ফাইল ছবি
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ঘোষিত সময়ে দেশে ফেরার কথা বলার পর প্রায় দেড় মাস বাকি থাকতে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে ঐক্যের অভিযোগ সামনে এনেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২০ অক্টোবর রাজশাহীতে এক জনসভায় তিনি বলেন, দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার অর্থ দিয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে এবং দেশের ভেতরে একটি রাজনৈতিক দল সেই তৎপরতায় সহায়তা করছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে সত্যিই কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, নাকি বিরোধী রাজনৈতিক দলকে চাপে রাখতেই গোয়েন্দা তথ্যের কথা প্রকাশ্যে এনেছেন তিনি। একই সঙ্গে আলোচনায় এসেছে, দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না এবং অতীতের মতো বর্তমানেও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চিহ্নিত করার প্রবণতা রয়েছে কি না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের কাছে বক্তব্যটির সময়ও তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। সেই ঘোষিত সময়ের দেড় মাস আগে প্রধানমন্ত্রী যখন আওয়ামী লীগ ও জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের মধ্যে যোগসাজশের কথা বলছেন, তখন এর রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে বর্তমান সময়ে কোনো গোপন সমঝোতা হয়েছে, এমন দাবির পক্ষে প্রকাশ্যে যাচাইযোগ্য প্রমাণ সুখবর ডটকমের অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি।
তারেক রহমান বলেন, গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য রয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে দেশের বাইরে থেকে অর্থ পাঠানো হচ্ছে এবং দেশের ভেতরে একটি রাজনৈতিক দল অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবেদন দেশের মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে তার অভিযোগের কথা উঠে এলেও আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে কথিত ঐক্যের স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ তুলে ধরা হয়নি।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অন্তত তিনজন নেতা সুখবর ডটকমকে বলেন, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে ঐক্যের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন, তা রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। তাদের ভাষ্য, জামায়াত অতীতেও বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচনী ও কৌশলগত সমঝোতায় গিয়েছে। তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের নেতারা আওয়ামী লীগের সমালোচনায় আগের মতো সরব নন; বরং বিএনপির সমালোচনায় বেশি মনোযোগী।
বিএনপির ওই নেতারা অতীতের কয়েকটি রাজনৈতিক ঘটনাও সামনে আনেন। তাদের দাবি, এরশাদ সরকারের আমলে জামায়াত আওয়ামী লীগের সঙ্গে পাতানো নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবিতেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের কৌশলগত ঐক্য হয়েছিল। তাদের বক্তব্য, বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রে এসব ঘটনা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তবে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েক নেতা সুখবর ডটকমকে বলেন, জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার ইতিহাস বিএনপিরও রয়েছে। তাদের ভাষ্য, ১৯৯১ সালে জামায়াতের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং ২০০১ সালে দলটিকে সঙ্গে নিয়ে চারদলীয় জোট গঠন করে ক্ষমতায় আসে। মুক্তিযুদ্ধের পর নিষিদ্ধ হওয়া জামায়াতকে পুনরায় রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের শাসনামলে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
আওয়ামী লীগের নেতাদের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দুই দলের রাজনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি বিএনপি ও জামায়াতের অতীত সম্পর্কের বিষয়টিও সামনে এসেছে। তবে অতীতের নির্বাচনী সমর্থন, জোট বা কৌশলগত সহযোগিতা থেকে বর্তমানেও গোপন ঐক্য রয়েছে বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না বলে অনেকের অভিমত।
একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের দাবি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সংসদের বিরোধী দল জামায়াতের মধ্যে গোপনে সমঝোতা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাদের পর্যবেক্ষণ, জামায়াত বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কাজ করেছে। শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ সম্পর্কে জামায়াতের বক্তব্যেও আগের তুলনায় নমনীয়তা দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ও পরের বক্তব্যের সঙ্গে গত এক বছরের বক্তব্যের তুলনা করেও তারা বিষয়টি দেখার কথা বলছেন।
তবে জামায়াতের নেতারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ঐক্যের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের পাল্টা অভিযোগ, আওয়ামী লীগের প্রশ্নে বরং ক্ষমতাসীন বিএনপিই সহনশীল আচরণ করছে। ফলে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে গোপন সমঝোতা রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এই বিতর্কের মধ্যে গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা নিয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন। গতকাল বুধবার, ২১ অক্টোবর রাজধানীর সেগুনবাগিচায় এক অনুষ্ঠানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান। তার দাবি, প্রধানমন্ত্রীর কাছে থাকা গোয়েন্দা তথ্য সঠিক নয়। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গড়ে ওঠা গোয়েন্দা কাঠামোর তথ্যের ভিত্তিতে এখন বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে ব্যবহৃত গোয়েন্দা কাঠামোর তথ্যের ভিত্তিতে একসময় দেশের বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের মিছিল করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তার মতে, সেই গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করে এখন বিরোধী দলকে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য দায়ী করা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগকে রাজনৈতিক ব্যর্থতা, অপরিপক্বতা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের অভাবের ফল বলে আখ্যা দেন।
গোয়েন্দা সংস্থার রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্নটি অবশ্য কেবল বিরোধী দলের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম তার একটি কলামে দলটির সরকারের আমলে গোয়েন্দা সংস্থাসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিকীকরণ নিয়ে লিখেছেন। সাম্প্রতিক এক আলোচনায়ও তিনি পুলিশ, আমলাতন্ত্র ও গোয়েন্দা সংস্থার রাজনৈতিক ব্যবহারের প্রসঙ্গ তুলেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা এবং সাংবিধানিক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবের আওতায় নিয়ে আসা দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পথে বড় বাধা।
মাহফুজ আনাম বলেন, পুলিশকে প্রায়ই কোনো দলের শক্তির সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো স্বাধীনভাবে কাজ করার কথা যেসব প্রতিষ্ঠানের, সেগুলোরও রাজনৈতিকীকরণের কথা তিনি উল্লেখ করেন। তার বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হলেও রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করার অধিকার সেই সরকার পায় না।
মাহফুজ আনামের এই পর্যবেক্ষণ বর্তমান বিতর্কে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কারণ, প্রধানমন্ত্রী গোয়েন্দা তথ্যের কথা বলে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে জামায়াত বলছে, সরকার আগের সরকারের রেখে যাওয়া গোয়েন্দা কাঠামোর তথ্য ব্যবহার করছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের ব্যাপক অভিযোগ ছিল।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর ইসলামী আন্দোলন সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে দলটির মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দলের মধ্যে আঁতাতের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য থাকার দাবি জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তার মতে, রাষ্ট্রের কাছে এ ধরনের তথ্য থাকলে কেবল জনসভায় বক্তব্য দেওয়া বা জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো যথেষ্ট নয়; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
গাজী আতাউর প্রশ্ন তোলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকার পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন। তিনি বলেন, স্বৈরতন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক প্রতিবন্ধকতা গড়ে তোলা জরুরি। তার অভিযোগ, সরকার এ দুটি ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। বরং আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ সামনে আসার পরও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, যা জাতিকে উদ্বিগ্ন করছে।
এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তিনটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে সত্যিই কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, গোয়েন্দা সংস্থার কাছে সে বিষয়ে কী ধরনের তথ্য রয়েছে এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে সরকার কোনো আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক বক্তব্য ও পাল্টা অভিযোগের বাইরে গিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষিত সময় যত এগিয়ে আসবে, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক তৎপরতা, জামায়াতের অবস্থান এবং বিএনপি সরকারের প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা তত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কোনো রাজনৈতিক দলকে অভিযুক্ত করা হলে সেই তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা এবং আইনের প্রয়োগ নিয়ে জনসমক্ষে জবাবদিহিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
খবরটি শেয়ার করুন