ছবি: লেখকের ফেসবুক থেকে নেওয়া
রাজু আলাউদ্দিন
জগদ্বিখ্যাত উপন্যাস শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা–র পঞ্চাশ বছরপূর্তি উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মাসুদুজ্জামান ২০২০ সালে প্রকাশ করেছিলেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস: শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা: প্রকাশনার পঞ্চাশ বছর নামে একটি বই, যাতে সংকলিত হয়েছে এপার বাংলা ও ওপার বাংলাের কয়েক লেখক-অনুবাদকের লেখা। লাতিন আমেরিকান বা হিস্পানো-আমেরিকান সাহিত্য নিয়ে আমার আগ্রহ দীর্ঘদিনের। ফলে, বইটি সেই কৌতূহল থেকে কিনেছিলাম সেই বছর কিংবা তার পরের বছর।
আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম, বাংলাদেশে যারা লাতিন আমেরিকান সাহিত্য নিয়ে চর্চা করছেন, তথা স্প্যানিশ ভাষায় রয়েছে যাদের স্বচ্ছন্দ যাতায়াত, তাদের কারোর লেখাই এই গ্রন্থে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমি যাদের কথা বলছি, তারা খুব পরিচিত যদি নাও হয়ে থাকেন—যেমন রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী, জি. এইচ. হাবীব কিংবা রাজু আলাউদ্দিন—তারা মার্কেস বিষয়ে বহুদিন থেকেই সংশ্লিষ্ট বলেই তো এই গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হতে পারতেন।
রফিক ২০১০ সালেই সিন্দাবাদ নামক একটি সাহিত্য সাময়িকীর বিশেষ সংখ্যা করেছিলেন মার্কেসকে নিয়ে, হাবীব বাংলাভাষায় শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা–র প্রথম অনুবাদক, আর এই অধমের রয়েছে মার্কেস নিয়ে একাধিক লেখা, মার্কেসের লেখা ও সাক্ষাৎকারের অনুবাদ। মাসুদুজ্জামান তাদের সম্পর্কে বা তাদের মার্কেসবিষয়ক লেখাগুলো সম্পর্কে অবগত নন—এটা অবিশ্বাস্য। তিনি তাদের প্রত্যেককেই ব্যক্তিগতভাবে চেনেন। এমনকি যদি—ধরে নিই যে তিনি তাদের চিনলেও তাদের লেখা পড়েননি—না পড়ে থাকলেও, এই সংকলন তৈরির আগে সম্পাদক হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল তাদের লেখার খোঁজ নেওয়া এবং তাদের লেখা অন্তর্ভুক্ত করা।
একজন সুসম্পাদক ও সৎ সংকলকের দায়িত্ব হচ্ছে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞদের লেখাগুলো খুঁজে বের করা। লক্ষ্য করে দেখলাম, তিনি দূর পশ্চিমবঙ্গের মার্কেসবিষয়ক লেখক তরুণকুমার ঘটকের লেখা খুঁজে পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তারই দেশে নাগালের মধ্যে থাকা লেখকদের লেখা খুঁজে পেলেন না! এমনকি তিনি খুঁজেছেন কিনা, সেই বিষয়ে তার লেখা ভূমিকাতেও কোনো উল্লেখ নেই। অর্থাৎ, তিনি খুঁজে বের করার প্রয়োজনই বোধ করেননি। তিনি যদি সৎ ও দায়িত্বশীল সম্পাদক হতেন, তাহলে তিনি আমার সেই লেখাটি খুঁজে বের করতেন, যেখানে মার্কেসের শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা–র সঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি–র একটি তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে এবং ২০১০ সালে যা কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছিল।
এর কয়েক বছর পর শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা নিয়ে লিখেছিলাম আরও একটি লেখা। মাসুদুজ্জামান এগুলো পড়েছেন। আর যদি না পড়ে থাকেন, তাহলে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেও এই লেখাগুলোর হদিস তিনি পেয়ে যেতেন। ঘটনা হলো, সচেতনভাবেই উপরোক্ত লেখকদের এড়িয়ে এই সংকলনটি তৈরি করেছেন তিনি।
