ফাইল ছবি
আজ বৃহস্পতিবার পবিত্র ঈদুল আজহা। ভোরের আলো ফোটার আগেই যেন এক বিশেষ অনুভূতি নেমে আসে দেশজুড়ে। আকাশে নতুন দিনের আলো, বাতাসে মৃদু শীতলতা, মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসা তাকবিরের ধ্বনি আর মানুষের মুখে উৎসবের নির্মল হাসি—সব মিলিয়ে এ যেন শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং আত্মার ভেতরে আলো জ্বালানোর এক পবিত্র আহ্বান।
ঈদুল আজহা মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। কিন্তু এই উৎসবের সৌন্দর্য কেবল নতুন পোশাক, আনন্দ কিংবা কোরবানির আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়; এর গভীরে রয়েছে আত্মত্যাগ, আনুগত্য, মানবতা ও মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের এক মহিমান্বিত শিক্ষা। তাই এ উৎসব মানুষের বাহ্যিক জীবনের চেয়ে অন্তরের জগৎকে বেশি স্পর্শ করে।
আজ ভোর থেকেই দেশের শহর, নগর, গ্রাম—সবখানে এক অন্যরকম আবহ তৈরি হয়েছে। মসজিদের আঙিনা, ঈদগাহের মাঠ, খোলা প্রান্তর কিংবা পাড়ার ছোট্ট নামাজস্থল—সবখানেই মানুষের পদচারণায় মুখরিত পরিবেশ। কেউ সাদা পাঞ্জাবিতে, কেউ নতুন পোশাকে, কেউবা সাদামাটা সাজেই এগিয়ে যাচ্ছেন নামাজের উদ্দেশে। ধনী-গরিব, ছোট-বড়—সব পরিচয়ের দেয়াল যেন আজ কিছু সময়ের জন্য গলে যায়। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে যায় মানুষ, যেন সবাই এক বিশাল পরিবারের সদস্য।
ঈদের নামাজের আগে আকাশে বারবার উচ্চারিত হয় তাকবির—“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।” এই ধ্বনি শুধু শব্দ নয়, এটি বিশ্বাসের স্পন্দন; এটি মানুষের হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা আত্মসমর্পণের সুর। নামাজ শেষে মানুষ একে অপরকে আলিঙ্গন করে, শুভেচ্ছা বিনিময় করে। দীর্ঘদিনের অভিমান, দূরত্ব কিংবা ভুল বোঝাবুঝির বরফ গলতে শুরু করে ভালোবাসার উষ্ণতায়।
ঈদুল আজহাকে আমাদের দেশে অনেকে ‘কোরবানির ঈদ’ বলেও চেনে। কিন্তু কোরবানি মানে কেবল পশু জবাই নয়; কোরবানির প্রকৃত অর্থ হলো নিজের ভেতরের অহংকার, লোভ, হিংসা, স্বার্থপরতা ও অমানবিকতাকে ত্যাগ করা। এই শিক্ষা এসেছে ইসলামের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ঘটনা থেকে।
ইব্রাহিম (আ.)-এর জীবনের সেই ঘটনাটি মানব ইতিহাসে আত্মত্যাগের সবচেয়ে অনন্য দৃষ্টান্তগুলোর একটি। মহান আল্লাহর নির্দেশে তিনি নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু, নিজের প্রাণাধিক পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে কোরবানি করার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন। একজন পিতার হৃদয়ে কতটা ভালোবাসা থাকে সন্তানের জন্য, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কিন্তু আল্লাহর প্রতি তার আনুগত্য ছিল আরও গভীর, আরও নির্মল। আর সেই পরীক্ষায় সন্তুষ্ট হয়ে মহান আল্লাহ ইসমাঈল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি পশু কোরবানির ব্যবস্থা করেন।
সেই ঘটনার স্মৃতিকে ধারণ করেই যুগের পর যুগ মুসলমানরা কোরবানির মাধ্যমে নিজেদের আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করে আসছে। আজও সেই শিক্ষা মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বিষয়ও যদি সত্য ও ন্যায়ের পথে ত্যাগ করতে হয়, তবে তাতেই রয়েছে প্রকৃত সফলতা।
রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহসহ দেশের বিভিন্ন ঈদগাহ ও মসজিদে আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঈদের প্রধান জামাত। রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা, সাধারণ মানুষ, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি—সবাই সেখানে একত্রিত হচ্ছেন। কারণ ধর্মের সামনে মানুষের পরিচয় একটাই—সে একজন মানুষ, একজন বিশ্বাসী।
এদিকে ঈদকে ঘিরে দেশজুড়ে উৎসবের রঙ ছড়িয়ে পড়েছে। সরকারি-বেসরকারি ভবনগুলো আলোকসজ্জায় সেজেছে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো প্রচার করছে বিশেষ অনুষ্ঠান, বেতারে বাজছে ঈদের গান। হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা ও শিশু সদনে বিশেষ খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। কারণ ঈদের আনন্দ কেবল নিজের জন্য নয়; আনন্দের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায়।
ঈদুল আজহার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পবিত্র হজেরও গভীর সম্পর্ক। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে লাখো মুসলমান আজ সমবেত হয়েছেন পবিত্র ভূমিতে। আরাফাতের ময়দান, মুজদালিফা ও মিনার পবিত্র ভূমি আজ আবারও সাক্ষী হচ্ছে মানুষের অশ্রু, প্রার্থনা ও আত্মসমর্পণের। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন জাতি, ভিন্ন সংস্কৃতি—সবকিছুকে অতিক্রম করে মানুষ সেখানে এক হয়ে যাচ্ছে এক বিশ্বাসের ছায়াতলে।
এ বছর ঈদ উপলক্ষে দীর্ঘ ছুটিও শুরু হয়েছে। অনেকেই শহরের ব্যস্ততা ছেড়ে ফিরে গেছেন গ্রামের বাড়িতে, শৈশবের উঠোনে, মায়ের রান্নাঘরের গন্ধে, পরিচিত পথের স্মৃতিতে। বহুদিন পর পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে পাওয়ার আনন্দও যেন ঈদের আনন্দকে আরও গভীর করেছে।
তবে ঈদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এটিই—মানুষ হওয়া। ত্যাগের অর্থ কেবল সম্পদ নয়, কখনো নিজের অহংকার ত্যাগ করা, কখনো ক্ষোভ ভুলে ক্ষমা করা, কখনো অন্যের কষ্ট বুঝতে শেখা।
আজকের এই পবিত্র দিনে প্রার্থনা হোক—মানুষের হৃদয় থেকে বিদ্বেষ দূর হোক, বিভেদ মুছে যাক, পৃথিবী হয়ে উঠুক আরও শান্তিময়, আরও সুন্দর। কোরবানির রক্তে শুধু মাটিই রঞ্জিত না হোক, মানুষের অন্তরও শুদ্ধ হয়ে উঠুক ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও মানবতার আলোয়। পবিত্র ঈদুল আজহা আমাদের জীবনে বয়ে আনুক শান্তি, সৌহার্দ্য এবং আত্মত্যাগের সত্যিকারের মহিমা। ঈদ মোবারক।
খবরটি শেয়ার করুন