বিএনপির সরকার গঠনের দুই মাসের মধ্যেই সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে সরব আলোচনা শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করেছে। ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন জানিয়েছেন, ১২ মে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির ঘরানার শিল্পীদের মধ্যেও দেখা গেছে উল্লেখযোগ্য তৎপরতা। গত কয়েক দিনে বিনোদন অঙ্গনের একাধিক তারকা সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন, কেউ কেউ জমাও দিয়েছেন। বিশেষ করে সংগীতশিল্পীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে বেশি। পাশাপাশি একজন নৃত্যশিল্পীর অংশগ্রহণও নজর কেড়েছে।
দলীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ইতিমধ্যে সাত শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে। যদিও দলীয়ভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন আহ্বান করা হয়নি, তবুও আগ্রহী প্রার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আবেদন জমা দিচ্ছেন। ফরম বিক্রি চলবে আজ রোববার পর্যন্ত।
মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির নারী নেত্রী, মহিলা দলের নেত্রী এবং সাবেক ছাত্রদল-সংশ্লিষ্ট তরুণ নেত্রীরা। অনেকে তাদের অতীতের আন্দোলন–সংগ্রামে ভূমিকা, দলীয় আনুগত্য এবং সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রোফাইল তৈরি করে শীর্ষ নেতাদের কাছে পাঠাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ জ্যেষ্ঠ নেতা ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মনোনয়ন নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন।
বিনোদন অঙ্গনের যারা ইতিমধ্যে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন সংগীতশিল্পী বেবী নাজনীন (নীলফামারী–৪), কনকচাঁপা (সিরাজগঞ্জ–১), দিলরুবা খান (জয়পুরহাট–২), রিজিয়া পারভীন (কিশোরগঞ্জ), দিঠি আনোয়ার (সিলেট ও কুমিল্লা) এবং নৃত্যশিল্পী ফারহানা চৌধুরী (ময়মনসিংহ–১১)। তবে শেষ পর্যন্ত তারা মনোনয়ন পাবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এরই মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বেবী নাজনীন। তিনি বলেন, ‘দেশের সংস্কৃতিকে রক্ষা করা, এটা আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়। বিগত দিনে আমি আন্দোলন–সংগ্রামে ছিলাম। আপনারা জানেন, আমি বহির্বিশ্বে ছিলাম, সেখানে যত আন্দোলন–সংগ্রাম হয়েছে, সব সময় সক্রিয় ছিলাম এবং নেতৃত্বও দিয়েছি। আমরা পরিচ্ছন্ন রাজনীতিতে বিশ্বাসী, একটি শক্তিশালী আদর্শে বিশ্বাসী—শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ এবং দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার আস্থা, তারেক রহমানের বিশ্বাস। আমাদের প্রধানমন্ত্রী, তিনি যেভাবে তরুণ প্রজন্মকে নতুন বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছেন, যেভাবে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন, দেশের মানুষের জন্য কাজ করেছেন, দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণের জন্য কাজ করছেন—সে জায়গায় তিনি একা কষ্ট করলে হবে না, আমাদের সবাইকে তার সঙ্গে থেকে আদর্শিকভাবে কষ্ট করতে হবে—এটাই আমার চাওয়া।’
রিজিয়া পারভীন বলেন, ‘সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের মাধ্যমে নারীর উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে চাই। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকলে আমার ভাবনাচিন্তা সুন্দরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারব। এলাকার মানুষের কাজেও আসতে আসব—তাদের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে অবদান রাখতে পারব। আমি যেহেতু গানের মানুষ, সংস্কৃতি অঙ্গনকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়েও জোর দেব। শিল্পীদের নিরাপত্তা ও পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। ভিন্ন মতাদর্শের কারণে কোনো শিল্পী যেন তাদের শিল্পচর্চা থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিতে চাই। আমার লক্ষ্য একটি নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলা।’
২০১৮ সালে সিরাজগঞ্জ–১ আসন থেকে সংসদ নির্বাচন করেছিলেন কনকচাঁপা। এবার সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন চেয়ে তিনি বলেন, ‘বলা যায় আমি একরকম অবরুদ্ধ ছিলাম। বন্দী ছিলাম। আমার দেশের মাটিতে দীর্ঘদিন গান করতে পারিনি। একজন শিল্পীকে যখন কণ্ঠরোধ করা হয়, সেটাকে বন্দিত্বই বলা যায়। যা–ই হোক, আমি সবকিছু ভুলে যেতে চাই। নতুন করে আশায় বুক বেঁধেছি। আমি সারা জীবন সমাজের অসহায় বৃদ্ধদের জন্য কাজ করে গেছি। আমার অনেকগুলো সংগঠন আছে। আমি সেই কাজগুলো বড় পর্দায় ছড়িয়ে দিতে চাই। মহান সংসদে দাঁড়িয়ে জনগণের কথা বলতে চাই। জনগণের দুঃখের কথা বলতে চাই। অবশ্যই আমি একজন কণ্ঠশিল্পী, আমাদের শিল্পীদের যে সুবিধা–অসুবিধা, সেগুলো নিয়েও কথা বলতে চাই। এককথায় বলতে গেলে, সৎ এবং নিষ্ঠাবান থেকে মানবসেবা করাই আমার একমাত্র উদ্দেশ্য।’
নৃত্যশিল্পী ফারহানা চৌধুরীও মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। ময়মনসিংহের ভালুকার একটি রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সক্রিয়। বর্তমানে তিনি জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক। পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় জনসেবার লক্ষ্য নিয়েই নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন তিনি।
দিলরুবা খান বলেন, ‘যারা অনেক ত্যাগী, দল যাদের যোগ্য মনে করবে, তাদেরই যেন চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়। মনে হয়েছে, আমার নিজস্ব কিছু চিন্তাভাবনা আছে। সরকারে থেকে এই কাজগুলো বড় পরিসরে করা সম্ভব—তাই মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছি। বাকিটা দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বের বিবেচনা।’
জানা গেছে, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৫০টি। প্রতি ছয়জন সাধারণ সদস্যের বিপরীতে একটি করে সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন হবে। সে হিসাবে বিএনপি জোট পেতে পারে ৩৬টি আসন, জামায়াত জোট ১৩টি এবং স্বতন্ত্রদের জন্য থাকবে একটি আসন। মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের জন্য প্রার্থীদের দুই হাজার টাকা এবং জমার সময় ৫০ হাজার টাকা জামানত দিতে হচ্ছে।
সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়নকে ঘিরে বিনোদন অঙ্গনের তারকাদের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত কারা দলীয় মনোনয়ন পাবেন, তা নির্ধারিত হবে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তে। ত্যাগ, অভিজ্ঞতা ও জনপ্রিয়তার সমন্বয়েই চূড়ান্ত তালিকা নির্ধারিত হবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন