ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদকে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নতুন পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ তিন ব্যক্তি।
আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের মাস খানেকেরও কম সময় আগে তাদের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইনের পর্ষদে যুক্ত করার আদেশ এসেছে। জাতীয় নির্বাচনের আর এক মাসও নেই; এমন একটা সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারে থাকা দুইজনের পাশাপাশি একজন সচিবকে এমন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক নিয়োগ করা নিয়ে একাধারে বিস্ময় ও প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে।
এর আগে গত ২৬শে আগস্ট বিমানের পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন, যিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বেও রয়েছেন। মন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টার দায়িত্বে থেকে নিজের মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা একটি কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে তার এ নিয়োগ নিয়ে অনেকেই তখন প্রশ্ন তোলেন।
উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনসহ বিমানে নতুন তিন পরিচালক নিয়োগে সরকারের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যগুলো কী কী, ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই প্রশ্ন উঠেছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলছেন, 'অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে খলিলুর রহমান, ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব ও আখতার আহমেদকে বিমানের পরিচালক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তে আমি বিস্মিত হয়েছি।'
তিনি আরও বলেন, 'আমার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক এজেন্ডা থাকতে পারে, যার মধ্যে বোয়িংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ এই প্রতিষ্ঠান থেকে বিমান নতুন উড়োজাহাজ কিনতে যাচ্ছে।'
বিমানের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র সুখবর ডটকমকে যে তথ্য দিয়েছে, এর সঙ্গে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলমের ধারণার মিল পাওয়া যাচ্ছে। সূত্র জানায়, নতুন তিনজনকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা। কারণ এই প্রতিষ্ঠান থেকে বিমান কেনা হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের আলোচনা ও যাচাই-বাছাই শেষে বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। গত ৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বিমানের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
বিমান সূত্র জানায়, সব ধরনের সরকারি অনুমোদন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হলে বোয়িংয়ের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি সই হবে। এরপর ধাপে ধাপে নতুন উড়োজাহাজ সরবরাহ শুরু করবে বোয়িং। অন্তর্বর্তী সরকার মনে করছে, নতুন তিনজনকে পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়ায় এই কার্যক্রম তরান্বিত হবে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। দেশের গণমাধ্যমে আগেই আলোচনা হয়েছিল, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং সরকারের রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমানের ওয়াশিংটন সফরে দেশের নির্বাচন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি ট্রাম্প ঘোষিত শুল্ক চুক্তিসংক্রান্ত বিষয়গুলোও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর ইউরোপের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসও এই দেশে তৎপরতা বাড়ায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতেরা কূটনৈতিকভাবে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ বিক্রির পক্ষে তৎপরতা চালালেও শেষ পর্যন্ত বোয়িংই চূড়ান্তভাবে এগিয়ে থাকে।
বিমান সূত্র জানায়, কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া ১৪টি উড়োজাহাজের মধ্যে রয়েছে ৮টি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, ২টি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং ৪টি বোয়িং ৭৩৭-৮ মডেলের বিমান। নতুন এসব উড়োজাহাজ যুক্ত হলে দেশের আন্তর্জাতিক রুটে সংযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি বহরের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে পাবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
সূত্র আরও জানায়, ২০২৫ সালের ২৪শে নভেম্বর বোয়িং আনুষ্ঠানিকভাবে উড়োজাহাজ বিক্রি ও ডেলিভারি-সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠায়। পরে ২০শে ডিসেম্বর সংশোধিত খসড়া চুক্তি পাঠানো হলে তা পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয়। বৈঠকে প্রস্তাবিত মূল্য ও শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা করে নীতিগতভাবে সম্মতি দেওয়া হয় এবং আনুষ্ঠানিক আলোচনায় এগিয়ে যাওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়।
তবে বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, খলিলুর রহমান, ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব ও আখতার আহমেদের এভিয়েশন ব্যবসার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা বা অতীতে কোনো যুক্ততাও ছিল না। তার ওপর জাতীয় নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনের এই সময়ে নির্বাচন কমিশন সচিবের অন্যদিকে মনোযোগ দেওয়ার মতো সময়ও পাওয়ার কথা নয়। বাকি দুজনেরও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।
হঠাৎ তিনজনকে বিমানে পরিচালনা পর্ষদে আনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে ও সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অনেকে বলছেন, পরিচালনা পর্ষদে এমন তিনজনকে যুক্ত করা হয়েছে, যাদের একজন জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত, একজন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। আরেকজন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দুটি মন্ত্রণালয় নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।
এ বিষয়ে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, এ সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো, তা বোঝা কঠিন। তিনি বলেন, এমন তিনজনকে পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত করা হয়েছে, তিনজনই এই মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত। তারা নিজেদের কাজ করে কখন আবার বিমানে সময় দেবেন।
তিনি বলেন, তা ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারেরও মেয়াদ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। হয়তো বিমান নিয়ে সরকারের কোনো বড় ধরনের চিন্তা বা পরিকল্পনা থাকতে পারে। কিন্তু সেটা নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১০টি এয়ারবাস কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক এড়াতে এয়ারবাসের পরিবর্তে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
আওয়ামী লীগের সরকারের আমলেও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কাছে উড়োজাহাজ বিক্রির প্রস্তাবনা দেয় মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং।
২০২৪ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে তৎকালীন বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রী মোহাম্মদ ফারুক খানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস এ প্রস্তাব দেন।
খবরটি শেয়ার করুন