ফাইল ছবি
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে অনার্স পর্যায়ের সব বিভাগের শিক্ষার্থীর জন্য ১০০ নম্বরের বাধ্যতামূলক ক্রেডিট কোর্স হিসেবে বাংলাদেশ স্টাডিজ ও ইসলামিক স্টাডিজ চালুর সিদ্ধান্ত নতুন করে ধর্মীয় স্বাধীনতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্র এবং উচ্চশিক্ষায় অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির প্রশ্ন সামনে এনেছে। দৈনিক কালবেলা–তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুসলিম শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদেরও ইসলামিক স্টাডিজ কোর্সে নিবন্ধন করতে হবে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর নন-মুসলিম শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কোর্সটি চালু করা হচ্ছে। যদিও কাউন্সিলের বৈঠকে কয়েক সদস্য মৌখিকভাবে আপত্তি তুলেছিলেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বর্তমান উপাচার্য ড. এ কে এম মতিনুর রহমান জানিয়েছেন, বিষয়টি আবারও একাডেমিক কাউন্সিলে তোলা হতে পারে। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—একটি নির্দিষ্ট ধর্মভিত্তিক কোর্স কি সব ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক করা উচিত?
আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, তাদের আপত্তি ইসলাম বা ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে নয়; আপত্তি বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তে। তাদের মতে, বাংলাদেশ স্টাডিজ জাতীয় পরিচয়, ইতিহাস ও নাগরিকতা–সংশ্লিষ্ট বিষয় হওয়ায় তা সবার জন্য বাধ্যতামূলক হতে পারে। কিন্তু ইসলামিক স্টাডিজের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় পরিচয় ও ব্যক্তিগত পছন্দকে বিবেচনায় রেখে বিকল্প ব্যবস্থা থাকা উচিত।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একটি অংশ যুক্তি দিচ্ছে, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। যেমন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুলকে নিয়ে কোর্স রয়েছে কিংবা বিশ্বের অনেক বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠানের আদর্শ বা প্রতিষ্ঠাকালীন দর্শনের ওপর কোর্স থাকে, তেমনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েও ইসলামিক স্টাডিজ থাকা অস্বাভাবিক নয়।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম, হিন্দুধর্ম বা অন্য কোনো ধর্ম নিয়ে কোর্স থাকা এবং সেই কোর্সটি সব শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক করা—দুটি ভিন্ন বিষয়।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে নীতি একরকম নয়। তবে বহু দেশে বাধ্যতামূলক ধর্মীয় শিক্ষা থাকলেও তা সাধারণত শিক্ষার্থীর নিজ ধর্মের ভিত্তিতে অথবা তুলনামূলক ধর্মশিক্ষার আকারে পরিচালিত হয়।
ইউনেসকোর বৈশ্বিক শিক্ষা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে বেসরকারি স্কুলে আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ বাধ্যতামূলক হলেও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইসলামিক স্টাডিজ মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক, আর আরবি ও সামাজিক বিজ্ঞান সব শিক্ষার্থীর জন্য। অর্থাৎ অমুসলিমদের ইসলামিক স্টাডিজ বাধ্যতামূলক করার পরিবর্তে পৃথক নীতি অনুসরণ করা হয়।
পাকিস্তানের সংবিধানেও বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষার্থীকে তার নিজের ধর্ম ছাড়া অন্য ধর্মের শিক্ষায় বাধ্য করা যাবে না। দেশটির আইনে ইসলামিক স্টাডিজ মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক হলেও অমুসলিম শিক্ষার্থীরা বিকল্প ধর্মীয় শিক্ষা বা নৈতিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পান। এ তথ্য যুক্তরাজ্য সরকারের কান্ট্রি পলিসি নোটে তুলে ধরা হয়েছে।
ইউরোপের চিত্রও বৈচিত্র্যময়। যুক্তরাজ্যে ধর্মীয় শিক্ষা অনেক স্কুলে বাধ্যতামূলক হলেও সেটি কোনো একক ধর্মের প্রচার নয়; বরং খ্রিস্টধর্মের পাশাপাশি ইসলাম, হিন্দুধর্ম, শিখধর্ম, ইহুদি ধর্মসহ বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে তুলনামূলক ও অ-প্রচারমূলক শিক্ষা দেওয়া হয়। পাশাপাশি অভিভাবক বা শিক্ষার্থীর জন্য নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অব্যাহতির সুযোগও রয়েছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন–এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায় শিক্ষার্থীরা নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ধর্মীয় পাঠ নির্বাচন করতে পারেন। অন্যদিকে ফ্রান্সের মতো দেশ ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মকে আলাদা বিষয় হিসেবে না পড়ে ইতিহাস, সাহিত্য বা সংস্কৃতির অংশ হিসেবে উপস্থাপন করে।
ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে বলা হয়েছে, ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও সেটি এমন হতে হবে যাতে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের প্রচার না হয় এবং শিক্ষার্থীর বিবেক ও ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়। আদালত তুরস্কের একটি মামলায় ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়বস্তু আরও বহুমাত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার সুপারিশের কথা উল্লেখ করেছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষজ্ঞরাও একই ধরনের অবস্থান নিয়েছেন। বাংলাদেশের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র চাইলে ধর্ম সম্পর্কে নিরপেক্ষ তথ্যভিত্তিক শিক্ষা পাঠ্যক্রমে রাখতে পারে; কিন্তু নির্দিষ্ট ধর্মের ধর্মীয় অনুশীলন বা ধর্মীয় নির্দেশনা শিক্ষার্থী বা অভিভাবকের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলক করা উচিত নয়।
শিক্ষাবিদদের একটি অংশ মনে করেন, ইসলামিক স্টাডিজ যদি ইতিহাস, সভ্যতা, দর্শন, সংস্কৃতি ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের আলোকে একটি একাডেমিক কোর্স হয়, তাহলে সেটি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীর জন্যও আগ্রহের বিষয় হতে পারে। কিন্তু যদি কোর্সের প্রকৃতি ধর্মীয় নির্দেশনামূলক বা বিশ্বাসভিত্তিক হয়, তাহলে সেখানে ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।
কালবেলার প্রতিবেদনে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদও বলেছেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামকে গুরুত্ব দেবে—এটি স্বাভাবিক। তবে সেই গুরুত্ব দিতে গিয়ে অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সম্মান, সমঅধিকার ও পারস্পরিক সম্প্রীতি যেন ক্ষুণ্ন না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক শিক্ষকও জানিয়েছেন, অতীতে এই দুটি বিষয় নন-ক্রেডিট হিসেবে পড়ানো হতো। তখন মুসলিম শিক্ষার্থীরা ইসলামিক স্টাডিজ এবং নন-মুসলিম শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশ স্টাডিজ পড়তেন। ফলে উল্লেখযোগ্য কোনো বিরোধ তৈরি হয়নি। নতুন সিদ্ধান্তে সেটিই বদলে যাচ্ছে।
এদিকে পূজা উদযাপন পরিষদ, নন-মুসলিম শিক্ষার্থী ও কয়েকটি শিক্ষক সংগঠন ইতোমধ্যে স্মারকলিপি দিয়েছে এবং মানববন্ধন করেছে। তাদের বক্তব্য, ইসলাম সম্পর্কে জানার বিরোধিতা নয়; বরং বাধ্যতামূলক করার নীতির পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।
আগামী আগস্টে নতুন শিক্ষাবর্ষের ক্লাস শুরু হওয়ার কথা। তার আগে একাডেমিক কাউন্সিলে যদি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা না হয়, তাহলে প্রথম বর্ষের সব শিক্ষার্থীকে এই কোর্সে নিবন্ধন করতে হবে। পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হলে প্রশাসনিক ও একাডেমিক জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কার কথাও সংশ্লিষ্টরা তুলে ধরছেন।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, ধর্মীয় পরিচয়, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষায়িত চরিত্র—এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম বা অন্যান্য ধর্ম নিয়ে উচ্চশিক্ষার কোর্স রয়েছে, কিন্তু ভিন্ন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের জন্য একক ধর্মভিত্তিক কোর্স বাধ্যতামূলক করার উদাহরণ তুলনামূলকভাবে বিরল; বরং নিজ ধর্মভিত্তিক বিকল্প, তুলনামূলক ধর্মশিক্ষা বা অব্যাহতির ব্যবস্থাই বেশি দেখা যায়।
খবরটি শেয়ার করুন