন বাড়ছে।
বাজেট সহায়তা কি যথেষ্ট
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সামলাতে বিশ্বব্যাংক ৭১ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বাজেট সহায়তা অনুমোদন করেছে। জ্বালানি ও সার আমদানির ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পকে নগদ ও জীবিকা সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই সহায়তা প্রয়োজনীয়। তবে এটিকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ আন্তর্জাতিক সহায়তা দিয়ে কোনো একটি সংকট সামাল দেওয়া যায়, কিন্তু অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা যায় না।
সামনে এখন তাই দুটি কাজ পাশাপাশি করতে হবে। প্রথমত, সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত নিম্নআয়ের পরিবার ও প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত সুরক্ষা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি, কর, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার এগিয়ে নিতে হবে।
এখন করণীয় কী
সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি কারা সত্যিই সহায়তার প্রয়োজনীয়তায় রয়েছে, তা তথ্যভিত্তিকভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে নগদ সহায়তা যেন প্রকৃত দরিদ্র পরিবারের কাছে পৌঁছায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা কমানোর জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জ্বালানি দক্ষতায় বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। কৃষি ও শিল্পে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরির দিকে নীতির জোর দিতে হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও নিয়মকানুনের বাধা কমাতে হবে।
সবচেয়ে বড় বিষয়, অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে শুধু প্রবৃদ্ধির সংখ্যায় মাপলে চলবে না। কত মানুষ নতুন কাজ পেল, প্রকৃত আয় কতটা বাড়ল এবং কত পরিবার দারিদ্র্য থেকে স্থায়ীভাবে বের হলো—এসব সূচককে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে আনতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দেশের হাতে তৈরি কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু সেই সংঘাতের অভিঘাত কতটা মানুষের জীবনে পৌঁছাবে, তার বড় অংশ নির্ভর করে দেশের অর্থনীতির ভিত কতটা শক্ত। পাঁচ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বের হতে পারবে—এই অর্জন ধরে রাখার পাশাপাশি যে ১২ লাখ মানুষ পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের জন্য পথ তৈরি করাই এখন নীতিনির্ধারকদের বড় পরীক্ষা।
লেখক: বিজনেস এডিটর, দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ। সাবেক কর্মস্থল: দৈনিক যায়যায়দিন, বর্তমান, দেশ রূপান্তর ও দৈনিক ইত্তেফাক।
খবরটি শেয়ার করুন