ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের এক বক্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জনপ্রিয় লেখক মহিউদ্দিন মোহাম্মদ। তিনি মাহমুদুর রহমানকে গ্রামীণ প্রবাদের সেই 'সাদা কুকুরের' সঙ্গে তুলনা করেছেন, যে ভাত খাওয়ার পর ভাতদাতাকে কামড়িয়ে দাঁত পরিষ্কার করে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের সময় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান কীভাবে বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনকে নির্দেশনা দিয়েছেন, সেসবও তুলে ধরেছেন তিনি।
তিনি বলেন, 'গ্রামে প্রবাদ আছে, কালা কুত্তার ঈমান চৌদ্দ আনা সাদা কুত্তার ঈমান শূন্য আনা এবং সাদা কুত্তাকে সাবধানে ভাত দিও। মাহমুদুর রহমান সেই সাদা কুত্তা, যে ভাত খাওয়ার পর ভাতদাতাকে কামড়িয়ে দাঁত পরিষ্কার করে। আমি কিছু তথ্য জানি, (বিএনপির চেয়ারম্যান) তারেক রহমানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ একজনের সূত্রে। তিনি আমার ব্যক্তিগত বন্ধু এবং সম্পর্কটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক। আমি পেশাদার এক্টিভিস্ট নই বলে এসব জিনিস নিয়ে কখনো লিখিনি। কিন্তু সাদা কুত্তার কামড় থেকে দেশবাসীকে রক্ষা করা দায়িত্ব বলে মনে করি।'
শনিবার (১০ই জানুয়ারি) রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম অনুষ্ঠানে এসে তারেক রহমান দেশের জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমের সম্পাদকদের বিভিন্ন পরামর্শ ও উদ্বেগের কথা শোনেন।
অনুষ্ঠানে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান তারেক রহমানের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনি ১৭ বছর দেশে ছিলেন না। আপনার চারপাশের লোকজন আপনাকে যা বলছে, আপনি সেটাই শুনছেন। কিন্তু ১৭ বছরের প্রকৃত ইতিহাস এটা না। সেই ইতিহাস আমি আপনার কাছে বর্ণনা করব।’
মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘জনাব তারেক রহমান আপনি ১৭ বছর দেশে ছিলেন না। আপনি জানেন না, এখানে কী হয়েছে। আপনার বিশিষ্ট লোকজন আপনাকে যা বলেছে—এটাই আপনি শুনেছেন। এখন যারা মিডিয়ার নতুন বন্ধুরা আপনাকে যেটা বলছে, সেটাই আপনি শুনছেন এবং আপনি মনে করছেন এটাই বাংলাদেশের ১৭ বছরের ইতিহাস। না, এটা ১৭ বছরের ইতিহাস না।’
মাহমুদুর রহমানের ওই বক্তব্যের সমালোচনা করে শনিবার রাতেই নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া একটি দীর্ঘ পোস্টে এসব কথা বলেন মহিউদ্দিন মোহাম্মদ।
মহিউদ্দিন মোহাম্মদের ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো—
"(১) আন্দোলনে (২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে) বিএনপি পুরোদমে সক্রিয় হয় জুলাইয়ের ১৩ তারিখের পরে। ১৪ তারিখ তারেক রহমান ছাত্রদল ও যুবদলের শীর্ষ নেতৃত্বকে একসাথে নিয়ে মিটিং করেন, এবং ঢাকা শহরকে ১০টি জোনে ভাগ করেন।
৪টি জোন ঢাকার কেন্দ্রে। শাহবাগ, কাকরাইল, কাওরানবাজার, ধানমণ্ডি। বাকি ৬টি জোন ঢাকার প্রবেশপথগুলো ঘিরে। প্রত্যেক জোনে ছাত্রদলের ১০ জন ও যুবদলের ১০ জনকে দায়িত্ব দেন নেতৃত্ব দিতে। প্রতি জোনে সমন্বয়ের দায়িত্ব পান একজন।
তাদের প্রধান কাজ ছিল ঢাকার আশেপাশের জেলাগুলো থেকে ছাত্রদল ও যুবদলের কর্মীদের ঢাকায় নিয়ে আসা এবং ছাত্রদের রক্ষায় ঢাল হিসেবে পাশে থাকা।
(২) একই দিনে তারেক রহমান মির্জা আব্বাসকে নির্দেশ দেন ঢাকায় আসা সকল নেতাকর্মী ও ছাত্রের খাওয়া-দাওয়া ও পানির ব্যবস্থা করতে। ১৫ থেকে ১৮ তারিখ মির্জা আব্বাস ৮ ট্রাক পানি ও দুই ট্রাক প্যাকেটজাত খাবার বিতরণ করেন, পরবর্তীতে আরও অনেক ট্রাক, বিভিন্ন কৌশলে। ছাত্রদল ও যুবদলের কর্মীদের দিয়ে। এনসিপি ও শিবিরের (ছাত্রশিবির) এখন যারা গর্ত থেকে বের হয়ে গলা উঁচু করছে, তারা কি জানে যে ছাত্ররা মির্জা আব্বাসের খাবার খেয়ে রাস্তায় ছিল?
(৩) ১৫ তারিখ দলের হাইকমান্ডের সদস্যদের সাথে তারেক রহমান একাধিক মিটিং করেন। সেখান থেকে জেলা কমিটিগুলোকে সক্রিয় করার ও প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিএনপিপন্থি পরিবহন ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করা হয়, জেলা পর্যায়ের সকল নেতাকর্মীর ঢাকায় আসা ও জেলা/থানা শহরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে যেন সর্বোচ্চ সহায়তা করা হয়। ১৬ তারিখ থেকে জেলা ও থানা বিএনপি এবং স্থানীয় ছাত্রদল/যুবদল আন্দোলনে সংঘবদ্ধভাবে অংশ নেওয়া শুরু করে।
(৪) সেই সময়ে জেলা শহরগুলোতে যারা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তাদের বড় অংশই ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবের ব্যাচমেট/বন্ধু ছিল। বিসিএস ৩৩/৩৪ এই ব্যাচগুলো। রাকিব তার আরেক বন্ধুকে সাথে নিয়ে ওই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সদর সার্কেলদের অনুরোধ করে, যেন ছাত্রদের উপর কোনো গুলি চালানো না হয়। তারা যেন অন্তত বেআইনি কোনো নির্দেশ পালন না করেন। কারণ জেলা শহরে মাঠপর্যায়ে পুলিশ কাজ করে মূলত এসপি সদর সার্কেলের কমান্ডে। লক্ষ করবেন, জেলা শহরগুলোতে পুলিশ তেমন সহিংস হয়নি। এর কারণ হলো এই।
এখানে আমি আরেকটি তথ্য দিতে চাই। হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে গুলির নির্দেশ দিয়েছিল বানিয়াচং থানার তৎকালীন ওসি দেলোয়ার। এই দেলোয়ার ছিল শিবিরের লোক। কিন্তু আওয়ামী লীগ সেজে ওসি পদ নিয়েছিল। তাই আওয়ামী লীগের আস্থাভাজন থাকতে অতিরিক্ত আওয়ামী লীগগিরি করতে সে ৫ই আগস্ট সকাল বেলা টহলে গিয়ে গুলির নির্দেশ দিয়েছিল, যদিও জেলা পুলিশ সুপার আখতার হোসেনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছিল কোনো প্রকার গুলি না করতে। ওসি দেলোয়ার পরবর্তীতে গ্রেপ্তার হয়, এবং জামায়াতের কিছু আইনজীবী তার জামিনের চেষ্টা করে আসছে। এই দেলোয়ারের কারণে তৎকালীন আলফা থ্রি আমিনুল প্রায় মারা যেতে বসেছিল। কিন্তু এখন সব দোষ হিন্দু এসআই সন্তোষের!
(৫) জুলাইয়ের ২০ তারিখের পর থেকে সারাদেশে আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ সামষ্ঠিকভাবে বিএনপির হাতে চলে যায়। এই সময়টাতে তারেক রহমান দলীয় কর্মী ছাড়াও বহু ফেসবুক এক্টিভিস্ট ও ইউটিউবারের সাথে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করেন। আমার কাছেও আমন্ত্রণ এসেছিল, তবে আমি যেহেতু সর্বদা রাজনীতিক ক্ষমতাধর মানুষদের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়া থেকে দূরে থাকি, তাই বিনয়ের সাথে না করি (কারণ, কখন কার সমালোচনা করতে হয় ঠিক নেই)।
তবে জানিয়ে দিই যে, ছাত্রদের রক্ষায় আমি ব্যক্তিগত ক্যাপাসিটিতে কাজ করব। জুলাইয়ের ২২ তারিখে আমি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে একটি চিঠি লিখি ছাত্রদের বাঁচাতে। চিঠিটির কপি ও ইউএসপিএস রিসিপ্ট তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ আমার সেই বন্ধুর কাছে আছে। এ ধরনের চিঠি আমি দেশ ও মানুষের পক্ষে সর্বদাই লিখি, ভবিষ্যতেও লিখব। এমনকি তা তারেক রহমান বা বিএনপির বিরুদ্ধে গেলেও।
(৬) জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে তারেক রহমান বিএনপিপন্থি চিকিৎসক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সাথে একাধিক মিটিং করেন। চিকিৎসকদের নির্দেশ দেন, যেকোনো মূল্যে আন্দোলনে আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে। ঢাকা ও জেলা পর্যায়ের অনেকগুলো বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার তখন এ কাজে সংযুক্ত হয়েছিল। বিএনপিপন্থি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষকরা আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
(৭) ৩রা আগস্ট রাতে তারেক রহমান জেলা পর্যায়ের নেতাদের সাথে একাধিক মিটিং করেন। নির্দেশ দেন, যেকোনো মূল্যে সর্বোচ্চ মানুষ নিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করতে হবে। ৪ঠা আগস্ট ভোর থেকেই নারায়ণগঞ্জ, চিটাগাং রোড, গাজীপুর, সাভার, দোহার, বিক্রমপুর, এসব এলাকায় লাখ লাখ বিএনপি ও ছাত্রদলকর্মী জড়ো হতে থাকে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সাথে সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকে ছাত্রদল ও বিএনপির আলাদা একটি দল। ঢাকায় তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেন মির্জা আব্বাস। ঢাকার শাহজাহানপুর, উত্তরা, যাত্রাবাড়ি, আব্দুল্লাহপুর, ও দোহারের হাজার হাজার বাসাবাড়িতে তখন বিএনপির কর্মীরা রাত কাটিয়েছে।
(৮) ছাত্র সমন্বয়কদের সাথে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেন ছাত্রদল সভাপতি রাকিব, সাধারণ সম্পাদক নাসির, ও আমান উল্লাহ আমান। এই পুরো প্রক্রিয়ায় শিবির বা জামায়াতের কাউকে সামনে খুঁজে পাওয়া যায়নি। বরং কিছু উপলক্ষে ছাত্রদলের যোগাযোগের প্রেক্ষিতে শিবিরের সে-সময়ের নেতারা গা-বাঁচানো জবাব দিয়েছিল এবং অনেকেই ছাত্রলীগ সেজে ছাত্রদের পেটাচ্ছিল। আপাতত এই তথ্যগুলোই পাবলিকলি প্রকাশ করলাম। আরও অনেক বিষয় জানি, সময় হলে বলবো।"
খবরটি শেয়ার করুন