ছবি: সংগৃহীত
একসময় দেশের টেলিভিশন নাটকের প্রধান শক্তি ছিল পারিবারিক গল্প। যৌথ পরিবারের টানাপোড়েন, সম্পর্কের উষ্ণতা, ছোট ছোট আবেগ—এসব নিয়েই তৈরি হতো অসংখ্য জনপ্রিয় নাটক। আমজাদ হোসেন, আবদুল্লাহ আল মামুন, আতিকুল হক চৌধুরী কিংবা হুমায়ূন আহমেদের মতো নির্মাতাদের হাত ধরে এই ধারা পেয়েছিল বিশেষ উচ্চতা। সেই নাটকগুলো এখনো দর্শকের স্মৃতিতে জীবন্ত।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ধারার নাটক চোখে পড়ছে কম। কেন কমে গেল পারিবারিক গল্পের নাটক—এই প্রশ্নে নির্মাতাদের ব্যাখ্যায় উঠে এসেছে সময়, প্রযুক্তি ও দর্শকমানসের পরিবর্তনের চিত্র।
নির্মাতা গিয়াস উদ্দিন সেলিম মনে করেন, একসময় পারিবারিক নাটকের চাহিদা ছিল তুঙ্গে। বিটিভির সময় থেকে শুরু হয়ে দীর্ঘদিন এই ধারা অব্যাহত ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের আগমনে নাটকের ধরন বদলে যায়।
তিনি বলেন, একসময় নাটক পুরোপুরি নায়ক-নায়িকানির্ভর হয়ে পড়ে, যার ফলে চরিত্রাভিনেতাদের কাজ কমে যায়। এই পরিবর্তনও পারিবারিক নাটক কমে যাওয়ার একটি কারণ। তবে তিনি আশাবাদী—পরিস্থিতি কিছুটা বদলাচ্ছে, ধীরে ধীরে আবার পারিবারিক গল্প ফিরে আসছে, যদিও তা আগের তুলনায় খুবই সীমিত।
তার মতে, দর্শক এখনো ভালো গল্পই চান এবং পারিবারিক নাটকেই জীবনের প্রতিফলন সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়।
অভিনেতা-নির্মাতা সালাহউদ্দিন লাভলু মনে করেন, পারিবারিক নাটক দেশের নাট্যধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। তিনি বলেন, একসময় এ দেশের দর্শকেরা এই ধরনের নাটকই বেশি দেখতেন এবং অগ্রজ নির্মাতারা এই ধারায় অসাধারণ কাজ করে গেছেন, যেগুলো আজও কালজয়ী।
লাভলু নিজেও গ্রামের গল্পভিত্তিক নাটক নির্মাণ করলেও সেখানে পারিবারিক বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তার প্রশ্ন, কীভাবে এই ধারার নাটক কমতে শুরু করল—এর দায় কার? তবে তিনি মনে করেন, সদিচ্ছা থাকলে পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা এখনো সম্ভব।
নির্মাতা অরণ্য আনোয়ার বিষয়টি দেখছেন সমাজের পরিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকে। তার মতে, একসময় দেশের অধিকাংশ মানুষ যৌথ পরিবারে বসবাস করত। ফলে পারিবারিক গল্প ছিল জীবনেরই প্রতিফলন এবং দর্শকরাও তা সহজে গ্রহণ করতেন। কিন্তু এখন যৌথ পরিবার প্রায় নেই বললেই চলে; মানুষ আলাদা হয়ে বসবাস করছে। ফলে নাটকেও সেই সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটছে।
তিনি বলেন, একেবারেই যে পারিবারিক নাটক হচ্ছে না, তা নয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি সাম্প্রতিক একটি পারিবারিক ঘরানার নাটকের দর্শকপ্রিয়তার কথা উল্লেখ করেন। তবে সামগ্রিকভাবে আবেগনির্ভর এই গল্পগুলো আগের মতো আর তৈরি হচ্ছে না।
নির্মাতা অনিমেষ আইচ পারিবারিক নাটক কমে যাওয়ার পেছনে সৃজনশীল ঘাটতির কথাও উল্লেখ করেন। তার মতে, ভালো নাট্যকার ও পরিচালকের অভাব একটি বড় কারণ।
তিনি বলেন, এখন অনেকেই মনে করেন, নাটকে তারকা থাকলেই চলবে। আবার কেউ কেউ ভাবেন, পারিবারিক নাটকে হয়তো ‘ভিউ’ কম হবে। এই ভিউ-নির্ভর মানসিকতা নাটকের বিষয়বস্তুকে প্রভাবিত করছে।
তার ভাষায়, যখন ভিউয়ের পেছনে দৌড়ানো হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই পারিবারিক গল্প কমে যায়। অথচ শক্তিশালী পারিবারিক গল্প হলে তা এখনো দর্শকের মন জয় করতে পারে।
অভিনেতা ও নির্মাতা সোহেল আরমান বিষয়টি দেখছেন দর্শকের রুচি ও বিনোদনের মাধ্যমের পরিবর্তনের আলোকে। তিনি বলেন, একসময় নির্মাতাদের নামেই নাটক চলত এবং লাখো দর্শক তা দেখতেন। কিন্তু এখন ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ায় বিনোদনের ধরন বদলে গেছে। অনেকেই এখন ‘ভাইরাল’ হওয়ার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।
তার মতে, ‘ভাইরাল’ শব্দটির মধ্যেই এক ধরনের নেতিবাচকতা আছে—নেতিবাচক কোনো বিষয় সাময়িকভাবে জনপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের মান বিচার করা যায় না। এই প্রবণতাও পারিবারিক নাটক কমে যাওয়ার একটি কারণ বলে মনে করেন তিনি।
সব মিলিয়ে নির্মাতাদের কথায় স্পষ্ট—পারিবারিক নাটক কমে যাওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তার, দর্শকের রুচির বদল, ভিউ-নির্ভরতা এবং সৃজনশীল ঘাটতি—সবকিছু মিলিয়েই এই পরিবর্তন ঘটেছে।
তবু নির্মাতাদের অনেকেই মনে করেন, ভালো গল্প ও আন্তরিক প্রয়াস থাকলে পারিবারিক নাটকের ঐতিহ্য আবারও ফিরিয়ে আনা সম্ভব। দর্শক এখনো জীবনের কাছাকাছি গল্পই খোঁজেন—সেই জায়গা থেকেই হয়তো আবার নতুন করে শুরু হতে পারে পারিবারিক নাটকের পথচলা।
খবরটি শেয়ার করুন