শনিবার, ৩০শে আগস্ট ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
১৪ই ভাদ্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ঢামেকে এক ঘণ্টা অবরুদ্ধ আসিফ নজরুল, বেরোলেন বাগান গেট দিয়ে *** কাকরাইলে দুটি রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষে সৃষ্ট সহিংস পরিস্থিতি প্রসঙ্গে আইএসপিআরের বক্তব্য *** আসিফ নজরুলকে 'ভণ্ডামি বাদ দিতে' বললেন হাসনাত আবদুল্লাহ *** অনলাইনে মিথ্যা তথ্য দিয়ে পণ্য বিক্রি করলে জেল ও জরিমানা *** মুরগি খাওয়া রোধে পাতা ফাঁদে ধরা পড়ল মেছো বাঘ *** আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির সময় তাহলে ফুরিয়ে এল *** লতিফ সিদ্দিকী যা বললেন আদালতে *** ভারতে ইসলাম থাকবে, মানিয়ে নিতে শিখুন: আরএসএস প্রধান *** আটকের ১২ ঘণ্টা পর মামলা লতিফ সিদ্দিকী, শিক্ষক কার্জনসহ ১৬ জন কারাগারে *** নির্বাচনী কর্মকর্তাদের জুতার মালা ও জেলের কথা মনে করিয়ে দিলেন ইসি

শান্তি অন্বেষণে ক্ষমার গুরুত্ব

উপ-সম্পাদকীয়

🕒 প্রকাশ: ০৩:২৬ অপরাহ্ন, ৪ঠা আগস্ট ২০২৫

#

প্রতীকী ছবি

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ

পৃথিবীতে এমন কেউ নেই যে বা যিনি, সে বা তিনি 'শান্তি'-র অন্বেষণ করেন না বা করেননি। জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আমরা 'শান্তি'-র সন্ধানে লিপ্ত। ছোট্ট একটা শব্দ 'শান্তি', কিন্তু এর গভীরতা ব্যাপক বিস্তৃত। যেমন মানসিক শান্তি, আর্থিক শান্তি, শারীরিক শান্তি, পারিবারিক শান্তি, বিভোর যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণের শান্তি। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে, বিভিন্ন চাহিদায় বিদ্যমান থাকে শান্তির চর্চা।

ছোট্র ও গভীর এই 'শান্তি' শব্দটি আসলে কী? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। এমনকি উইকিপিডিয়াও এই প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ। আমেরিকান সাহিত্যিক ম্যারিয়ান উইলিয়ামসন বলেছেন, 'ক্ষমা করা সবসময় সহজ নয়। অনেক সময় যে আঘাত করেছে, তাকে ক্ষমা করা আমাদের ভোগ করা আঘাতের চেয়েও বেশি বেদনাদায়ক মনে হয়। তবুও ক্ষমা ছাড়া শান্তি নেই।' অর্থাৎ 'শান্তি' পেতে হলে 'ক্ষমা' করতে হবে। বিষয়টি অনেকটা 'কাটা দিয়ে কাঁটা তোলা'-র মতো।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা'র এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন কারণে সারা বিশ্বে মানসিক রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। গবেষকরা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি একটি বৈশ্বিক সমস্যা, যা সমাজের সব স্তরের মানুষকে প্রভাবিত করে।

মানসিক রোগ যেমন; বিষণ্ণতা, উদ্বেগ এবং সিজোফ্রেনিয়া'র লক্ষণগুলো রয়েছে, এমন রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক। আরও বেশি উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, রোগাক্রান্ত মানুষ বুঝতে এবং মানতে চান না যে, তিনি ভয়ানক রোগে ভুগছেন। এই ধরনের রোগীর সংখ্যা বাড়লেও এর চিকিৎসা ব্যবস্থা সন্তোষজনক নয়। এমন প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ইউনেস্কো মানুষের মানসিক চাপ কমাতে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে।

ইউনেস্কো এই মর্মে সিদ্ধান্ত নেয় যে, সার্বিক সুস্থতার জন্য 'ক্ষমা'-র বিশেষ দিকগুলোর আলোকপাত করতে হবে। এই বিষয় সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। ইউনেস্কো ১৯৯৮ সালে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় গড়ে তোলে, 'বডি অ্যান্ড মাইন্ড ওয়েলনেস ক্লাব'। এখানে মানসিক রোগের চিকিৎসক এবং গবেষকদের বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এটি এমন একটি সামাজিক সুস্থতার ক্লাব, যা বিভিন্ন ধরনের শারীরিক কার্যকলাপ, মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ প্রদান করে। ক্লাবটি শরীর ও মনের যোগসূত্র স্থাপন করে। মানুষের সামগ্রিক সুস্থতা প্রদানে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি ধাপ নির্ধারণ করেন। যেমন; ১. শারীরিক সুস্থতা; ২. মানসিক সুস্থতা; ৩. সামাজিক সুস্থতা; ৪. সাংস্কৃতিক বিনিময়; ৫. ব্যক্তিগত উন্নয়ন; ৬. যোগাযোগ ও সহযোগিতা।

খ্যাতিমান মনোবিজ্ঞানী ড. অদ্বৈত গুজ ইউনেস্কোর এই উদ্যোগ প্রসঙ্গে এক জার্নালে লিখেছেন, "আমাদের জীবনে 'ক্ষমা'-র গুরুত্ব নিয়ে চিন্তা করার সময় এসেছে। এটি আমাদের বিরক্তি, রাগ এবং ক্ষোভ ত্যাগ করতে এবং অন্যদের পাশাপাশি নিজেদের প্রতি সহানুভূতি এবং 'ক্ষমা' প্রসারিত করতে উৎসাহিত করে। 'ক্ষমা'-র গভীর নিরাময় শক্তি এবং ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষমতা, বিভিন্ন রোগ নিরাময়ের প্রচার এবং ব্যথার চক্র ভাঙার সম্ভাবনা তুলে ধরতে হবে। 'ক্ষমা' মানে ক্ষতিকারক কাজের অতীত ভুলে যাওয়া নয়। এটি আমাদের চাপে থাকা আবেগগত বোঝা থেকে মুক্তি পাওয়ার একটি ব্যক্তিগত এবং সম্মিলিত পছন্দ। 'ক্ষমা' গ্রহণের মাধ্যমে, আমরা ক্ষতকে জ্ঞানে, ঘৃণাকে করুণায় এবং দ্বন্দ্বকে বিকাশ ও বোধগম্যতার সুযোগে রূপান্তর করতে পারি। আমরা ক্ষমার বিপরীতে 'শান্তি'-র অসাধারণ সম্ভাবনা প্রত্যক্ষ করি, যা বিভেদ দূর করে সেতুবন্ধন তৈরি করে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, 'ক্ষমা' ব্যক্তিগত অভিযোগকে অতিক্রম করে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং এমনকি ঐতিহাসিক স্তরেও প্রসারিত হতে পারে।"

তিনি আরও লিখেছেন, "সমাজ পুনর্মিলন এবং নিরাময়ের পথ তৈরি করতে ক্ষমাশীল হওয়া মনুষ্যত্বের প্রতিবিম্ব। সুরেলা ভবিষ্যতের পথ প্রশস্ত করতে 'ক্ষমা' করার প্রতিযোগিতা এবং নিয়মিত চর্চা করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাপী সংঘাত নিরসন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় 'ক্ষমা' একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। 'ক্ষমা'-র একক নিজস্বতায়, সহিংসতার চক্র ভাঙার তীব্র শক্তি রয়েছে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সংঘাত পর্যন্ত 'ক্ষমা' প্রদানের সহানুভূতি, সংলাপ এবং সাধারণ ভিত্তি খুঁজে বের করার জন্য সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তিকে লালন করে।"

