ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান আল জাজিরার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, কখনো একজন নারী তার দলের প্রধান হতে পারবেন না। তার এই বক্তব্যের সমালোচনা করে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট হাসান ফেরদৌস বলছেন, জামায়াতের আমির বা তার মতো অন্য অনেকে নারীদের কেন নেতৃত্ব থেকে বাইরে রাখতে হবে, তার যুক্তি হিসেবে ইসলাম ধর্মের কথা বলেন। অথচ ইসলামের মহানবী (সা.)–এর সময় থেকেই নারীদের আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ভূমিকায় দেখি। যুদ্ধক্ষেত্রে সমরনায়কের ভূমিকায় দেখি। আধুনিক বিজ্ঞান এ কথা প্রমাণ করেছে যে মেয়েরা পুরুষের তুলনায় কোনো ক্ষেত্রেই অধম নয়, বরং উল্টো।
তিনি বলেন, বেগম রোকেয়া সুলতানার স্বপ্ন গ্রন্থে গল্পচ্ছলে দেখিয়েছেন, নারীদের যে নেতৃত্ব থেকে বাদ দেওয়া হয়, তার কারণ ধর্মীয় অনুশাসন বা নারীর জৈবিক প্রকৃতি নয়, স্রেফ নিজের সুবিধার জন্য পুরুষের বানানো নিয়মকানুন। জামায়াতের আমির মেয়েদের সন্তানধারণের যুক্তি দিয়েছেন। সে ক্ষমতা ‘বায়োলজিক্যাল’ বা জৈবিক প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে লিডারশিপ বা নেতৃত্ব প্রদানের কোনো সম্পর্ক নেই। নেতৃত্ব প্রদানের জন্য প্রয়োজন কৌশলগত বুদ্ধি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ও জটিল সময়ে ঠান্ডা মাথায় দলকে বা দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। এর প্রতিটি ক্ষেত্রে পুরুষদের চেয়ে নারী মোটেই কম দক্ষ নয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে, যেখানে তার ইতিহাসের একটা বড় সময় ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেছেন দুটি দলের প্রধান দুই নারী (শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া), সেখানে নারী দলীয় প্রধান বা সরকারপ্রধান হতে পারবেন না, এ কথা শুধু হাস্যকরই নয়; খুবই সেকেলে। এই দুই নারী প্রধান শুধু দাপিয়ে দেশ শাসন করেছেন, তা–ই নয়। অনেক পুরুষ সহকর্মীরা তাদের সঙ্গে কথা বলার আগে ‘স্যার’ যোগ করে সম্ভাষণ করতেন। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতসহ অন্তত ৩০টি দল যে ৩০০ আসনের ১টিতেও একজন নারী প্রার্থী দেয়নি, তা থেকেই স্পষ্ট—তাদের চোখে এই নারী-পুরুষের ফারাক কতটা গভীর।
তিনি বলেন, সমান বা অনেক ক্ষেত্রে অধিক দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও নারীদের কেন বাদ দেওয়া হয়, তার কারণ হায়ারার্কি বা সামাজিক স্তরবিন্যাস। প্রায় এক হাজার বছর আগে সে কথা জানিয়ে গেছেন বিখ্যাত ইসলামি পণ্ডিত আবু রুশদ। প্লেটোর রিপাবলিকান গ্রন্থের আরবি অনুবাদের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, জ্ঞান, পুণ্য বা নেতৃত্বের যোগ্যতায় নারী-পুরুষের কোনো ভেদ নেই। তবু যে নারীদের নেতৃত্ব থেকে বাদ দেওয়া হয়, তার কারণ সামাজিক নিয়মাবলি, প্রাকৃতিক বা দৈব নির্ধারিত কোনো নিয়ম নয়।
দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক উপসম্পাদকীয়তে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক, লেখক ও প্রাবন্ধিক হাসান ফেরদৌস এসব কথা বলেন। তার লেখাটি রোববার (১লা ফেব্রুয়ারি) প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছে 'জামায়াতের আমির ঠিক বলেননি...' শিরোনামে। তিনি প্রথম আলোর নিয়মিত কলাম লেখক।
হাসান ফেরদৌস লেখেন, একসময় নারী পুরুষের সমকক্ষ ছিল না, অনেক ক্ষেত্রে এখনো নয়। তার কারণ মেয়েদের সমকক্ষ হতে দেওয়া হয় না। শাসন ও অনুশাসন দুটোই পুরুষদের হাতে। অবস্থাটা একদম বদলে যায়, যদি মেয়েদের ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দেওয়া হয়। অথবা যদি পুরুষের সঙ্গে সমানতালে প্রতিযোগিতার পথটা কিছুটা সমতল করা হয়। সে সুযোগ পেয়েছে বলেই বাংলাদেশের মেয়েরা এখন ফুটবলে শিরোপা জিতছে। হিমালয়ের শৃঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা বহন করছে। দেশের নারী পুলিশ সদস্যরা হাইতির মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে যোগ্যতার সঙ্গে শান্তি রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি বলেন, মেয়েদের সামনে অনেক বাধা, অনেক দেয়াল। সে দেয়াল ভেঙে বাইরে বেরোতে পারলে মেয়েরা কেমন ফল দেখাতে পারেন, তার এক চমৎকার উদাহরণ শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েদের সাফল্য। বাংলাদেশে ছেলেদের তুলনায় এখন অধিক সংখ্যায় মেয়েরা শিক্ষার সুযোগ গ্রহণ করছেন। ২০২৪ সালের হিসাবে প্রাথমিক পর্যায়ে ছেলেদের ভর্তির হার যেখানে ছিল ৯০ শতাংশ, সেখানে মেয়েদের ৯৮ শতাংশ।
তিনি বলেন, আধুনিক বিজ্ঞান এ কথা প্রমাণ করেছে যে মেয়েরা পুরুষের তুলনায় কোনো ক্ষেত্রেই অধম নয়, বরং উল্টো। বুদ্ধিমত্তা সূচক বা আইকিউর ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমান হলেও মেয়েদের পক্ষে একই সঙ্গে সফলভাবে একাধিক কাজ করা সম্ভব (মাল্টিটাস্কিং)। একইভাবে মেয়েদের স্মৃতি ধারণক্ষমতা বেশি। কারণ, মেয়েদের মস্তিষ্কে বাঁ ও ডান অর্ধগোলকের মধ্যে যোগাযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর।
তিনি বলেন, একাত্তরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কথা ভাবুন। আরেকটি উদাহরণ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। ১৯৭৪-এ বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষের ওপর তার উপাত্তভিত্তিক গবেষণায় তিনি দেখিয়েছেন, সেই প্রবল দুর্যোগের সময় অনেক পরিবার টিকে ছিল প্রধানত সংসারের হাল মেয়েদের হাতে ছিল বলেই।
হাসান ফেরদৌস লেখেন, অপ্রতুল খাদ্য ব্যবহারের আগাম পরিকল্পনা, সংরক্ষণ, যথাযথ বণ্টন ও লম্বা টিকে থাকার পদ্ধতি উদ্ভাবনের মাধ্যমে তারা সন্তান, স্বামী ও স্বজনদের আগলে রেখেছেন। আজকের গাজা অথবা যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানের কথা ভাবুন। এসব অঞ্চলে অনেকেই হয়তো ভেসে যাবেন, ধুঁকে ধুঁকে মরবেন কিন্তু যারা বেঁচে যাবেন, তা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের সংসারের নারীদের যোগ্য নেতৃত্বের কারণে।
খবরটি শেয়ার করুন