ফাইল ছবি
ভারতের কলকাতায় পলাতক জীবনেও রাজার হালে আছেন আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পরও দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক। স্ত্রীকে নিয়ে থাকছেন কলকাতার তপসিয়া এলাকার বিলাসবহুল একটি ফ্ল্যাটে। দামি গাড়িতে চলাফেরা করছেন। নিয়মিত যাচ্ছেন নামী বিপণিবিতানে। দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে বৈঠক করছেন। দেশে থাকা সম্পদ ও ব্যবসা থেকে আসা অর্থের জোগানেই তার এই জীবন চলছে বলে তথ্য পেয়েছে সুখবর ডটকম।
সুখবর ডটকমের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য আরও গুরুতর। বাংলাদেশ থেকে নানকের কাছে নিয়মিত অর্থ যাচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে। এ অর্থের একটি অংশ আসছে বরিশালে থাকা তার সম্পত্তি ও ব্যবসা থেকে। আরেকটি অংশ আসছে ঢাকার বাড়ি ও ব্যবসা থেকে। প্রতি মাসে পাঠানো অর্থের পরিমাণ এক কোটি টাকার বেশি বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন।
দেশ থেকে নানকের কাছে অর্থ যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করেছে। সেই তদন্তে অর্থ পাঠানোর তথ্য উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন শীর্ষ পর্যায়ের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। একই সময়ে ভারতীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও কলকাতায় নানকের কাছে অর্থ যাওয়ার তথ্য রয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে বিষয়টি বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাকে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান তারা।
দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে অর্থের উৎস, স্থানান্তরের পথ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। কলকাতায় নানকের এই বিলাসী জীবনের সঙ্গে তার দেশে থাকা সম্পদের যোগসূত্রের অভিযোগ নতুন নয়। বরিশাল ও ঢাকায় থাকা নানকের সম্পত্তি থেকে আসা অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে কলকাতায় পাঠানো হচ্ছে বলে দেশীয় গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে তপসিয়ায় তার অবস্থান, স্ত্রীকে নিয়ে জীবনযাপন এবং মাসে এক কোটি টাকার বেশি অর্থ যাওয়ার তথ্যও প্রকাশ করা হয়।
সুখবর ডটকমের অনুসন্ধানে জানা গেছে, বরিশাল থেকে পাঠানো অর্থের ক্ষেত্রে নগরীর সদর রোড ও কাঠপট্টি এলাকার দুই হুন্ডি ব্যবসায়ী ব্যবহৃত হচ্ছেন। তাদের একজন হোটেল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। অন্যজন স্বর্ণ ব্যবসার আড়ালে হুন্ডির কারবার করেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
নানকের বরিশালের বাড়ি, ভবন ও অন্যান্য সম্পত্তি থেকে পাওয়া ভাড়ার অর্থ তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। পরে তাদের মাধ্যমে সেই অর্থ ভারতে রুপিতে পৌঁছে দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি।
ঢাকার অর্থ পাঠানোর পথও আলাদা। বেনাপোল সীমান্তের একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ ভারতে পাঠানোর তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকার বিভিন্ন সম্পত্তি ও ব্যবসা থেকে আসা অর্থ প্রথমে যশোরে ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকের ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয়। পরে পশ্চিমবঙ্গে থাকা তার এজেন্টের মাধ্যমে কলকাতায় নানকের কাছে অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয় বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
এই ব্যবস্থাপনার সঙ্গে নানকের এক ছোট ভাই যুক্ত বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। আর বরিশালের অর্থের বিষয়টি দেখভাল করেন নানকের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি। তিনি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসরের পর নানকের মালিকানাধীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করেছিলেন। ৫ আগস্টের পর আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়লেও নানকের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।
নানকের দেশে থাকা সম্পদের মধ্যে বরিশালের সম্পত্তিই অর্থের বড় উৎস বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি। বটতলা, রুপাতলী, মতাসার, সার্কুলার রোড ও করিম কুটিরসহ বিভিন্ন এলাকায় তার জমি ও ভবন রয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন। এসব সম্পত্তির ভাড়া থেকে প্রতি মাসে বিপুল অর্থ আসে।
নানক ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ নামের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের একটি অংশও নানা দাপ্তরিক ব্যবস্থার আড়ালে বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়। ঢাকায় দশটি বাড়ি ও অন্যান্য ব্যবসা থেকেও অর্থ একই ব্যবস্থায় পাঠানো হচ্ছে বলে তাদের দাবি।
অর্থের উৎসের সঙ্গে নানকের ঘোষিত সম্পদের হিসাব মিলিয়ে দেখলেও প্রশ্ন তৈরি হয়। প্রথম আলোয় প্রকাশিত পুরোনো হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় নানক ও তার স্ত্রীর সম্মিলিত সম্পদ ছিল এক কোটিরও কম। কয়েক বছর পর তা আট কোটির বেশি হয়। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে তার সম্পদ বৃদ্ধির সঙ্গে স্ত্রীর সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছিল।
২০২৪ সালের নির্বাচনেও নানক নিজের নামে একাধিক বাড়ি ও সম্পত্তির তথ্য দেন। তার ঘোষিত সম্পদ কয়েক কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১৯ কোটিতে পৌঁছানোর তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। অথচ তার প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ ঘোষিত সম্পদের চেয়ে হাজার গুণ বেশি বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলাগুলোও নানকের আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নানক, তার স্ত্রী সৈয়দা আরজুমান বানু ও মেয়ে এস আমরীন রাখির বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং আইনে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন। মামলায় রাতুল টেলিকমের মাধ্যমে ২৫৯ কোটি ৬২ লাখ ৫ হাজার ১৫৮ টাকা বা ৩ কোটি ৩২ লাখ ৮৪ হাজার ৬৮১ মার্কিন ডলার পাচারের অভিযোগ আনা হয়।
মামলার তদন্তের স্বার্থে নানক, তার স্ত্রী ও মেয়ের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছিলেন আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশন আদালতকে জানিয়েছিল, তাদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এরপর নানক, তার স্ত্রী ও মেয়ের ৫৭টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই হিসাবে প্রায় ২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ছিল বলে আদালতে দেওয়া আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অর্থাৎ নানকের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই। রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি দমন সংস্থা এ নিয়ে মামলা করেছে। তদন্ত হয়েছে। ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ হয়েছে। এখন সেই নানকই ভারতে অবস্থান করছেন এবং বাংলাদেশ থেকে তার কাছে অর্থ যাওয়ার নতুন অভিযোগ সামনে এসেছে।
মামলা, অর্থ পাচারের অভিযোগ, ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ এবং বিদেশে অবস্থানের পর বাংলাদেশ থেকে অর্থ যাওয়ার নতুন তথ্য—সব মিলিয়ে নানকের আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন আরও গভীর হয়েছে। নানকের কলকাতায় পালিয়ে যাওয়ার পথ নিয়েও তিনি নিজেই একটি সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট তামাবিল সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশের পর শিলং, মালদা হয়ে কলকাতায় যাওয়ার কথা তিনি জানিয়েছিলেন। কলকাতায় যাওয়ার পর তপসিয়া এলাকায় আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা ফ্ল্যাটে স্ত্রীকে নিয়ে ওঠেন বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।
সেই ফ্ল্যাট এখন শুধু তার আবাস নয়। সেখান থেকেই আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি। পশ্চিমবঙ্গে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতারা সেখানে যান। কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে বৈঠক হয়। মাঝে মধ্যে ভিডিও বার্তাও দেওয়া হয়।
সুখবর ডটকমের অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য অনলাইন প্রচারণাতেও অর্থ ব্যয় করছেন নানক। তার বক্তব্য, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং নিজের পক্ষে ইতিবাচক প্রচারণা ছড়িয়ে দিতে একটি অংশ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে নিজের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টাও চালাচ্ছেন তিনি।
অন্যদিকে দেশে থাকা আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে থাকলেও তাদের পাশে নানকের দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম নেই বলে দলের কয়েক নেতা জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, নিজের নিরাপদ অবস্থান ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েই নানকের ব্যস্ততা বেশি।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে সম্প্রতি দেশে ফেরা আওয়ামী লীগের এক কর্মী পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে সুখবর ডটকমকে বলেন, হুন্ডির অর্থ নিতে নানককে তপসিয়ার ফ্ল্যাট থেকে বের হতে হয় না। নির্ধারিত ব্যক্তিরাই অর্থ পৌঁছে দেন। তার দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে এই ব্যবস্থা চলছে।
নানকের কলকাতার বিলাসী জীবন তাই কেবল একজন পলাতক নেতার ব্যক্তিগত জীবনযাপনের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশে থাকা সম্পদ, ব্যবসা, বাড়িঘরের ভাড়া, অর্থ স্থানান্তরের গোপন পথ এবং বিদেশে অর্থ পৌঁছানোর অভিযোগ। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও একই ধরনের তথ্য থাকার দাবি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে জাহাঙ্গীর কবির নানকের পরিচিত সব ফোন ও মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে সুখবর ডটকম। সব নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর দেননি তিনি।
একদিকে দেশে তার বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও দুর্নীতির মামলা চলছে। অন্যদিকে বিদেশে তিনি নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। এর মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে তার কাছে অর্থ যাওয়ার তথ্য দুই দেশের গোয়েন্দা পর্যায়ে আদান-প্রদানের দাবি সামনে এসেছে। ফলে এখন প্রশ্ন শুধু নানক কলকাতায় কীভাবে বিলাসী জীবন কাটাচ্ছেন, তা নয়। প্রশ্ন হলো—দেশে থাকা তার সম্পদের অর্থ কোন পথে সীমান্ত পেরিয়ে কলকাতায় যাচ্ছে, কারা সেই অর্থ সরবরাহ করছেন এবং এই পুরো ব্যবস্থার নেপথ্যে কারা রয়েছেন।
খবরটি শেয়ার করুন