ছবি: সংগৃহীত
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু নাম সময়কে অতিক্রম করে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। সেই বিরল কাতারের অন্যতম উজ্জ্বল নাম শাবানা। পর্দায় তার উপস্থিতি, অভিনয়ের মুন্সিয়ানা এবং সহজাত বাঙালিয়ানা তাকে করে তুলেছিল দর্শকের হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের তারকাদের একজন। অভিনয় থেকে বহু বছর দূরে থাকলেও তার জনপ্রিয়তা আজও অমলিন।
আজ ১৫ জুন, সোমবার এই কিংবদন্তি অভিনেত্রীর জন্মদিন। বিশেষ এই দিনে তাকে স্মরণ করে নানা স্মৃতি ও অনুভূতির কথা জানিয়েছেন তার দীর্ঘদিনের সহশিল্পী, নির্মাতা ও প্রযোজক সোহেল রানা। সোহেল রানার ভাষায়, শাবানা শুধু একজন নায়িকা নন, তার চলচ্চিত্র জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। “শাবানা আমার সিনেমার নায়িকা। দর্শক প্রথমত তাকে আমার নায়িকা হিসেবেই চেনেন। আমার পরিচালনায়ও তিনি কাজ করেছেন, আবার আমার প্রযোজিত সিনেমারও নায়িকা ছিলেন,” বলেন তিনি।
শুধু অভিনয় দক্ষতাই নয়, শাবানার পেশাদারত্বের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন এই বর্ষীয়ান অভিনেতা। তার মতে, চলচ্চিত্রাঙ্গনে এত বড় তারকা হয়েও শাবানার মধ্যে কখনো অহংকারের ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। সোহেল রানা স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমি তাকে সব সময় একজন ইতিবাচক শিল্পী হিসেবে দেখেছি। আমার পরিচালিত কোনো ছবির শুটিংয়ে তাকে কখনো দেরি করে আসতে দেখিনি। নির্ধারিত সময়েই তিনি সেটে উপস্থিত হতেন। পরিচালক হিসেবে তাকে নিয়ে কখনোই আমাকে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়নি।”
শুটিং ইউনিটের সবাইকে আপন করে নেওয়ার এক বিরল গুণও ছিল শাবানার মধ্যে। তিনি শুধু সহশিল্পীদের নয়, ইউনিটের প্রতিটি সদস্যের সঙ্গে আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করতেন। ফলে সেটে তার উপস্থিতি মানেই ছিল এক উষ্ণ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশ।
একটি বিশেষ ঘটনার কথা মনে করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সোহেল রানা। তিনি বলেন, “একবার শুটিং চলাকালে শাবানা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। আমি ভেবেছিলাম সেদিন হয়তো তিনি আর কাজ করতে পারবেন না। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি শুটিং সম্পন্ন করেন। সেই ঘটনার পর তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আরও বেড়ে যায়।”
তার চোখে শাবানা ছিলেন একজন সত্যিকারের পেশাদার শিল্পী। “শতভাগ পেশাদার শিল্পী বলতে যা বোঝায়, তিনি তা-ই। বড় তারকা হওয়ার কোনো অহংকার তার মধ্যে ছিল না,” বলেন তিনি। সোহেল রানার প্রযোজিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’-এর কথাও উঠে আসে আলোচনায়। সেই ছবিতেও ছিলেন শাবানা। দীর্ঘ পরিচয়ের পথচলায় তার অভিনয় প্রতিভা কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে বলে জানান তিনি।
“দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন তিনি। শাবানার তুলনা শাবানা নিজেই,”— এক বাক্যে সহশিল্পীর প্রতি নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেন সোহেল রানা। তবে শাবানার জনপ্রিয়তার রহস্য কোথায়? এ প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন তিনি। তার মতে, শাবানার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার স্বতঃস্ফূর্ত বাঙালিয়ানা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে আত্মিক সংযোগ।
“তাকে সব সময় আপন মানুষ, কাছের মানুষ মনে হয়েছে। দর্শক তাকে নিজেদের পরিবারের একজন সদস্যের মতো গ্রহণ করেছেন। তার অভিনীত চরিত্রগুলো মানুষের হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনার সঙ্গে মিশে গেছে। তাই আজও তার সিনেমা দেখলে দর্শক আবেগে ভেসে যান,” বলেন সোহেল রানা।
বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রদের একজন শাবানা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে চলচ্চিত্রের ধারা, বদলেছে প্রজন্ম। কিন্তু দর্শকের ভালোবাসার আকাশে তার অবস্থান আজও অটুট। জন্মদিনে সহশিল্পীর স্মৃতিচারণ যেন আবারও মনে করিয়ে দেয়— কিংবদন্তিরা কখনো হারিয়ে যান না, তারা বেঁচে থাকেন মানুষের ভালোবাসা আর স্মৃতির ভেতর।
খবরটি শেয়ার করুন