ছবি: সংগৃহীত
আগামীকাল ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ ভুয়া তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলে উঠে এসেছে এএফপির এক প্রতিবেদনে।
মঙ্গলবার (১০ই ফেব্রুয়ারি) বার্তা সংস্থা এএফপির এই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিপুল পরিমাণে ছড়ানো এই ভুয়া তথ্যের বড় অংশের উৎসই ভারত এবং সমন্বিতভাবে ছড়ানো এসব ভুয়া তথ্য ভোটারদের সিদ্ধান্তকে গুরুতরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন এএফপিকে জানিয়েছে, অনলাইনে কারসাজির মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত ও দমনে একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জানুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্কের সঙ্গে ফোনালাপে নির্বাচনকে ঘিরে ‘ভুল তথ্যের বন্যা’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, এই তথ্য দেশি-বিদেশি উভয় উৎস থেকেই ছড়ানো হচ্ছে।
এএফপি জানায়, ভুয়া তথ্যের বড় একটি অংশ বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার দাবিকে কেন্দ্র করে। দেশের জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ অমুসলিম, যাদের অধিকাংশই হিন্দু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘হিন্দু গণহত্যা’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে ব্যাপক আকারে এসব দাবি ছড়ানো হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তারা ‘হিন্দু গণহত্যার' দাবি সংবলিত সাত লাখের বেশি পোস্ট শনাক্ত করেছে। এসব পোস্ট এক্সে (সাবেক টুইটার) এক লাখ ৭০ হাজারের বেশি অ্যাকাউন্ট থেকে করা হয়েছে।
সংস্থাটির প্রধান রাকিব নাঈক এএফপিকে বলেন, এসব কনটেন্টের ৯০ শতাংশের বেশি ভারতে তৈরি হয়েছে। বাকিগুলো যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাভিত্তিক হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত।
এএফপি ফ্যাক্ট চেকের যাচাইয়ে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অনেক ভিডিও ও ছবি এআই দিয়ে তৈরি। এর একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী বিএনপিকে ভোট না দিতে বলছেন। আরেকটি ভিডিওতে দাবি করা হচ্ছে, হিন্দুদের জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দিতে বাধ্য করা হচ্ছে।
ঢাকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের প্রধান মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, বিনা মূল্যের এআই টুল সহজলভ্য হওয়ায় ভুয়া কনটেন্ট তৈরি ও ছড়ানো আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন সহজ।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, যদিও ভুয়া তথ্যের বড় অংশ ভারতের উৎস থেকে ছড়ানো হলেও এগুলো সরকারিভাবে সংগঠিত—এমন কোনো প্রমাণ নেই।
এএফপি জানিয়েছে, নয়াদিল্লি সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে থাকার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র মো. রুহুল আমিন মল্লিক বলেন, ভুয়া তথ্য মোকাবিলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ জোরদার করা হয়েছে। তবে বিপুল কনটেন্ট সামাল দেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কমিশন কর্মকর্তা জেসমিন তুলি বলেন, বাংলাদেশের জন্য এআই–জনিত ঝুঁকি অনেক বেশি।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শহরের ৮০ শতাংশের বেশি পরিবারে অন্তত একটি স্মার্টফোন আছে এবং গ্রামাঞ্চলে এ হার প্রায় ৭০ শতাংশ। তবে অনেক মানুষ এখনো এই প্রযুক্তির সঙ্গে তুলনামূলকভাবে নতুন।
জেসমিন তুলি সতর্ক করে বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এটি বড় হুমকি। কারণ, তথ্য যাচাই করার বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা কম। এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিওর কারণে ভোটাররা সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে বিভ্রান্ত হতে পারেন।’
খবরটি শেয়ার করুন