ভারতের দ্য ওয়ারের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও বিশিষ্ট সাংবাদিক সিদ্ধার্থ ভারাদারাজন। ফাইল ছবি
নিজের পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতা ও বিতর্ক এড়িয়ে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে চিত্রিত করা ভারত সরকারের জন্য সুবিধাজনক ছিল। জুলাই বিপ্লবের প্রথম সপ্তাহে ভারত সরকার চুপচাপ থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে গুজব ছড়াতে দিয়েছিল।
‘বেঙ্গল ডেলটা কনফারেন্স ২০২৫’–এ অংশ নিয়ে ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ারের প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক সিদ্ধার্থ ভারাদারাজন এ মন্তব্য করেন। গতকাল শুক্রবার (২৯শে আগস্ট) সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে দুদিনের এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু হয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইটিকস (দায়রা) এই সম্মেলনের আয়োজন করেছে।
সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘বাংলাদেশ অ্যাট ক্রস রোডস: রিথিঙ্কিং পলিটিকস, ইকোনমিকস, জিওপলিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজি’ (সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ: রাজনীতি, অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নতুন ভাবনা)।
এই সম্মেলনে ‘মিডিয়া, রিউমার অ্যান্ড ন্যারেটিভ: পোস্ট জুলাই বাংলাদেশ ইন দ্য সাউথ এশিয়ান ফ্রেম’ (গণমাধ্যম, গুজব ও বয়ান: দক্ষিণ এশিয়ার কাঠামোয় জুলাই–পরবর্তী বাংলাদেশ) শিরোনামের বিশেষ অধিবেশনে বক্তব্য দেন সিদ্ধার্থ ভারাদারাজান।
তিনি জুলাই বিপ্লবের আগে-পরে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক, জুলাই বিপ্লব নিয়ে ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব, ভারতীয় গণমাধ্যমের অবস্থান, হিন্দুদের ওপর সহিংসতা ইত্যাদি বিষয়ে মন্তব্য করেন। তার সঙ্গে আলোচনায় ছিলেন বাংলাদেশের তথ্যচিত্র নির্মাতা দীপক কুমার গোস্বামী।
সিদ্ধার্থ ভারাদারাজান বলেন, ভারতের সরকারগুলো এমন ধারণা গ্রহণ করেছিল যে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাই ভারতের জন্য সবচেয়ে ভালো। মনমোহন সিং থেকে শুরু করে নরেন্দ্র মোদির আমল—ভারতীয় নীতিনির্ধারকেরা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখার বিষয়ে স্বস্তি বোধ করতেন। তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন যাতে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেন।
সিদ্ধার্থ বলেন, মোদি সরকার মনে করত যে শেখ হাসিনাই ভারতের জন্য সবচেয়ে ভরসার জায়গা। বিনিময়ে শেখ হাসিনা অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ কিছু শিল্পপতিকে, যেমন আদানি গ্রুপ। আবার ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার দিকেও নরেন্দ্র মোদি চোখ বন্ধ রেখেছেন।
শেখ হাসিনা সরকারের পতন নিয়ে সিদ্ধার্থ বলেন, প্রথম ২৪ ঘণ্টায় বাংলাদেশ থেকে আসা সব দৃশ্য ছিল শেখ হাসিনার পতন উদ্যাপন নিয়ে। একই সঙ্গে শিশুহত্যা, ছাত্রহত্যা ইত্যাদি ঘটনার খবরও আসছিল। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা পার হতেই ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর আসতে শুরু করল যে বাংলাদেশে ব্যাপক দাঙ্গা চলছে, হিন্দুদের ওপর আক্রমণ হচ্ছে, মন্দির ভাঙা হচ্ছে, গণহত্যা চলছে। এ জন্য ভুয়া ফুটেজ ছড়ানো হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ভারত সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে এই গুজব ছড়ানোর বিষয়গুলো চালু রাখতে দিল।
সিদ্ধার্থ ভারাদারাজানের মতে, এমনভাবে গুজব ছড়ানো হলো যে তা মূলধারার সংবাদমাধ্যমে চলে গেল। জুলাই বিপ্লবকে ‘হিন্দুবিরোধী ষড়যন্ত্র’ হিসেবে তুলে ধরার মধ্যে বিশেষ রাজনৈতিক বার্তা ছিল। কেউ বলল পাকিস্তান করেছে, কেউ বলল যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিপ স্টেট’ করেছে, আবার কেউ বলল জামায়াতে ইসলামী করেছে। তাই এটা শুধু মোদি সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতাকে আড়াল করেনি, এটি ভারতের অভ্যন্তরেও মানুষকে আরও বিভক্ত করার কাজ করেছে।
সিদ্ধার্থ বলেন, সামগ্রিকভাবে ভারত সরকার এই বয়ানেই খুশি ছিল। কারণ, এটি মোদির পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতা থেকে মানুষের মনোযোগ সরিয়ে নিয়েছিল।
সাংবাদিকদের তথ্য যাচাই করার ওপর জোর দিয়ে সিদ্ধার্থ বলেন, তাড়াহুড়ো করে ভুল খবর প্রকাশ না করে দেরিতে সঠিক খবর প্রকাশ করা ভালো।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অনেক সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশকে নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। তবে সামগ্রিকভাবে ভারতের গণমাধ্যম বাংলাদেশের প্রতি নিরপেক্ষ বা ইতিবাচক, এই কথা যদি বলি, তাহলে সেটা মিথ্যা বলা হবে। বাস্তবে অনেক গণমাধ্যম এখন শত্রুভাবাপন্ন অবস্থান নিয়েছে।’
জে.এস/
সাংবাদিক ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস (দায়রা) সিদ্ধার্থ ভারাদারাজন
খবরটি শেয়ার করুন