ফাইল ছবি
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ের সফল নৌ কমান্ডো অভিযান অপারেশন জ্যাকপট নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র প্রায় দুই বছর ধরে পড়ে আছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আর্কাইভে। ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘অপারেশন জ্যাকপট’ মুক্তি এখনো অনিশ্চিত। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একাধিক বৈঠক হলেও এই অনিশ্চয়তা কাটেনি।
মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, সিনেমাটিতে ১৯৭১ সালের আগস্টে পরিচালিত গেরিলা অভিযান অপারেশন জ্যাকপটের প্রকৃত চিত্র যথাযথভাবে উঠে আসেনি, এমন অভিযোগ ওঠে। পাশাপাশি ইতিহাসগত অসামঞ্জস্য ও চিত্রনাট্যগত দুর্বলতার বিষয়ও আলোচনায় আসে। এসব কারণে সিনেমাটি মুক্তি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় আহমদ আযম খানকে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় সিনেমাটি জনসমক্ষে আনা হবে কি না, এ সিদ্ধান্ত সরকারের উচ্চপর্যায়ে উপস্থাপন করা হবে। সেখান থেকে অনুমোদন এলে সিনেমাটি প্রচার করা হবে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় অপারেশন জ্যাকপট সারা বিশ্বে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। শত্রুপক্ষ পাকিস্তানের মনোবলে আঘাত করেছিল অপারেশন জ্যাকপট। ১৯৭১ সালের ১৬ আগস্ট প্রথম প্রহরে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, মোংলা সমুদ্রবন্দর, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে একযোগে অভিযান চালান নৌ কমান্ডোরা।
এ অভিযানে পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অস্ত্র, খাদ্য ও তেলবাহী ২৬টি জাহাজে মাইন স্থাপন করে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। মুক্তিযুদ্ধে নৌ কমান্ডোদের বীরত্বগাথা চলচ্চিত্রে তুলে ধরতে আওয়ামী লীগ সরকার এই চলচ্চিত্রের প্রকল্প হাতে নেয়।
সিনেমাটি পরিচালনার দায়িত্ব পান নির্মাতা দেলোয়ার জাহান ঝন্টু ও কলকাতার রাজীব কুমার। দরপত্রের মাধ্যমে কিবরিয়া ফিল্মস ২১ কোটি টাকায় নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায়। প্রযোজক ছিলেন অন্তর শোবিজের কর্ণধার স্বপন চৌধুরী।
এই গেরিলা অভিযানে অংশগ্রহণকারী অসমসাহসী কোনো মুক্তিযোদ্ধা শত্রুপক্ষের হাতে ধরা পড়েননি। তাই যুদ্ধ চলাকালে বাঙালির শৌর্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিল অপারেশন জ্যাকপট।
অপারেশন জ্যাকপটের বীরত্বগাথা চলচ্চিত্রে তুলে ধরতে অপারেশন জ্যাকপট নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ প্রথমে নেওয়া হয়েছিল ২০১৭ সালে। তখন নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে ৩০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়, নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয় নির্মাতা গিয়াসউদ্দিন সেলিমকে। তবে সেই প্রকল্পও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি।
এরপর ২০২২ সালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় নতুন প্রকল্প হাতে নেয়। তখনকার পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান নিজ ক্ষমতাবলে ২৩ কোটি টাকার এই প্রকল্পের অনুমোদন দেন।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় সাহসী অভিযান অপারেশন জ্যাকপট নিয়ে জনসাধারণের জন্য তথ্যনির্ভর ও বিনোদনমূলক চলচ্চিত্র নির্মাণ করা।
এই সিনেমায় দর্শকের কাছে পরিচিত, এমন শতাধিক অভিনেতা-অভিনেত্রী কাজ করেছেন। মুখ্য চরিত্রগুলোর মধ্যে আছেন—ইলিয়াস কাঞ্চন, অমিত হাসান, অনন্ত জলিল, রোশান, ইমন, নিরব, শিপন মিত্র, সাঞ্জু জন, জয় চৌধুরী ও আমান রেজা। এ ছাড়া আছেন মিশা সওদাগর, আহমেদ শরীফ, ডন, ড্যানি সিডাকসহ আরও অনেকে।
সিনেমাটি এখনো মুক্তি না পেলেও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কিবরিয়া ফিল্মসকে পুরো অর্থ ২১ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, সিনেমাটিতে ১৯৭১ সালের আগস্টে পরিচালিত গেরিলা অভিযান অপারেশন জ্যাকপটের প্রকৃত চিত্র যথাযথভাবে উঠে আসেনি, এমন অভিযোগ ওঠে।
পাশাপাশি ইতিহাসগত অসামঞ্জস্য ও চিত্রনাট্যগত দুর্বলতার বিষয়ও আলোচনায় আসে। এসব কারণে সিনেমাটি মুক্তির সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়।
২০২৪ সালের জুনে নির্মাণ শেষ করে সিনেমাটি মন্ত্রণালয়ে জমা দেয় কিবরিয়া ফিল্মস। তখন মন্ত্রণালয় থেকে বেশ কিছু বিষয় সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ফারুক ই-আজম সিনেমাটি নিয়ে একাধিক বৈঠক করেন।
দুই ঘণ্টা ১০ মিনিটের সিনেমাটি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সামনে প্রদর্শন করা হয়। বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনেকেই এর চিত্রনাট্য, চরিত্র নির্মাণ ও ঐতিহাসিক উপস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কারও মতে, এতে ইতিহাসের ব্যত্যয় রয়েছে। এসব পর্যবেক্ষণের পর উপদেষ্টা ছবিটি জনসাধারণের কাছে প্রচারে নিষেধ করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেমন সংশোধনের কথা বলা হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও একই ধরনের পর্যবেক্ষণ আসে। সমালোচনার আশঙ্কায় সিনেমাটি আর জনসমক্ষে আনা হয়নি। বর্তমানে এটি আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে।
‘অপারেশন জ্যাকপট’ সিনেমার প্রযোজক স্বপন চৌধুরী বলেন, ভুলভ্রান্তি থাকলে তা সংশোধন করে চলচ্চিত্রটি মুক্তি দেওয়া যেতে পারে। সেন্সর বোর্ডে যাওয়ার পরও অনেক চলচ্চিত্রে সংশোধন হয়।
স্বপন চৌধুরী বলেন, দেশের স্বার্থে, চলচ্চিত্রের স্বার্থে সিনেমাটি মুক্তি পাওয়া জরুরি। সংশোধন করে হলেও সেটি দর্শকের সামনে আনা উচিত। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে এটি নিয়ে খুব ভাবনা ছিল না। নতুন সরকার সদ্য দায়িত্ব নিয়েছে।
‘অপারেশন জ্যাকপট’ মুক্তির বিষয়ে নতুন সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে জানান প্রযোজক স্বপন চৌধুরী।
সব মিলিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কে কেন্দ্র করে নির্মিত উচ্চ বাজেটের এই চলচ্চিত্রটি এখন নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। ইতিহাসের যথাযথ উপস্থাপন নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক উপস্থাপনাকে সামনে আনার এই দ্বৈত চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে আছে ‘অপারেশন জ্যাকপট’। সংশোধনের মাধ্যমে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাবে, নাকি আর্কাইভেই থেকে যাবে—তা এখন নির্ভর করছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপর।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন