ফাইল ছবি
কুমিল্লা জেলা পরিষদের অর্থ বরাদ্দ নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দুই শীর্ষ নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও হাসনাত আব্দুল্লাহকে ঘিরে ওঠা এই বিতর্কে একদিকে রয়েছে ‘অস্বাভাবিক বরাদ্দের’ অভিযোগ, অন্যদিকে রয়েছে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারের’ পাল্টা দাবি।
বিষয়টি শুধু একটি জেলার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি সাবেক বিতর্কিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার উন্নয়ন বরাদ্দ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্নও সামনে এনেছে।
বিতর্কের সূত্রপাত কুমিল্লা জেলা পরিষদের বর্তমান প্রশাসক মো. মোস্তাক মিয়ার এক বক্তব্য থেকে। বিএনপির এই নেতা দাবি করেন, জেলা পরিষদের অর্থ থেকে মুরাদনগর ও দেবিদ্বার উপজেলায় যথাক্রমে ১৫ কোটি ও ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, জেলার অন্য উপজেলাগুলোর তুলনায় এই বরাদ্দ ছিল অস্বাভাবিক এবং বৈষম্যমূলক। তবে অভিযোগের পরই প্রশ্ন ওঠে—আসলে কী ধরনের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল? এটি কি জেলা পরিষদের নিজস্ব রাজস্ব তহবিলের অর্থ ছিল, নাকি স্থানীয় সরকার বিভাগের বিশেষ উন্নয়ন বরাদ্দ?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, কুমিল্লা জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক ও তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. আমিরুল কায়সারের বক্তব্য বর্তমান প্রশাসকের বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
তিনি জানিয়েছেন, আলোচিত অর্থ জেলা পরিষদের নিজস্ব রাজস্ব খাত থেকে দেওয়া হয়নি; বরং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিশেষ উন্নয়ন বরাদ্দ বা এডিপি তহবিলের আওতায় প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়ন করা হয়েছিল।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, মুরাদনগর উপজেলার ২৪টি এবং দেবিদ্বার উপজেলার ৪২টি প্রকল্পের জন্য পাঁচ কোটি টাকা করে বরাদ্দ অনুমোদিত হয়েছিল। অর্থাৎ মোট বরাদ্দ ছিল প্রায় ১০ কোটি টাকা, যা বর্তমান প্রশাসকের উল্লিখিত ২৫ কোটি টাকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই অবস্থায় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে সংখ্যার হিসাব নয়, বরং বরাদ্দের যৌক্তিকতা। কেন দুটি উপজেলায় একসঙ্গে এত বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়া হয়েছিল? অন্য উপজেলাগুলো কি একই ধরনের সুযোগ পেয়েছিল?
স্থানীয় সরকার প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিশেষ বরাদ্দের ক্ষেত্রে সব সময় সমান অঙ্কের অর্থ বণ্টন করা হয় না। প্রকল্পের ধরন, অবকাঠামোগত প্রয়োজন, আবেদন এবং সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় বরাদ্দের পরিমাণ নির্ধারিত হয়। সে কারণে কোনো একটি উপজেলায় কয়েক কোটি টাকা এবং অন্য কোনো উপজেলায় তুলনামূলক কম অর্থ বরাদ্দ পাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
তবে বাস্তবতা হলো, আলোচিত দুই উপজেলা রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। মুরাদনগর আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার এবং দেবিদ্বার হাসনাত আব্দুল্লাহর রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে পরিচিত। বৈষম্যের অভিযোগ উত্থাপনের ক্ষেত্রে এই রাজনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্ব পেয়েছে।
আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অভিযোগ নাকচ করে বলেছেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের বিশেষ বরাদ্দ তহবিল থেকে দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ দেওয়া হয়েছিল।
তার দাবি, মসজিদ, মন্দির, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তা ও অন্যান্য ক্ষুদ্র উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য আবেদন যাচাই করে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর সব নথি সরকারি রেকর্ডে সংরক্ষিত আছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি বলেছেন, ব্যক্তি হিসেবে তার বা আসিফ মাহমুদের কাছে কোনো অর্থ যায়নি। বরং উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ ব্যয় হয়েছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকল্পভিত্তিক ব্যয়ের তালিকাও প্রকাশ করেছেন।
এই বিতর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। দেশে উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন সরকারের সময়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা বা মন্ত্রীদের নির্বাচনী এলাকায় তুলনামূলক বেশি প্রকল্প অনুমোদনের অভিযোগ উঠেছে।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) কিংবা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকল্প অনুমোদন নিয়েও এমন আলোচনা বহুবার হয়েছে।
বিশেষ করে ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি প্রকল্প প্রস্তাব ঘিরেও আলোচনা তৈরি হয়েছিল। সেখানে কুমিল্লার সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে মুরাদনগর ও দেবিদ্বারের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব ছিল।
সমালোচকেরা তখনও প্রশ্ন তুলেছিলেন, উন্নয়ন পরিকল্পনায় রাজনৈতিক বিবেচনা কতটা প্রভাব ফেলছে। তবে প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, কোনো প্রকল্পে অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের প্রধান ভিত্তি হলো অর্থের ব্যবহার ও প্রকল্প বাস্তবায়নের গুণগত মান। শুধু বরাদ্দের পরিমাণ বেশি হওয়াই অনিয়মের প্রমাণ নয়।
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—যে অর্থ বরাদ্দ হয়েছে, তা নির্ধারিত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে কি না, কাজের মান কেমন ছিল এবং জনগণ প্রকৃত সুবিধা পেয়েছে কি না।
সাবেক প্রশাসক আমিরুল কায়সারের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিটি প্রকল্পের পৃথক নথি, অনুমোদনপত্র, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং কাজ শেষ হওয়ার পর প্রতিবেদন সংরক্ষিত রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন ই-জিপি পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
যদি এ তথ্য সঠিক হয়, তাহলে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হবে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও প্রকল্প বাস্তবায়নের অডিট পর্যালোচনা করা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়ার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের ইস্যু আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। জুলাই আন্দোলনের পর যে রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছিল, বর্তমানে তার মধ্যে প্রতিযোগিতা ও অবিশ্বাসের প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে। ফলে উন্নয়ন বরাদ্দের মতো প্রশাসনিক বিষয়ও রাজনৈতিক সংঘাতের অংশ হয়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে কুমিল্লার দুই উপজেলার অর্থ বরাদ্দের ঘটনাটি এখন দুই ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি। প্রথমত, বরাদ্দের পরিমাণ ও বণ্টন কি ন্যায্য ছিল? দ্বিতীয়ত, বরাদ্দ পাওয়া অর্থ প্রকল্প অনুযায়ী সঠিকভাবে ব্যয় হয়েছে কি না?
প্রথম প্রশ্নের উত্তর অনেকাংশে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল হতে পারে।
কিন্তু দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব কেবল নথিপত্র, প্রকল্প মূল্যায়ন এবং স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে। ফলে এই বিতর্কের স্থায়ী সমাধান রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, বরং তথ্যনির্ভর যাচাই ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার মধ্যেই নিহিত।
কুমিল্লার ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, সরকারি অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে শুধু আইনগত বৈধতা যথেষ্ট নয়; জনমনে আস্থা তৈরির জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং তথ্য উন্মুক্তকরণ। অন্যথায় উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থও রাজনৈতিক বিতর্কের উপাদানে পরিণত হবে, আর প্রকৃত সত্য আড়ালেই থেকে যাবে।
খবরটি শেয়ার করুন