মাসুদুজ্জামান সাহিত্যের সব বিষয়েই অত্যন্ত অযোগ্য একজন মানুষ। এবং আওয়ামী আমলে তিনি এই অযোগ্যতার জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কারও পেয়েছেন। অসংখ্য কবিতা তিনি লিখেছেন, কিন্তু তা অপাঠ্য; লিখেছেন দেশি ও বিদেশি সাহিত্য নিয়ে অসংখ্য প্রবন্ধ, কিন্তু সেগুলো শব্দের কঙ্কাল মাত্র; করেছেন গবেষণাও, যা শুধুই আবর্জনার স্তুপ। মার্কেস সম্পর্কে তার গভীর পাঠ তো দূরের কথা, নেই প্রাথমিক জ্ঞানটুকুও, এই সংকলনটিতেই রয়েছে তার প্রমাণ।
সংকলনটির আড়াই পৃষ্ঠার ভূমিকায় নানা জায়গায় রয়েছে তার অজ্ঞতার বিশ্বস্ত প্রতিধ্বনি। শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা–র একটি চরিত্র ‘বুয়েন্দিয়া’। এর উচ্চারণ তিনি কোথাও লিখেছেন ‘বুয়েন্দা’। যদি ধরেও নিই যে এটি তার অনিচ্ছাকৃত ভুল, তারপরও প্রশ্ন জাগে, যখন এরকম আরও অসংখ্য ভুল দেখা যায় তার এই বইয়ে। তার কিছু নমুনা আমি তুলে ধরব।
ভূমিকার এক জায়গায় তিনি লিখেছেন: “এই জনপদের সূত্রেই, বুয়েন্দিয়া ধারণা করেছিলেন, পৃথিবীকে আবিষ্কার করতে পারবেন।” উপন্যাসটি যারা পড়েছেন, তারা জানেন, বুয়েন্দিয়া পরিবারের কেউ-ই পৃথিবীকে আবিষ্কার করতে চায়নি কিংবা আবিষ্কার করার কোনো লক্ষ্যও তাদের ছিল না। তারা স্রেফ মাকোন্দো নামক এক গ্রামে বসবাস করছে। বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে তাদের যে ধারণা তৈরি হয়েছে, তার সবটাই এসেছে জিপসি দল ও মেলকিয়াদেসের মাধ্যমে, কিন্তু তা এক অনৈচ্ছিক জ্ঞান।
অর্থাৎ, বাইরের জগৎ তারা আবিষ্কার করতে যায়নি; তারা মেলকিয়াদেসের মাধ্যমে ধারণা পেয়েছে মাত্র। অথচ বাক্যটি পড়লে মনে হবে, তারা পৃথিবীকে ক্রিস্তোবাল কোলন বা আমেরিগো ভেসপুচির মতো আবিষ্কারে বেরিয়ে পড়েছে। তিনি যে উপন্যাসটি পড়েননি, এই বাক্যটি তারই এক প্রমাণ। বাংলা বাক্যও ভুল লিখেছেন: “বছরের বছর ধরে জনপদটি বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে…”—সম্ভবত বলতে চেয়েছেন ‘বছরের পর বছর’। হয়তো ‘বছরের পর বছর’-ই লিখেছিলেন, কিন্তু প্রুফ দেখে এটাকে নির্ভুল করার কোনো প্রয়োজনই তিনি বোধ করেননি।
ধারণার জায়গাতেও তার রয়েছে অনেক ভ্রান্তি। এই উপন্যাসটি সম্পর্কে তিনি লিখেছেন: “একদিকে ইউরোপীয় আধুনিকতা আর অন্যদিকে কিউবার আঁভা-গার্দ রীতির বিমিশ্রণে গড়ে উঠেছে এর আখ্যান।” ‘অন্যদিকে কিউবার আঁভা-গার্দ রীতি’টা আসলে কী, সেটা পাঠকের পক্ষে জানা অসম্ভব। লেখক নিজেই কি জানেন? এটা খুবই অস্পষ্ট এক অভিব্যক্তি। যিনি নিজেই জানেন না, তার পক্ষে এরকম একটি সংকলন করার যোগ্যতা কীভাবে থাকতে পারে?
অত্যন্ত কাঁচা হাতের কয়েকটি লেখা এখানে সংকলিত হয়েছে। বইটি সম্পর্কে অত্যন্ত ভাসা-ভাসা কিংবা বইটি সম্পর্কে বিদেশি লেখকদের প্রবন্ধ পাঠের তরল সংস্করণ তৈরি করেছেন তারা। সম্পাদক এসব লেখা না বুঝেই সংকলনভুক্ত করেছেন। এসব লেখায় অসংখ্য বানান ভুল যেমন আছে, তেমনি আছে চরিত্রগুলোর ভুল উচ্চারণ। একই লেখায় একই চরিত্র ও স্থানের ভিন্ন ভিন্ন উচ্চারণ দেখে পাঠক নিশ্চিতভাবেই বিভ্রান্ত হবেন।
যেমন উইলিয়াম ফকনারের কাল্পনিক শহর ইওকনাপাতাওফা (Yoknapatawpha), কোথাও লেখা হয়েছে ‘ইয়কনাপাতাফা’ (পৃ. ৫৫), একই লেখায় মাকোন্দো শব্দটি একাধিক উচ্চারণে লেখা হয়েছে, যেমন ‘মকোন্দোতে’ (পৃ. ৫৪), এবং ‘মকোন্দো’ (পৃ. ৫৮), আরেক জায়গায় ‘মেকেনডও’ (পৃ. ৫৫)। উরসুলা ইগুয়ারান শব্দটি লেখা হয়েছে ‘ঈঙ্গুরান’ (পৃ. ৫৬)। অর্থাৎ, উচ্চারণের কোনো সমতা বিধান করা হয়নি এই গ্রন্থে।
বইয়ের শেষে মার্কেসের যে জীবনপঞ্জি যুক্ত করা হয়েছে, সেখানে বইয়ের নাম ইংরেজি ও বাংলায় রয়েছে অসংখ্য ভুল। মার্কেসের গ্রন্থপঞ্জিতে “লাতিন আমেরিকার উপন্যাস (La Novela en America Latina, মারিও ভার্গাস য়োসার সঙ্গে লিখিত)” বলে একটি গ্রন্থের কথা উল্লেখ আছে। প্রথম কথা হলো, এই গ্রন্থের শিরোনামটি অসম্পূর্ণ। এর পুরো নাম La Novela en America Latina (Dialogo entre Mario Vargas Llosa y Gabriel Garcia Marquez)। সম্পাদক যদি বইটি সম্পর্কে সত্যি সত্যি জানতেন, তাহলে এই বইটি সম্পর্কে এই ভুল ধারণা দিতেন না। এটি দুই লেখকের যৌথভাবে লেখা কোনো গ্রন্থ নয়, এটি হচ্ছে দুই লেখকের আলাপচারিতার একটি বই।
গ্রন্থপঞ্জিতে ১৩ নম্বর বই হিসেবে উল্লেখ আছে ‘আগে থেকেই ঘোষণা হয়ে যাওয়া এক মৃত্যুর ইতিবৃত্ত’, যার ইংরেজি নাম Chronicle of a Death Foretold। এই বইটি বাংলায় অনেক আগে অনূদিত হয়েছে, তেমনি এই বইটির বাংলা তর্জমা অনেক আগে থেকেই ‘একটি পূর্বঘোষিত মৃত্যুর দিনপঞ্জি’ নামে পরিচিত। তিনি চাইলে এই নামটাই রাখতে পারতেন। কিন্তু তিনি যেহেতু জানেন না যে কবি বেলাল চৌধুরী এই নামে বইটি অনুবাদ করেছিলেন, তাই এরকম শিশুতোষ বাক্যে (‘আগে থেকেই ঘোষণা হয়ে যাওয়া এক মৃত্যুর ইতিবৃত্ত’) একটি এলায়িত নাম বেছে নিয়েছেন।
মার্কেসের শেষ দিককার একটি গল্পগ্রন্থের স্প্যানিশ নাম Doce Cuentos Peregrinos, ইংরেজিতে যার নাম রাখা হয়েছিল Strange Pilgrims। মাসুদুজ্জামানের সম্পাদিত এই গ্রন্থে নামটি ভুল ও বিকৃত হয়ে ধারণ করেছে ‘বারোটি আশ্চর্য তীর্থবাণীর গল্প’।
বাংলাদেশে বইয়ে মুদ্রণপ্রমাদ থাকে—এটা জানা কথা। কিন্তু এই বইটিতে এসব নিছক মুদ্রণপ্রমাদ নয়, এ হচ্ছে মাসুদুজ্জামানের অজ্ঞতা ও দায়িত্বহীনতার নজির। আর এই বইটি কেবল মুদ্রণপ্রমাদের জন্য অপাঠ্য নয়, এর ভেতরে রয়েছে অপরিপক্ব রচনার সমাবেশ। সম্পাদক হিসেবে ভালো লেখা খুঁজে বের করা কিংবা যোগ্যদের দিয়ে লিখিয়ে নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল। কিন্তু তিনি তা করেননি। কারণ, সাহিত্য তার কাছে ধর তক্তা মার পেরেক ধরনের এক কাজ।
তার কোনো লেখা পড়েই আমার কাছে তাকে সাহিত্যের লোক বলে মনে হয়নি, মনে হয়েছে সাহিত্যের স্রেফ কেরানি, এক অদক্ষ কেরানি। কিন্তু কেরানি হওয়াও দোষের নয়, দোষের হচ্ছে অসততা ও বুজরুকি। অসৎ এই জন্য যে, তিনি সচেতনভাবে মার্কেস সম্পর্কে অভিজ্ঞদের লেখা এড়িয়ে গেছেন, আর বুজরুকি হচ্ছে এইখানে যে, তিনি যা জানেন না, তারই ভান করছেন।
আলোচ্য এই বইটি প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রকাশকেরও রয়েছে সীমাহীন গাফিলতি। এমন একটি মানহীন, পরিকল্পনাহীন, অপাঠ্য রচনার সংকলন বের করার আগে পাণ্ডুলিপি যাচাই করা উচিত ছিল। তাদের নিজস্ব কোনো সম্পাদনা পরিষদ নেই বলেই কি এরকম অখাদ্য ও বানানভুলে ভরা এক আবর্জনার স্তুপ বের করতে হবে? তাদের কি বানান সমন্বয়কারীও নেই, যে একই বইয়ে শত শত বানানভুল থাকবে? মাওলা ব্রাদার্সের এককালে সুনাম ছিল মানসম্পন্ন ভালো বই প্রকাশের। মাওলা এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে মানহীন বইয়ের প্রকাশক।
লেখক: ন্যানো কাব্যতত্ত্বের জনক কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক।
খবরটি শেয়ার করুন