ছবি: সংগৃহীত
রাজনৈতিক বাস্তবতা এক অনন্য ও জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো যেমন নতুন মাত্রা পেয়েছে, তেমনি সংবিধান ও বাস্তবতার মধ্যে এক ধরনের সমান্তরাল অবস্থানও তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ্ তার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে যে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন, তা দেশের রাজনৈতিক গতিপথ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়।
ড. মাহবুব উল্লাহ্ দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত তার লেখায় বর্তমান রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে একটি “হাইব্রিড” অবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার মতে, একদিকে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে, অন্যদিকে কিছু সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়া সংবিধানের সরাসরি আওতার বাইরে থেকেও বাস্তবায়িত হয়েছে।
বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিষয়টি সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও, তা জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এই “উইল অব দ্য পিপল” বা জনগণের ইচ্ছাকেই তিনি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন।
তবে তিনি এটিও উল্লেখ করেন যে, রাষ্ট্রপতির ভূমিকা বজায় রাখা এবং তার মাধ্যমেই নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ—এসব বিষয় সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এতে করে সম্ভাব্য অরাজকতা এড়ানো গেছে এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়েছে। গতকাল রোববার তার লেখাটি যুগান্তরে প্রকাশিত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের ভূমিকা নিয়ে ড. মাহবুব উল্লাহ্ আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন, বিপুল জনসমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হওয়ায় সরকারের ওপর জনগণের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সরকার আইন প্রণয়ন ও সংশোধনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সক্ষমতা রাখে। ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদন পেয়েছে, আবার কিছু বাতিল হয়েছে—যা একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারই অংশ।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, বিএনপির সংস্কার প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে তার মূল্যায়ন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, বিএনপি কখনোই সংস্কারের বিরোধিতা করেনি; বরং দীর্ঘদিন ধরেই তারা সংস্কারের কথা বলে আসছে। বর্তমান সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তাদের মতে, বিদ্যমান অধ্যাদেশগুলো পূর্ণাঙ্গ নয় এবং সেগুলোতে আরও পরিমার্জন প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি সুসংহত ও কার্যকর কাঠামো তৈরি করে তা সংসদে পাস করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ড. মাহবুব উল্লাহ্ এই অবস্থানকে ইতিবাচকভাবেই দেখেন। তার বিশ্বাস, দেশের বাস্তব পরিস্থিতি এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা বিবেচনায় সংস্কার বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। বিএনপি দল হিসেবে এই বাস্তবতা অনুধাবন করছে এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছে—এমনটাই তার মূল্যায়ন।
তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে সব পক্ষের মধ্যে এই আস্থা সমানভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। বিরোধী দলগুলোর একটি অংশ মনে করছে, বিএনপি তাদের ঘোষিত অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে এবং গণভোটের রায় যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করছে না। এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও রাজনৈতিক উত্তেজনাও তৈরি হয়েছে। ড. মাহবুব উল্লাহ্ মনে করেন, এই দূরত্ব মূলত উপস্থাপনা ও যোগাযোগের ঘাটতি থেকে সৃষ্টি হয়েছে, যা সহজেই আলোচনার মাধ্যমে দূর করা সম্ভব।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি জাতীয় রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এর সমাধানও হতে হবে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও রাষ্ট্রনায়কোচিত দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে। পারস্পরিক অবিশ্বাস ও ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে সংলাপের বিকল্প নেই।
বর্তমান পরিস্থিতির জটিলতার একটি উদাহরণ হিসেবে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কথাও উল্লেখ করেন। রাজু ভাস্কর্যে চলা অনশন কর্মসূচি ইঙ্গিত দেয় যে, তরুণ সমাজের মধ্যেও উদ্বেগ ও অসন্তোষ বাড়ছে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, তবুও সমস্যার সমাধান এখনো আসেনি—যা সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন হিসেবেই দেখা যেতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ড. মাহবুব উল্লাহ্ আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, আগামী পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে সংস্কার প্রক্রিয়ার একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে। তার মতে, এ জন্য রাজপথে সংঘাতের প্রয়োজন নেই; বরং সংসদীয় প্রক্রিয়া ও আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব।
সার্বিকভাবে তার বিশ্লেষণে একটি ইতিবাচক প্রত্যাশা প্রতিফলিত হয়—বিশেষ করে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে। তিনি বিশ্বাস করেন, দলটি তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সংস্কারের পথে এগোবে এবং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
দেশের এই পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ড. মাহবুব উল্লাহ্-এর এই মূল্যায়ন শুধু একটি মতামত নয়, বরং একটি সম্ভাবনার দিকনির্দেশনা। যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার মাধ্যমে একটি টেকসই ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন