ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাকে ভারতে ঢুকতে দেওয়া ছাড়া নয়াদিল্লির সামনে নাকি আর কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প ছিল না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনা নিয়ে দুই বছর পর এমন ব্যাখ্যা দিলেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। তার বক্তব্যে শুধু অতীতের একটি ঘটনার ব্যাখ্যা নেই। আছে শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের বর্তমান অবস্থানেরও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
আজ শনিবার, ৩ অক্টোবর রাজধানীর একটি হোটেলে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬-এর কর্ম অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, শেখ হাসিনাকে ভারতীয় বিমানবাহিনী বা সেনাবাহিনী ভারতে নিয়ে যায়নি। বাংলাদেশের সামরিক বিমানে করেই তিনি ভারতে গিয়েছিলেন। তখন তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ভারত ওই পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতও ছিল না। বিমানটিকে অবতরণের অনুমতি না দিলে ‘একদম অন্য রকম পরিস্থিতি’ তৈরি হতে পারত।
ভারতের একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের মুখে এমন ব্যাখ্যা তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে যাওয়ার পর থেকেই তার অবস্থান নিয়ে নয়াদিল্লির নীতি ছিল সতর্ক। কিন্তু দুই বছর পরও তাকে ফেরত পাঠানোর কোনো সময়সীমা দিচ্ছে না ভারত। বরং বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে জানিয়ে যাচ্ছে।
দীনেশ ত্রিবেদী শনিবারও বলেছেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি একটি ‘সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর’ মধ্যে রয়েছে। আদালত যুক্ত থাকায় কোনো সময়সীমা দেওয়া সম্ভব নয়। তার বক্তব্যের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক অবস্থানও মিলে যাচ্ছে।
গত ১৪ জুলাই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছিলেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশের অনুরোধকে আইনি বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১৭ জুলাই তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ থেকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ ভারত পেয়েছে এবং সেটি আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরীক্ষা করা হচ্ছে।
অর্থাৎ, ঢাকার অনুরোধ ভারত গ্রহণ করেছে। কিন্তু দ্রুত প্রত্যর্পণের কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ৩ অক্টোবর দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে সেই অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে।
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে ভারতে যাওয়ার পর থেকেই ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বক্তব্যেও তাকে নিয়ে বিশেষ সংবেদনশীলতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ৬ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সর্বদলীয় বৈঠকে বলেছিলেন, শেখ হাসিনা ভারতে পৌঁছেছেন এবং তাকে সময় দেওয়া হবে, যাতে তিনি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ভারতের সংবাদমাধ্যম এএনআই তখন এ তথ্য প্রকাশ করে।
শেখ হাসিনার দিল্লি পৌঁছানোর পর ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গে তার সাক্ষাৎও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। আল জাজিরা ১২ আগস্ট-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, শেখ হাসিনাকে দিল্লির কাছে ভারতীয় বিমানঘাঁটিতে গ্রহণ করেন ডোভাল। ওই প্রতিবেদনে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক প্রভাবের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
শুধু তাৎক্ষণিক আশ্রয় নয়, এরপরও শেখ হাসিনাকে ঘিরে দিল্লির অবস্থানে বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরও ভারত তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়নি। ভারত বিষয়টিকে আইনি কাঠামোর মধ্যে দেখার কথা বলে আসছে।
এখানে ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্কের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে গত দেড় দশকে ভারতের নিরাপত্তা, সীমান্ত, যোগাযোগ, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় বিস্তর সমঝোতা হয়েছিল। ভারতের অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের গবেষক সোহিনী বোস ২০২৫ সালের এক বিশ্লেষণে লিখেছেন, শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ভারতের অংশীদারত্ব নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও জনস্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছিল।
অন্য একটি গবেষণায় ভারতীয় গবেষক জ্যোতি ভট্টাচার্য লিখেছেন, গত এক দশকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের উন্নতির অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হাসিনা সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা দুই দেশের সম্পর্কের পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল।
এর অর্থ এই নয় যে নয়াদিল্লি বর্তমান বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চায় না। বরং ২০২৬ সালে সেই চেষ্টাও স্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ বেড়েছে। দীনেশ ত্রিবেদী নিজেও দুই দেশের মধ্যে সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার ওপর জোর দিয়েছেন। ৩ অক্টোবর তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ এবং অন্য দেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন হবে, সেই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের।
কিন্তু এখানেই শেখ হাসিনার প্রশ্নটি আলাদা হয়ে যাচ্ছে। একদিকে নয়াদিল্লি ঢাকার নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর প্রশ্নে কোনো সময়সীমা দিচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি হলেও শেখ হাসিনা এখনো সেই সমীকরণের বাইরে চলে যাননি।
২০২৪ সালের ২০ আগস্ট আন্তর্জাতিক ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছিল, শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়া ভারতের নিরাপত্তা লক্ষ্য এবং আঞ্চলিক প্রভাবের জন্য বড় পরিবর্তন তৈরি করেছে। অর্থাৎ দিল্লির কাছে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়া শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল না। এটি ভারতের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক কৌশলের ওপরও প্রভাব ফেলেছিল।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসও ২০২৪ সালের আগস্টে লিখেছিল, শেখ হাসিনা ভারতের জন্য দীর্ঘদিনের নির্ভরযোগ্য অংশীদার ছিলেন এবং তার ক্ষমতাচ্যুত হওয়া নয়াদিল্লির আঞ্চলিক কৌশলকে জটিল অবস্থায় ফেলেছে।
এই পটভূমিতে ৩ অক্টোবর দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যকে নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য হিসেবে দেখার সুযোগ কম। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ভারত শেখ হাসিনাকে নিয়ে আসেনি; কিন্তু তার বিমানকে অবতরণের অনুমতি না দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারত। অর্থাৎ ৫ আগস্টের সিদ্ধান্তকে ভারত এখনো একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে নেওয়া প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত হিসেবেই ব্যাখ্যা করছে।
আর প্রত্যর্পণের প্রশ্নে তার বক্তব্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। আদালত যুক্ত থাকার কারণে সময়সীমা নেই—এমন বক্তব্য কার্যত ঢাকাকে জানিয়ে দেয়, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাওয়ার বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তবে এটিকে সরাসরি আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার প্রতি ভারতের রাজনৈতিক সমর্থনের চূড়ান্ত প্রমাণ বলা যাবে না। ভারত বর্তমান বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়াতে চাইছে। কিন্তু চব্বিশের ৫ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহে একটি বিষয় স্পষ্ট: শেখ হাসিনাকে নিয়ে দিল্লির অবস্থান এখনো অন্য সাধারণ প্রত্যর্পণ মামলার মতো নয়। তার অবস্থানকে ভারত রাজনৈতিক ইতিহাস, নিরাপত্তা, কূটনীতি ও আইনি প্রক্রিয়া—সবকিছুর সমন্বিত বিষয় হিসেবে দেখছে।
দীনেশ ত্রিবেদীর সর্বশেষ বক্তব্য তাই বাংলাদেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। শেখ হাসিনাকে দ্রুত ফেরত পাঠানোর বিষয়ে নয়াদিল্লি এখনো কোনো সময়সীমা দিচ্ছে না। একই সঙ্গে তার ভারতে অবস্থানের বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তার পক্ষে কূটনৈতিক ব্যাখ্যাও দেওয়া হচ্ছে। দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে গড়ে উঠলেও শেখ হাসিনা-প্রশ্ন যে এখনো দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি, দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে সেটিই আবার সামনে এসেছে।
খবরটি শেয়ার করুন