ছবি: সংগৃহীত
দেশে চরম অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ভেঙে পড়ছে আইনশৃঙ্খলা। চারদিকে হত্যা, খুন, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী চলন্ত বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, শুধু জানুয়ারি মাসেই (২০২৫ সালের) ৩৯টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ফেব্রুয়ারি মাসেও কম হবে না, বরং বেড়েছে। বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটার পর প্রতিবাদে পথে নেমেছে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা।
‘ধর্ষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গণপদযাত্রা কর্মসূচি পালন করেছে। তাদের এই কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরাসহ আমজনতা যোগ দেয়। শুধু তাই নয়, ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজের শিক্ষার্থীরা ধর্ষণে জড়িত ব্যক্তিদের কঠিন শাস্তি ও নারীদের নিরাপত্তার দাবিতে সাড়ে তিন ঘণ্টা বিক্ষোভ সমাবেশ করে।
তাদের কন্ঠে শ্লোগান ছিল- ‘ইজ্জত যারা করল হরণ, তাদের চাই মৃত্যুবরণ’, ‘জাস্টিস, জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘আমার বোন কবরে, ধর্ষক কেন বাহিরে’, ‘ধর্ষকের চামড়া, তুলে নেব আমরা।’ এদিকে, সন্ত্রাসী ও ধর্ষকদের দ্রুত শাস্তি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগরসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
সমাজে ধর্ষণের মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। নারীকে এখনো অনেক ক্ষেত্রে ভোগের বস্তু হিসেবে দেখা হয়। পরিবারের মধ্যে ছেলে-শিশুদের প্রাধান্য দেওয়া আর মেয়ে-শিশুদের সীমাবদ্ধ রাখার সংস্কৃতি এ মানসিকতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগী নারীকে দোষারোপ করার প্রবণতাও সমাজে ভয়াবহভাবে প্রচলিত। পোশাক, চলাফেরা, এমনকি নির্দিষ্ট সময়ের পর ঘরের বাইরে থাকাকে অপরাধের কারণ হিসেবে দেখানো হয়। যা অপরাধীর দুঃসাহস আরও বাড়িয়ে দেয়।
অনেক ক্ষেত্রেই পরিবার ও সমাজের চাপের কারণে ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হয়। সামাজিক সম্মানের দোহাই দিয়ে ভুক্তভোগীকে চুপ থাকতে বাধ্য করা হয়। এর ফলে অপরাধীরা আরো সাহসী হয়ে ওঠে এবং অন্য অপরাধীরা প্রলুব্ধ হয়।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষা ও জেন্ডার সমতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রায় নেই। স্কুল-কলেজে যৌন শিক্ষা নিয়ে এখনো শিক্ষা দেওয়া হয় না। বিষয়টিকে একপ্রকার অন্ধকারে রাখা হয়। যার কারণে একশ্রেণির মানুষ অতি কৌতুহলী হয়ে ওঠে। তারা পর্নোগ্রাফি ও ইন্টারনেটের কতিপয় ওয়েবসাইটে আসক্ত হয়ে পড়ে।
ফলে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বিকৃত মানসিকতা তৈরি হয়। একদিকে যৌনতা নিয়ে পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব, অন্যদিকে অবাধ ইন্টারনেট প্রযুক্তির কারণে অনেক তরুণের বিকৃত মানসিকতা গড়ে ওঠে।
ধর্ষণবিরোধী আইন থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ এবং তদন্তের গাফিলতির কারণে অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রেই পার পেয়ে যায়। আবার ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ জানাতে গেলেও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হন। নারী পুলিশ কর্মকর্তার বা সংবেদনশীল পরিবেশের অভাবে অনেকে আইনের দারস্থ হতে ভয় পান।
গ্রাম-শহর সর্বত্র ধর্ষণ প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ধর্ষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গণমাধ্যম এবং সর্বোপরি জনগণ— সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ধর্ষণ প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
এইচ.এস/
খবরটি শেয়ার করুন