ছবি: লেখকের ফেসবুক থেকে নেওয়া
আবু জাফর সূর্য
আজকের দিনে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বা স্বাধীন মতপ্রকাশের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ‘ট্যাগিং’-এর শিকার হওয়া। সত্য এবং যৌক্তিক কোনো কথা বললেই এক পক্ষ আপনাকে ‘আওয়ামী লীগের দালাল’ বা ইদানীংকালের বহুলচর্চিত কোনো গালি দিয়ে সমাজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোণঠাসা করার চেষ্টা করবে। আবার বিপরীত দিক থেকে, আওয়ামী লীগের অন্ধ সমর্থক গোষ্ঠী আপনাকে মুহূর্তে ‘বিএনপি-জামাত’, ‘দেশবিরোধী’ ও ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ শক্তির অংশ বলে চালিয়ে দেবে। এই দ্বিমুখী সংকটের মাঝে দাঁড়িয়েও ইতিহাসের সত্য পাঠ, রাজনীতির গতিপ্রকৃতি এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নির্মোহ আলাপ জারি রাখা অত্যন্ত জরুরি।
আমার অবস্থান পরিষ্কার—গত ১৬ বছরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার নিক্তির পরিমাপে পুরোপুরি ত্রুটিমুক্তভাবে প্রশাসন, অর্থনীতি ও রাজনীতি পরিচালনা করতে পারেনি। এই দীর্ঘ শাসনামলে যেমন দৃশ্যমান ও অভূতপূর্ব উন্নয়ন, অবকাঠামোগত অগ্রগতি এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সেরা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সূচক অর্জন সম্ভব হয়েছিল, ঠিক তেমনি বিপরীত দিকে বিরোধী মত দমনের অশোভন রূপ, অর্থনৈতিক সুশাসনের তীব্র অভাব, সীমাহীন আর্থিক লুটপাট এবং ব্যাংক খাতের বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল, আছে এবং থাকবে। ইতিহাস ও রাজনীতির চলক হিসেবে শেখ হাসিনার এই শাসনামল নিয়ে ভবিষ্যতে বহু বিস্তারিত আলোচনা, গবেষণা এবং বড়সড় তথ্যচিত্র তৈরি হবে, যা তার সফলতার পাশাপাশি রাজনৈতিক স্খলনকেও ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ রাখবে।
জাতীয় উন্নয়নে জাতিসংঘের মানদণ্ড ও বাংলাদেশের অবস্থান
একটি সত্য কোনোভাবেই মুছে ফেলা যাবে না যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সার্বিক টেকসই উন্নয়নে জাতিসংঘের যে মানদণ্ড ও সূচক দেওয়া হয়েছিল, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ তার অধিকাংশ ক্ষেত্রে সবার চেয়ে এগিয়ে ছিল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ একসময় অভাবনীয় নজির স্থাপন করেছিল। বৈশ্বিক মহামারি বা সংকটের মধ্যেও অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রাখার যে প্রয়াস ছিল, তা আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়েছে।
কিন্তু এই উন্নয়ন ও অগ্রগতির সমান্তরালে যখন সুশাসনের ঘাটতি এবং একদলীয় আধিপত্যবাদী মনস্তত্ত্বের বিকাশ ঘটে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের গভীর ক্ষোভের সঞ্চার হয়। তবে উন্নয়নের বাস্তবতাকে অস্বীকার করাও কোনো বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের অংশ হতে পারে না।
ইতিহাসের সত্য এবং মুক্তিযুদ্ধের এককেন্দ্রিক বয়ান
আমাদের মহান মুক্তিসংগ্রাম ও ১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের যে বিশাল ক্যানভাস, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের অবদান অনস্বীকার্য। তবে সমালোচনা এখানেই যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতার দীর্ঘ সময়ে এসে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কেবল নিজেদের দলীয় পরিমণ্ডলে আবদ্ধ এবং ধারাবাহিকভাবে এককেন্দ্রিক করার চেষ্টা করেছে। মুক্তিসংগ্রামের দীর্ঘ আন্দোলন এবং নয় মাসের সশস্ত্র লড়াইয়ে সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র এবং অন্যান্য প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তির যে আত্মত্যাগ ছিল, তাকে যথাযথভাবে মহিমান্বিত করা হয়নি।
কিন্তু এই একপেশে চর্চাকে কেন্দ্র করে যারা একাত্তরের মূল নেতা বঙ্গবন্ধু ও মূলধারাকেই অস্বীকার করতে চান, তারা আরও বড় ঐতিহাসিক অপরাধে লিপ্ত। ইতিহাস সাক্ষী যে, পাকিস্তান শাসনামলে পূর্ববাংলায় ধারাবাহিকভাবে যত জাতীয়তাবাদী গণসংগ্রাম, অধিকারের লড়াই, ভাষা আন্দোলন এবং গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে, সেসব ইতিহাসের প্রধান চরিত্র ও চালিকাশক্তি ছিল আওয়ামী লীগ এবং এর অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একাত্তরের ইতিহাস এবং আওয়ামী লীগের পথচলা একে অপরের পরিপূরক।
বঙ্গবন্ধুর আত্মসমর্পণ বিতর্ক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ এবং বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করতে গিয়ে একদল সমালোচক মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুর শারীরিক উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি নিয়ে নানা বিভ্রান্তিকর এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আলাপ সামনে নিয়ে আসেন। তাদের প্রধান ও বহুলচর্চিত সমালোচনা হলো—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতে পাকিস্তানিদের হাতে ‘স্বেচ্ছায় ধরা’ দিয়েছেন বা আত্মসমর্পণ করেছেন। এসব আলাপের সমালোচকেরা একটি ছোট অথচ অত্যন্ত যৌক্তিক এবং ঐতিহাসিক প্রশ্নের উত্তর কখনোই দিতে চান না বা সচেতনভাবে এড়িয়ে যান।
আমরা যদি তৎকালীন প্রেক্ষাপট বিবেচনা করি, মুক্তিসংগ্রামের শুরু থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আন্তর্জাতিক বয়ান ছিল—পূর্ব পাকিস্তানে বা পূর্ববাংলায় যে আন্দোলন-সংগ্রাম চলছে, তা মূলত ভারতের একটি গভীর ষড়যন্ত্র। তাদের দাবি ছিল, আওয়ামী লীগ হলো একটি মুসলিম-বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি এবং ভারতীয় আজ্ঞাবহ দল, যারা ভারতের সরাসরি সহযোগিতায় পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করতে চায়। এই জটিল ও সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কি আত্মগোপন করা সম্ভব ছিল? ঢাকায় আত্মগোপন করে বা গোপনে ভারতে পালিয়ে গিয়ে কি আন্দোলন পরিচালনা করা যেত?
তিনি যদি ২৫ মার্চ রাতে আত্মগোপনে যেতেন বা ভারতে প্রবেশ করতেন, তবে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বিশ্বদরবারে খুব সহজেই প্রমাণ করতে পারত যে, বাঙালির এই স্বাধীনতার লড়াই কোনো গণআন্দোলন নয়, বরং এটি ভারতের একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র এবং এর পেছনে ভারতের হাত রয়েছে। এতে করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন এবং বৈশ্বিক জনমত গঠন অত্যন্ত কঠিন, এমনকি অসম্ভব হয়ে পড়তে পারত। বঙ্গবন্ধু নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও নিজ বাসগৃহে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দেশপ্রেমের এক চির ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হিসেবে। ইতিহাসের বিভিন্ন পাঠ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান থেকে জানা যায়, তিনি নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে অন্য সব স্তরের নেতাকর্মীকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
তাছাড়া, ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে তিনি জাতিকে অগ্রিম বার্তা দিয়ে রেখেছিলেন। তিনি খুব দূরদর্শী নেতা ছিলেন বলেই জানতেন যে, কোনো মুহূর্তে তাকে বন্দি বা হত্যা করা হতে পারে। তাই তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলে গিয়েছিলেন, “আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।” এই এক লাইনের নির্দেশের মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধের সমগ্র গেরিলা যুদ্ধের রণকৌশল এবং দিকনির্দেশনা নিহিত ছিল।
তৎকালীন বাঙালির একক ও অবিসংবাদিত প্রধান নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ নিয়ে যদি কেউ মিথ্যাচার করে বা বলে যে, একাত্তরে তিনি বাঙালির প্রধান নেতা ছিলেন না, তবে বুঝতে হবে সেই ব্যক্তি জীবনে অন্তত একটি বড় মিথ্যা কথা বলেছেন এবং তার এই মিথ্যা প্রমাণের জন্য আলাদা কোনো প্রামাণ্য দলিল জোগাড় করার প্রয়োজন নেই; ইতিহাস নিজেই তার বড় প্রমাণ।
সুপ্ত-গুপ্ত চেতনা ও ‘হাইব্রিড’ আওয়ামী লীগ
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে এমন এক শ্রেণির মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যারা মগজে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক বয়ানের সঙ্গে কখনোই একমত হতে পারেনি। এই সুপ্ত ও গুপ্ত চিন্তার মানুষেরা অত্যন্ত নীরবে ও নিরবচ্ছিন্নভাবে নিজেদের পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে বাংলাদেশবিরোধী এবং পাকিস্তানপ্রীতির আলাপ জারি রেখেছে। তারা এই আলাপ জারি রাখার সুযোগ পেয়েছে মূলত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তির ধারাবাহিক ভুল, আর্থিক অনিয়ম, একপেশে রাজনৈতিক চর্চা, তীব্র গণতন্ত্রের ঘাটতি এবং মুক্তিযুদ্ধের অবদানকে এককেন্দ্রিক করার কিছু যৌক্তিক কারণে।
রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে এটি উল্লেখ করা অত্যন্ত জরুরি যে, ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু একচ্ছত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও তৎকালীন পূর্ববাংলার সাধারণ ভোটারদের প্রায় ৩০ শতাংশ সমর্থন পাকিস্তানপন্থী এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির পক্ষে পড়েছিল। সেই ৩০ শতাংশ মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ও মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল জোয়ারের চাপে ওই সময়ে সুপ্ত ও গুপ্ত অবস্থায় থাকতে বাধ্য হয়েছিল। পরবর্তীতে সময় ও সুযোগ বুঝে তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভেতরে নিজেদের লুকিয়ে ফেলে এবং রাষ্ট্রের বড় বড় সুযোগ-সুবিধা ও ভোগবিলাস গ্রহণ করে।
তারা বাহ্যিকভাবে ভোল পাল্টালেও নিজেদের মগজ থেকে পাকিস্তানপ্রীতি এবং একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধের চেতনা কোনো দিন ভুলতে পারেনি। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এই সুবিধাবাদী ও গুপ্ত চেতনার লোক আওয়ামী লীগেও কম প্রবেশ করেনি। ইদানীং তাদের অনেকেই ‘হাইব্রিড আওয়ামী লীগ’ বা ‘বসন্তের কোকিল’ বলে অভিহিত করেন, যারা ক্ষমতার সুবিধা নিতে দলে ঢুকে দলেরই বারোটা বাজিয়েছে। আবার বিপরীত দিকে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অন্যান্য দলেও তাদের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে। এই মানুষগুলো কেবল আওয়ামী লীগেরই বিরোধী নয়, তারা মূলত বাংলাদেশের অস্তিত্ব, সার্বভৌমত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার বিরোধী।
বাংলাদেশপন্থী বনাম সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রচিন্তা
তাহলে এখানে প্রশ্ন আসে—আওয়ামী লীগকে সমর্থন না করলেই কি কেউ পাকিস্তানপন্থী হয়ে যাবে? না, তা কখনোই নয়। বিকল্প পথ হতে হবে ‘বাংলাদেশপন্থী’। অর্থাৎ, মুক্তিসংগ্রামের মূল আকাঙ্ক্ষা—একটি অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। চোখ খুলে দেখলে বোঝা যায়, আমাদের দেশের রাজনীতিতে আজ সেই আকাঙ্ক্ষার অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি কারা করছে আর কারা বিপরীত স্রোতে হাঁটছে।
আপনি যদি একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ দাবি না করে মধ্যযুগীয় ‘খেলাফতের বাংলাদেশ’ দাবি করেন, কেউ যদি অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী সমাজচিন্তা না করে কেবল ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদী বা কট্টর ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা করেন, তবে কি আপনি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মূল আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে থাকলেন? অবশ্যই থাকলেন না। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা ছিল সর্বস্তরের মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার।
২৪-এর আন্দোলন এবং সার্বিক বৈষম্য বিলোপের প্রশ্ন
সাম্প্রতিক ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মূল শিরোনাম এবং স্লোগান ছিল ‘বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ’। এটি একটি অত্যন্ত চমৎকার এবং সময়োপযোগী আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে একটি গভীর প্রশ্ন তুলতে হবে—স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে কি শুধু সরকারি চাকরির কোটা নিয়েই বৈষম্য হয়েছে? আমাদের সমাজে কি আর কোনো বৈষম্য বিদ্যমান নেই? তাহলে কেন সেই অন্য সব মৌলিক বৈষম্যের আলাপগুলো রাষ্ট্র ও সমাজের সদর দরজায় শক্ত করে কড়া নাড়তে পারল না?
আজ আমাদের সমাজে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা এবং চিকিৎসার যে আকাশচুম্বী ও অমানবিক বৈষম্য তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে কেন জোরালো কোনো গণআন্দোলন গড়ে ওঠে না? কেন ধনীর সন্তান ও গরিবের সন্তানের শিক্ষার মান আলাদা হবে? কেন চিকিৎসার অভাবে সাধারণ মানুষকে ঘটিবাটি বিক্রি করতে হবে, আর প্রভাবশালীরা বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নেবেন?
এই মৌলিক বৈষম্য বিলোপের দাবিগুলোকে আমাদের রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকেরা যুগে যুগে আস্তে ধীরে দুর্বল ও আড়াল করে দিয়েছেন। উপরন্তু, দেশের রাজনীতি আজ পুরোপুরি বিদেশি শক্তির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হস্তক্ষেপে চলে গেছে। এটিও কি দেশের স্বাধীন ও সার্বভৌম জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর এক ধরনের চরম বৈষম্য এবং ব্যভিচার নয়?
বিচার এবং ইতিহাসের কাঠগড়া: সবার জবাবদিহি চাই
আজকের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দাবি উঠছে—আইনি প্রক্রিয়ায় বা বিচারের রায়ে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হবে। হ্যাঁ, দেশের প্রচলিত আইন বা সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনে অপরাধের বিচার হতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জামায়াতে ইসলামী তাহলে কি পুরোপুরি অপরাধশূন্য? একাত্তর সালে তাদের যে রক্তক্ষয়ী ও মানবতাবিরোধী অবস্থান ছিল, তা কি পরবর্তীতে বিভিন্ন নির্বাচনে অংশ নিয়ে বা সংসদে বিরোধী দল হওয়ার মাধ্যমে দুধে ধুয়ে একেবারে পরিশুদ্ধ ও পবিত্র হয়ে গেছে?
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হত্যার পরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শুধু সেনানিবাসের বিচারের নামে বা ক্যু দমনের অজুহাতে বীর মুক্তিযোদ্ধা বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের শাসনকালে সশস্ত্র বাহিনীর শত-শত, কেউ কেউ বলেন হাজারের বেশি বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সৈনিককে বিচারের নামে ফাঁসি বা হত্যা করা হয়েছে। সেই সব নির্মম ঐতিহাসিক হত্যাকাণ্ড কি চিরকাল আলোচনার বাইরে থেকে যাবে? তাদের পরিবার কি কোনো দিন বিচার পাবে না? আলাপ ও বিতর্ক যাই হোক না কেন, রাষ্ট্র থেকে সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ হতে হবে।
মানবিক ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে একাত্তরের স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশ কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর খেয়ালখুশিতে বা আইনের খসড়ায় নয়, বরং দেশের সুপ্রতিষ্ঠিত আইন অনুযায়ী চলা উচিত। একেক শাসনামলে দেশের আইন, গণতন্ত্র এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আলাদা আলাদা রঙের না হয়ে, তা যেন একটি জাতীয় ঐক্য ও একক সত্যে রূপ নেয়।
প্রাসঙ্গিক আলাপ হলো, জনগণের আদালতই শেষ কথা
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে বলে এক নিমিষে আওয়ামী লীগ সব খারাপ করেছে আর বিএনপি-জামায়াত বা অন্য সব দল ধোয়া তুলসী পাতা বা সব ভালো করেছে—বিষয়টি মোটেও তেমন সরল নয়। রাজনীতিতে কোনো দলের প্রকৃত বিচারের দিন বা চূড়ান্ত রায় ঘোষণার দিন হলো ‘জাতীয় নির্বাচনের দিন’। সেখানে প্রতিটি নাগরিককে তার ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে রায় দিতে হয়। রাজনৈতিক দলের এই বিচার কোনো বিশেষ ট্রাইব্যুনালে নয়, বরং হতে হবে জনগণের উন্মুক্ত আদালতে। আর জনগণের আদালতের সেই চূড়ান্ত রায়ের পবিত্র দিনটি হচ্ছে অবাধ ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনের দিন।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরের দিনগুলো মূলত আদালতের শুনানি এবং জনগণের সামনে রাজনৈতিক দল ও শক্তিগুলোর সওয়াল-জবাব দেওয়ার সময়। আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত বিচারও ওই সওয়াল-জবাব শেষে এই জনতার আদালতেই হতে হবে। এটি সত্য যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় অন্ধ হয়ে বিগত নির্বাচনগুলোকে প্রহসনে পরিণত করেছিল, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে একপাক্ষিক ও সংকীর্ণ পাঠে রূপ দিয়েছিল এবং রাজনৈতিক ভিন্নমতকে অত্যন্ত অগণতান্ত্রিকভাবে দমন করেছিল।
তাদের শাসনামলে লাগামহীন অর্থনৈতিক লুটপাট ও অর্থ পাচার হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা যে দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশের ভিত্তি এবং মেগা প্রজেক্টগুলোর বাস্তবায়ন করেছে, তা কি হলফ করে কেউ অস্বীকার করতে পারবে? সব মিলিয়ে ভালো-মন্দের এই হিসাব কোনো ফরমায়েশি রায়ে নয়, জনগণের সরাসরি ভোটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত। কারণ, শেষ পর্যন্ত জনগণের আদালতই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও অমোঘ আদালত।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক নেতা।