ছবিসূত্র: রয়টার্স
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আজ সোমবার (২৯শে ডিসেম্বর) ফ্লোরিডায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন। ভঙ্গুর গাজা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপে এগোনোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র চাপ দিচ্ছে বলে জানা গেছে। সূত্র: আলঅ্যারাবিয়া।
ট্রাম্পের বিলাসবহুল মার-এ-লাগো রিসোর্টে অনুষ্ঠেয় এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক এমন সময়ে হচ্ছে, যখন হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মকর্তা আশঙ্কা করছেন, ইসরায়েল ও হামাস উভয় পক্ষই যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর অনুরোধেই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প।
তিনি আগামী জানুয়ারির মধ্যেই গাজার জন্য একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট সরকার গঠনের ঘোষণা এবং একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের বিষয়টি সামনে আনতে আগ্রহী।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, দুই নেতার বৈঠক স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় অনুষ্ঠিত হবে। ইসরায়েলি সরকারের মুখপাত্র শোশ বেদ্রোসিয়ান জানান, বৈঠকে নেতানিয়াহু যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে আলোচনা করবেন। যেখানে নিশ্চিত করা হবে, হামাসকে নিরস্ত্র করা হবে এবং গাজাকে সামরিকীকরণমুক্ত করা হবে। তবে একই সঙ্গে নেতানিয়াহু তার এ বছরের পঞ্চম যুক্তরাষ্ট্র সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় ইরান প্রসঙ্গকে অগ্রাধিকার দিতে চাইবেন।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, তিনি তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে আরো মার্কিন হামলার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেবেন। বেদ্রোসিয়ান বলেন, ‘ইরান শুধু মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের জন্যই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও যে বিপদ তৈরি করছে, ওই বিষয়টিও নেতানিয়াহু তুলবেন।’ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রওনা হওয়ার আগে তিনি এ কথা জানান।
নেতানিয়াহুর এই সফর শেষ করছে পাম বিচে টানা কয়েক দিনের ব্যস্ত আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা। এরই মধ্যে রোববার ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, রাশিয়ার আগ্রাসন বন্ধের উপায় নিয়ে আলোচনার জন্য। গত অক্টোবরে গাজায় হওয়া যুদ্ধবিরতিকে ট্রাম্পের ক্ষমতায় ফেরার প্রথম বছরের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তার প্রশাসন ও আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা এই গতি ধরে রাখতে চাইছে।
চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্পের বৈশ্বিক দূত স্টিভ উইটকফ এবং তার জামাতা জ্যারেড কুশনার মিয়ামিতে মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার, মিসর ও তুরস্কের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
দুই নেতার এই বৈঠকের সময়টিকে ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেছেন ‘অ্যালায়েন্স ফর টু স্টেটস’-এর শান্তি নির্মাণ কমিশনের সহপ্রধান গারশোন বাসকিন। তিনি হামাসের সঙ্গে গোপন আলোচনায়ও অংশ নিয়েছিলেন।
তিনি এএফপিকে বলেন, ‘দ্বিতীয় ধাপ শুরু করতেই হবে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমার মনে হয় আমেরিকানরা বুঝতে পারছে, দেরি হয়ে গেছে। কারণ হামাস তাদের উপস্থিতি পুনর্গঠনের জন্য খুব বেশি সময় পেয়ে গেছে।’ ‘কোথাও এগোচ্ছে না’
যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপে হামাস ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার সময় আটক করা বাকি জিম্মিদের মৃত ও জীবিত অবস্থায় মুক্তি দেয়। হামাস এখন পর্যন্ত একজন জিম্মির মরদেহ ছাড়া বাকিদের সবাইকে ফিরিয়ে দিয়েছে। তবে উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে আসছে।
চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে ইসরায়েলের গাজায় নিজেদের অবস্থান থেকে সেনা প্রত্যাহার করার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে হামাসের অস্ত্র সমর্পণ করার কথা থাকলেও, এটিই সংগঠনটির জন্য সবচেয়ে বড় আপত্তির জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পর্যায়ে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড শাসনের জন্য একটি অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা রয়েছে। পাশাপাশি সেখানে একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স—আইএসএফ) মোতায়েনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস শুক্রবার (২৬শে ডিসেম্বর) জানিয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোস ফোরামে গাজা বিষয়ে একটি নতুন ‘বোর্ড অব পিস’-এর প্রথম বৈঠক ডাকতে চান, যার সভাপতিত্ব করবেন তিনি নিজেই। তবে একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে শান্তি প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার অভিযোগে ক্রমেই বিরক্ত হয়ে উঠছেন।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ইয়োসি মেকেলবার্গ বলেন, ‘মার্কিন প্রশাসন যে নেতানিয়াহুর ওপর ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ছে, এর লক্ষণ দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘প্রশ্ন হলো, তারা এ বিষয়ে কী করবে। কারণ এই মুহূর্তে দ্বিতীয় ধাপ কোথাও এগোচ্ছে না।’
অন্যদিকে, নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দিতে প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জুন মাসে ওই কর্মসূচির ওপর হামলা চালালেও, ইসরায়েলের আশঙ্কা, তেহরান আবারও তা পুনর্গঠন করছে। ইসরায়েল দাবি করেছে, গাজায় হামাসের লক্ষ্যবস্তু এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর অবস্থানে তারা এখনও হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যদিও সেখানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। আলোচনায় সিরিয়ার পরিস্থিতিও উঠে আসবে বলে জানা গেছে।
মেকেলবার্গের মতে, ইসরায়েল যখন একটি নির্বাচনী বছরে প্রবেশ করছে, তখন নেতানিয়াহু ইচ্ছাকৃতভাবেই গাজা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ইরান প্রসঙ্গে মনোযোগ ঘোরানোর চেষ্টা করতে পারেন। দীর্ঘদিনের এই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সবকিছুই ক্ষমতায় টিকে থাকার সঙ্গে যুক্ত।’
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন