ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশে গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা ও রাজনৈতিক কাজে এসব সংস্থাকে ব্যবহারের প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার রাজশাহীতে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এক হয়ে দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে সরকারের কাছে ‘পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য’ রয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা। অন্যদিকে বিএনপির নেতারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই বক্তব্য দিয়েছেন। তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, কিংবা অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে, তা প্রকাশ্যে আসেনি।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার বিকেলে রাজশাহী মাদ্রাসা মাঠে জনসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের কয়েকটি স্থানে কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, “আমাদের কাছে গোয়েন্দাদের খবর আছে। আপনারা নিশ্চয়ই দেখেছেন দেশের কয়েকটি জায়গায় কয়েকটি কল-কারখানায় কিছু শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হয়েছে।”
এরপর আওয়ামী লীগ ও জামায়াতকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে যে, যে স্বৈরাচার পালিয়ে গিয়েছে, তারা সেখানে অর্থ সরবরাহ করছে। অর্থ সরবরাহ করে তারা কাদের সাহায্যে করছে?”
তিনি আরও বলেন, “দুই পক্ষ এক হয়েছে। একজন পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে, আরেকজন এখানে বসে অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করছে।”
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিবিসি বাংলার কাছে। জামায়াতের নেতাদের অভিযোগ, সরকার নিজের ব্যর্থতা আড়াল করতে বিরোধী দলের ওপর দায় চাপাচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপির নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে যোগাযোগ ও রাজনৈতিক সমঝোতার আশঙ্কার কথা তারা আগেও বলেছেন।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এমরান সালেহ প্রিন্স বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের সঙ্গে যোগসাজশ যে আছে সেই কথাটা আমরা আগেও বলেছি। প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান থেকে নিশ্চয়ই তার কাছে এরকম তথ্য আছে বলেই তিনি এই কথাগুলো বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী তো না জেনে কথা বলবেন না।”
প্রিন্সের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত একসঙ্গে এরশাদ সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। পরে ১৯৯৬ সালেও তারা বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেয়। বিএনপির নেতাদের একাংশের ধারণা, আওয়ামী লীগ ও জামায়াত আবারও বিএনপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে কাছাকাছি আসতে পারে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন বিবিসি বাংলাকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্তের ওপার থেকে আওয়ামী লীগ অর্থ পাঠাচ্ছে এবং বাংলাদেশের ভেতরে কেউ তা গ্রহণ করছে। এ ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্ব হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা।
তবে জামায়াতের নেতারা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন।
আজ বুধবার দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, বিরোধী দলের আন্দোলন উপেক্ষা করে সরকার আওয়ামী লীগকে আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
রাতে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে অভিযোগ করেন, জনদুর্ভোগ নিরসন ও অনিয়ম দমনের পরিবর্তে বিএনপি সরকার বিরোধী দলের চরিত্র হননে ব্যস্ত।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বিবিসি বাংলাকে বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ রাজধানীর গুলশানের মতো এলাকায় মিছিল করছে এবং বিভিন্ন স্থানে তৎপরতা চালাচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য নেই বলে তিনি অভিযোগ করেন।
জুবায়ের বলেন, প্রধানমন্ত্রী এমন একটি পদে থেকে এ ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন, যা দেখে তারা হতাশ হয়েছেন। তার অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকার অতীতে নিজেদের ব্যর্থতার দায় বিরোধীদের ওপর চাপাত। বর্তমান বিএনপি সরকারও একইভাবে নিজেদের ব্যর্থতার দায় আওয়ামী লীগের ওপর চাপাচ্ছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তোলেন, একজন প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে বিরোধী দলের ওপর নজরদারির ঘোষণা প্রকাশ্যে দিতে পারেন কি না।
রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দায়িত্ব ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। আওয়ামী লীগ টানা প্রায় ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকার সময় বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের নজরদারি, আটক এবং গোপন বন্দিশালায় নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এসব অভিযোগের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাঠামো, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক কলামে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যবহার ও অপব্যবহার নিয়ে লিখেছিলেন। ‘হাউ দ্য এক্স-পি-এম ইউজড অ্যান্ড অ্যাবিউজড ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিজ’ শিরোনামের ওই লেখায় তিনি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রাজনৈতিক ও দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা এবং স্বাধীন তদারকির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তার বক্তব্য ছিল, সংস্থাগুলোর দায়িত্ব ও ক্ষমতার সীমা স্পষ্ট না থাকলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেগুলোকে অপব্যবহার করার সুযোগ পায়।
গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্যও এ বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থায় দীর্ঘদিন কাজ করা এক সাবেক কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেন, রাষ্ট্রের জন্য গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের মূল দায়িত্ব জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই)। তবে সংস্থাটি যথেষ্ট শক্তিশালী না হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরকেও (ডিজিএফআই) রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে তার বক্তব্য।
ওই সাবেক কর্মকর্তার মতে, রাষ্ট্র পরিচালনার প্রয়োজনে সরকার গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে পেশাদারত্ব বজায় রাখা প্রয়োজন।
অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল ফজলে এলাহি আকবর বিবিসি বাংলাকে বলেন, “সরকার চাইলে তার প্রয়োজনে গোয়েন্দা সংস্থাকে কিংবা তাদের তথ্য ব্যবহার করতে পারে। প্রশ্নটা হলো, গোয়েন্দা সংস্থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে কি-না বা করে কি-না। এটা নির্ভর করে সরকারের ওপর।”
তিনি আরও বলেন, “তবে, যখন জনসম্মুখে সরকারপ্রধান কোনো তথ্য দিতে গিয়ে তার সোর্সকে এক্সপোজ করেন (প্রকাশ করে), তখন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে পরবর্তীতে কাজ করতে গিয়ে একটু বিপর্যয়ে পড়তে হয়।”
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে—সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্যে এ বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অর্থ সরবরাহ, নাশকতা বা অস্থিরতা তৈরির অভিযোগ উঠলে তা যাচাইয়ের জন্য প্রমাণ, তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার প্রয়োজন রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর সংশ্লিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে কোনো তদন্তের ফলাফল বা আনুষ্ঠানিক প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
খবরটি শেয়ার করুন