ছবি: সংগৃহীত
বহু বছর ধরে মানুষের বিনোদনের উপকরণ হয়ে বেঁচে ছিল সে। বিশাল দেহ, অথচ অসহায় জীবন। নাম তার ‘বাদশা বাহাদুর’। নামের সঙ্গে রাজকীয়তার আভাস থাকলেও বাস্তবতা ছিল ঠিক উল্টো। দিনের পর দিন সার্কাসে প্রদর্শনের জন্য তাকে ব্যবহার করা হয়েছে। বিনিময়ে জুটেছে ক্লান্ত শরীর, অপ্রতুল খাবার, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাব এবং অবহেলায় ভরা এক জীবন।
বগুড়ার মহাস্থান এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সার্কাসে ব্যবহৃত এই হাতিটির দুর্দশার খবর সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিষয়টি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অসুস্থ, দুর্বল এবং অযত্নে থাকা প্রাণীটির ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, দেশে যেখানে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নানা আইন রয়েছে, সেখানে একটি হাতিকে কীভাবে বছরের পর বছর এমন অমানবিক পরিবেশে রাখা হলো?
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নজরে এলে তিনি হাতিটির নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও যথাযথ পরিচর্যার ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ‘বাদশা বাহাদুর’-কে ঢাকার জাতীয় চিড়িয়াখানায় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে। তিনি হাতিটির মালিক আব্দুর শুকুরের সঙ্গে আলোচনা করেন। আলোচনার পর মালিক স্বেচ্ছায় হাতিটিকে সরকারের জিম্মায় দিতে সম্মত হন। অনেক সময় প্রশাসনিক উদ্যোগ আদালত বা জটিল আইনি প্রক্রিয়ায় আটকে যায়। কিন্তু এখানে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হওয়ায় একটি প্রাণীর জন্য নতুন জীবনের পথ খুলে যায়।
গত শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে বগুড়ার মহাস্থান বন্দরে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাদশা বাহাদুর’-কে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। উপস্থিত ছিলেন প্রশাসনের কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পরে রাতেই বিশেষ ব্যবস্থায় হাতিটিকে ঢাকার জাতীয় চিড়িয়াখানার উদ্দেশে পাঠানো হয়।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার প্রতি সম্মান জানিয়ে মালিক স্বেচ্ছায় হাতিটি সরকারের জিম্মায় দিয়েছেন। জাতীয় চিড়িয়াখানায় তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, উন্নত পরিচর্যা এবং উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রাণী পরিচর্যাকারীদের তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে ‘বাদশা বাহাদুর’।
একটি হাতিকে কেবল বড় আকৃতির প্রাণী হিসেবে দেখলে ভুল হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, হাতি পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীদের একটি। তাদের স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর। তারা আনন্দ, দুঃখ, ভয়, বিচ্ছেদ এবং স্নেহ—সব ধরনের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে। পরিবারের কোনো সদস্য মারা গেলে হাতির পাল দীর্ঘ সময় শোক প্রকাশ করে। আহত সঙ্গীকে সাহায্য করার ঘটনাও বহুবার নথিভুক্ত হয়েছে।
এমন সংবেদনশীল একটি প্রাণী যখন বছরের পর বছর শিকলে বাঁধা থেকে মানুষের বিনোদনের জন্য কাজ করতে বাধ্য হয়, তখন সেটি শুধু প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতাই নয়; আমাদের মানবিক মূল্যবোধেরও পরীক্ষা।
বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যেই বন্যপ্রাণী ব্যবহার করে সার্কাস পরিচালনা বন্ধ করেছে। কারণ, সার্কাসে হাতি, বাঘ কিংবা ভালুককে দিয়ে কসরত করাতে দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। প্রাণী অধিকার সংগঠনগুলো বহুদিন ধরেই বলছে, বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবন কোনো খাঁচা বা প্রদর্শনীর মঞ্চে নয়; তাদের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ।
দেশেও ধীরে ধীরে প্রাণীকল্যাণ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ছে। পথপ্রাণী উদ্ধার, চিকিৎসা এবং প্রাণী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিয়মিত আহত কুকুর, বিড়াল, বানর, পাখি এমনকি বন্যপ্রাণীও উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রাণীকল্যাণে কিছু উদ্যোগও আলোচনায় এসেছে। রাজধানীতে বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (বাওয়া) উদ্যোগে একটি বিনামূল্যের প্রাণী চিকিৎসাকেন্দ্র উদ্বোধন করা হয়েছে, যেখানে আহত ও অসহায় প্রাণীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। সংগঠনটির কার্যক্রমে তারেক রহমানের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও গণমাধ্যমে এসেছে।
অনেক সময় একটি রাষ্ট্রকে বিচার করা হয় সে তার দুর্বলতম নাগরিকের সঙ্গে কেমন আচরণ করে। একইভাবে একটি সমাজ কতটা সভ্য, তার একটি বড় সূচক হলো—সে সমাজ প্রাণীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে। কারণ প্রাণীরা নিজেদের হয়ে কথা বলতে পারে না। তাদের কষ্টের ভাষা মানুষকেই বুঝতে হয়।
‘বাদশা বাহাদুর’-এর গল্প তাই শুধু একটি হাতির গল্প নয়। এটি এমন একটি সমাজের গল্প, যেখানে একসময় অবহেলায় থাকা একটি প্রাণীর আর্তনাদ শেষ পর্যন্ত মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। গণমাধ্যম বিষয়টি তুলে ধরেছে, প্রশাসন উদ্যোগ নিয়েছে, মালিক সহযোগিতা করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত প্রাণীটি নিরাপদ আশ্রয়ের পথে যাত্রা করেছে।
হয়তো জাতীয় চিড়িয়াখানায় পৌঁছেও তার সব কষ্ট একদিনে দূর হবে না। দীর্ঘদিনের অপুষ্টি, শারীরিক দুর্বলতা বা মানসিক চাপ কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। কিন্তু অন্তত তার সামনে এখন চিকিৎসার সুযোগ আছে, নিয়মিত খাবার আছে, বিশ্রামের পরিবেশ আছে এবং সবচেয়ে বড় কথা—প্রতিদিন সার্কাসের মঞ্চে মানুষের বিনোদনের জন্য নিজেকে নিংড়ে দিতে হবে না।
'বাদশা বাহাদুর'-এর নতুন জীবন শুরু হওয়ার এই ঘটনাটি আমাদেরও একটি শিক্ষা দিয়ে যায়। প্রাণী কেবল মানুষের সম্পদ নয়, তারা এই পৃথিবীরই সমান অধিকারসম্পন্ন বাসিন্দা। তাদের প্রতি দয়া দেখানো অনুগ্রহ নয়; এটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব।
হয়তো একদিন জাতীয় চিড়িয়াখানার বিস্তৃত চত্বরে ধীর পায়ে হাঁটবে ‘বাদশা বাহাদুর’। তখন তার শরীরে থাকবে না নির্যাতনের নতুন কোনো দাগ, চোখে থাকবে না আতঙ্কের ছাপ। সেই দৃশ্য শুধু একটি হাতির সুস্থ হয়ে ওঠার গল্প হবে না; সেটি হবে মানুষের মানবিকতারও এক নীরব বিজয়।
খবরটি শেয়ার করুন