'পিস অব মাইন্ড থ্রো ফরগিভিং' নামের একটি বেসরকারি সংস্থা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সেবা প্রদানকারী এই সংস্থাটির মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে, 'ক্ষমা করার মাধ্যমে মনের শান্তি'! সংস্থাটি ২০০০ সাল থেকে কাজ করছে। সংস্থাটির উদ্যোগতা ড. জিম ডিনকালসি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, 'আমার দেখা এক স্বপ্ন থেকে উদ্ভূত হয়েছিল যে মানুষ একে অপরকে ক্ষমা করতে সাহায্য করবে। এই বিশ্বাস নিয়ে আমি কাজ শুরু করি। ধীরে ধীরে আমার কাজে সফলতা অর্জন করতে থাকি, যা আমার জন্য গর্বের ও অহংকারের। এখন আমার সাথে কয়েকজন কর্মী যুক্ত হয়েছেন। ফলে, আমি এবং আমার বন্ধুসুলভ সহকর্মীরা মিলে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলেছি।'

তিনি বলেন, "এই কেন্দ্রে আমরা 'ক্ষমা' করার উপকারিতা সম্পর্কে শিক্ষত করা, 'ক্ষমা' করতে বাধা দেয় এমন শিক্ষা বর্জন করা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে 'ক্ষমা' করার গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে চেষ্টা করি। আমরা কেবল ক্ষমা এবং স্নায়ুবিজ্ঞানের উপর নয়। মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং নৃবিজ্ঞানের অন্যান্য ক্লিনিকাল গবেষণার বিভিন্ন নিবন্ধ নিয়ে আলোচনা করি। নোবেল শান্তি পুরষ্কার বিজয়ী, আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু এবং তার মেয়ে আমাদের সংস্থাটি সম্পর্কে 'পঁচিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমা করতে সংগ্রামরত লোকদের পরামর্শ এবং শিক্ষা দেওয়ার জন্য' শীর্ষক গ্রন্থে আমাদের কার্যক্রম সমন্ধে আলোকপাত করেছেন। আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ।"

এ কথা অনস্বীকার্য যে 'ক্ষমা' সবসময় সহজ বা তাৎক্ষণিক নয়। এর জন্য প্রয়োজন করুণা, নম্রতা এবং নিরাময়ের প্রতি অঙ্গীকার। আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে 'ক্ষমা'-কে আলিঙ্গন করে এবং বিশ্বব্যাপী এটি প্রচার করে, আমরা আরও সহানুভূতিশীল এবং শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারি। 'ক্ষমাশীলতা' আমাদের আরোগ্য করার এবং বিভেদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করার একটি শক্তিশালী স্মারক হিসেবে কাজ করে। এটি আমাদের পার্থক্য অতিক্রম করতে, সাধারণ ভিত্তি খুঁজে বের করতে এবং এমন একটি ভবিষ্যতের কল্পনা করতে উৎসাহিত করে যেখানে 'ক্ষমা' স্থায়ী 'শান্তি' এবং বোঝাপড়াকে উৎসাহিত করে। 

পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে হোঁচট খেতে হবে। শতভাগ আশা-আকাঙ্খা, না পাওয়ার বেদনায় তাড়িত হতে হয়েছে, হয় এবং অবধারিতভাবে হতে হবে। চারপাশের মানুষদের অনেকের সাথে মতপার্থক্য তৈরি হবে। প্রায় প্রতিদিন এমন কিছু ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়, যা একেবারেই অপ্রত্যাশিত। তবুও আমরা টিকে থাকি। অনেকটা বাধ্য হয়েই বেঁচেও থাকি। আর এই বেঁচে থাকার অন্যতম নিয়ামক হলো 'শান্তি'। কাউকে দোষারোপ না করে 'ক্ষমা'-র মাধ্যমে হয়তো কিছুটা শান্তির ছোঁয়া পেলেও পাওয়া সম্ভব। ক্ষমা হোক আমাদের প্রতিদিনের চর্চা, চলমান থাকুক শান্তির অন্বেষণ।।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন