ছবি: সংগৃহীত
ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) আসনের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্য মুহাম্মদুল্লাহকে প্রকাশ্যে চোখ উপড়ে ফেলার হুমকি দেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ভিডিওতে বিএনপির এক কর্মীকে সংসদ সদস্যের উদ্দেশে অশালীন ভাষা ব্যবহার করে গুরুতর শারীরিক ক্ষতির হুমকি দিতে দেখা যায়। ঘটনাটি নিয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, অভিযোগের তদন্ত শুরু হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তারাকান্দা উপজেলার রামপুর ইউনিয়নের আটাদার গ্রামের বাসিন্দা সোহরাব হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে সংসদ সদস্য মুহাম্মদুল্লাহর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। ভিডিওতে তিনি শুধু গালাগালই করেননি, বরং সংসদ সদস্যকে প্রকাশ্যে হুমকিও দেন।
ভিডিওতে সোহরাব হোসেনকে বলতে শোনা যায়, ‘আন্দোলন করো এমপি সাব? ওই যে ওয়াহাবি এমপি সাব, রাজাকারের বাচ্চা... আর কোনো দিন যদি রাস্তায় নামছস, একটারেও ঘরে ফিরে যাইতে দিতাম না... দেখছস কী, একবারে চোখ তুইল্লালবাম।’
ভিডিওতে তিনি ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাহার হোসেন তালুকদারের নামও উল্লেখ করেন। পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি সংকট ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে সংসদ সদস্যের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ-২ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুহাম্মদুল্লাহ বিএনপির প্রার্থী মোতাহার হোসেন তালুকদারকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচনের পর সরকার মোতাহার হোসেন তালুকদারকে ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেয়।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা দেখা দেয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সোহরাব হোসেন দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং এলাকায় দলের কর্মী হিসেবে পরিচিত। তবে ভিডিওটি নিয়ে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
ঘটনার পর বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের তারাকান্দা উপজেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. গিয়াস উদ্দিন ফয়েজী আজ শনিবার বিকেলে কয়েকজন নেতা-কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে তারাকান্দা থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে সংসদ সদস্যকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
সংসদ সদস্য মুহাম্মদুল্লাহ শনিবার মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, এলাকায় চাঁদাবাজি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একটি পক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে নানা ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছে। তার দাবি, পরিকল্পিতভাবে এলাকায় অস্থিরতা ও সংঘাত সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে ভয় পাই না। জীবন-মৃত্যু আল্লাহর হাতে। কিন্তু এ ধরনের বক্তব্য সমাজে বিদ্বেষ ও সংঘাত বাড়ায়। ভিডিওতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, মোতাহার তালুকদারের বিরুদ্ধে কথা বললে আমার চোখ তুলে নেওয়া হবে। বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক।’
অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাহার হোসেন তালুকদার বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি দলের কোনো পদধারী নন। সর্বোচ্চ তিনি একজন সমর্থক হতে পারেন।
মোতাহার হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি জানার পরই আমি ভিডিওটি মুছে ফেলতে বলেছি। আমি এ ধরনের ভাষা বা আচরণ সমর্থন করি না। আমার ধারণা, এটি রাজনৈতিক নয়, ব্যক্তিগত বিরোধের জেরেও হতে পারে। ভিডিও না সরালে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’
তারাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রাশিদ বলেন, ভিডিওটি পুলিশের নজরে এসেছে। সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত শুরু হয়েছে। একজন উপপরিদর্শককে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও এ ধরনের সহিংস ভাষা ব্যবহারের সমালোচনা করেছেন।
ফেসবুক ব্যবহারকারী আরিফ রহমান লিখেছেন, ‘রাজনীতিতে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে প্রকাশ্যে চোখ উপড়ে ফেলার হুমকি সভ্য রাজনীতির ভাষা হতে পারে না।’ সাবরিনা ইসলাম মন্তব্য করেন, ‘যে দলেরই হোক, হুমকি ও সহিংসতার রাজনীতি বন্ধ হওয়া উচিত। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে।’
মেহেদী হাসান লিখেছেন, ‘ভিডিওটি যদি সত্যিই অভিযুক্ত ব্যক্তির হয়ে থাকে, তাহলে দ্রুত তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। রাজনৈতিক পরিচয় যেন বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রভাব না ফেলে।’ তবে রাকিবুল করিম নামে আরেকজন লিখেছেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর পুরো প্রেক্ষাপটও তদন্তে দেখা দরকার। কোনো বক্তব্য আংশিক প্রচারিত হয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা উচিত।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। এসব বক্তব্য বাস্তবে সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই শুধু অভিযোগ গ্রহণ নয়, দ্রুত তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
ভিডিওটি ঘিরে এলাকায় নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, অভিযোগ ও পুলিশের তদন্তের ওপরই এখন নজর সবার। তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী ব্যবস্থা নেয়, সেটিই এখন এ ঘটনার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
খবরটি শেয়ার করুন