ফাইল ছবি
জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্রপতির ভাষণে বিএনপির রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রতিফলন থাকলেও তার অতীত রাজনৈতিক পরিচয় ও অবস্থানের কারণে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকেরা। এমন প্রেক্ষাপটে দৈনিক প্রথম আলো-তে প্রকাশিত এক কলামে বিষয়টি নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট সোহরাব হাসান।
এই সাংবাদিক তার “সংসদে ‘আওয়ামী’ রাষ্ট্রপতির বিএনপি–বয়ান” শিরোনামের কলামটি প্রথম আলো-তে লিখেছেন ১৪ই মার্চ। কলামে তিনি সংসদে দেওয়া রাষ্ট্রপতির ভাষণের রাজনৈতিক তাৎপর্য, ক্ষমতার রাজনীতি এবং দলীয় বয়ানের পরিবর্তন নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা করেন।
কবি সোহরাব হাসান বলছেন, আমরা অতীতে বিএনপির রাষ্ট্রপতির মুখে আওয়ামী বুলি শুনেছি। আর এবার আওয়ামী রাষ্ট্রপতির মুখে বিএনপির বুলি শুনলাম। প্রথা অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রথম অধিবেশনে শোকপ্রস্তাব আনা হয়। এই শোকপ্রস্তাবে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত ব্যক্তিদের নামও আছে। এসব নিয়ে কেউ আপত্তি করেননি। বরং মুক্তিযোদ্ধা স্পিকার বিনা বাক্য ব্যয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, সব নাম অন্তর্ভুক্ত করা হলো।
তিনি বলেন, জাতীয় সংগীত বাজানোর মুহূর্তে যেভাবে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের একাংশ নিজ নিজ আসনে বসে থাকলেন, সেটা অনেককে আহত করেছে। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন ভাষণে আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট দল ও আওয়ামী লীগ শাসনকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু তিনি বিএনপির আমলে চারবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কথা বলতে পারেননি। রাষ্ট্রপতি স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে জিয়াউর রহমানের নাম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করলেও বঙ্গবন্ধু বা অন্য কোনো নেতার নাম বলেননি।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনই ২০২৪ সালের ৩০শে জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী ভাষণে বিএনপি ও এর সহযোগীদের দেশবিরোধী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। সেবার তিনি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে অভিহিত করে ষড়যন্ত্র ও গুজব রটনাকারীদের সম্পর্কে সজাগ থাকতে বলেছিলেন দেশবাসীকে।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে রাষ্ট্রপতি পদটিকে বরাবর ‘আজ্ঞাবহ’ করে রাখা হয়েছে বিভিন্ন সরকারের আমলে। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ছাড়া আর কোনো রাষ্ট্রপতি স্বীয় সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার চেষ্টা করেননি। তিনিও সংসদে সরকারি দলের লিখিত ভাষণ পড়ার পাশাপাশি নিজের বক্তব্যও তুলে ধরতেন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন দুই সরকারের আমলে ভিন্ন রূপে আবির্ভূত হলেন। ২০২৪ সালের ৩০শে জানুয়ারি সংসদে দেওয়া ভাষণ আর চলতি বছরের ১২ই মার্চ সংসদে দেওয়া দুটি ভাষণ মিলিয়ে দেখলে আমাদের গণতন্ত্র ও রাজনীতির প্রকৃত ব্যাধিটি ধরা পড়বে। আগের ভাষণে তিনি ৭ই জানুয়ারির নির্বাচনে দেশের জনগণ ও গণতন্ত্রের জয় ও যুগান্তকারী ঘটনা বলে উল্লেখ করেছিলেন। এক যাত্রায় দুই ফলের কথা শুনেছি। এবার দেখা গেল রাষ্ট্রপতির পদে আসীন একই ব্যক্তির দুই বয়ান।
সোহরাব হাসান বলেন, রাষ্ট্রপতিদের মধ্যে দু–একজন ব্যতিক্রম বাদে কেউ নিজস্ব ব্যক্তিত্ব ও স্বকীয় ভাবমূর্তি তুলে ধরতে পারেননি। ব্যতিক্রম হিসেবে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ও অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নাম উল্লেখ করা যায়, যারা ক্ষমতাসীন দলের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করেননি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ১৯৭২ সালের ১২ই জানুয়ারি পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হলেও দুই বছরের মাথায় পদত্যাগ করেছেন সরকারি দলের সঙ্গে টানাপোড়েনের কারণে। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে বিরোধের কারণে ২০০২ সালে বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে পদত্যাগ করতে হয় কয়েক মাসের মাথায়। তার বিরুদ্ধে অভিশংসন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ দুবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, নব্বইয়ে স্বৈরাচারের পতনের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। আর দ্বিতীয়বার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। কোনোবারই তার বিদায় সম্মানজনক হয়নি। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো সম্মানিত ব্যক্তিদের সম্মান দেখিয়েছে, এ রকম উদাহরণ কম। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ পূরণ করলেও আওয়ামী লীগের চরম বিরাগভাজন হয়েছিলেন ২০০১ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে।
তিনি লেখেন, সংবিধানের ৭৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিবছর সংসদের প্রথম অধিবেশন ও সাধারণ নির্বাচনের পর প্রথম বৈঠক বা অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার রেওয়াজ আছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি সেই ভাষণ নিজের বুদ্ধিবিবেক অনুযায়ী দিতে পারেন না। তাকে ক্ষমতাসীন দলের লিখিত ভাষণ পড়তে হয়। এই রেওয়াজই চলে আসছে। কেউ পাল্টানোর কথা বলছেন না। এ কারণেই আমরা অতীতে বিএনপির রাষ্ট্রপতির মুখে আওয়ামী বুলি শুনেছি। আর এবার আওয়ামী রাষ্ট্রপতির মুখে বিএনপির বুলি শুনলাম।
কলামে সোহরাব হাসান লিখেছেন, রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব হচ্ছে সরকারের নীতিনির্ধারণী বক্তব্য সংসদে উপস্থাপন করা। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কখনো কখনো রাষ্ট্রপতির ভাষণ দলীয় রাজনীতির প্রতিফলন হিসেবেই সামনে আসে। তার ভাষায়, “রাষ্ট্রপতির ভাষণ মূলত সরকারের নীতির প্রতিফলন হলেও এর রাজনৈতিক পাঠ ভিন্নভাবে করা হয়।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান বাস্তবতায় এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে একজন আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রপতির মুখে বিএনপির রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে কলামে তিনি বলেন, “যাকে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের মানুষ হিসেবে দেখা হয়েছে, তার কণ্ঠে বিএনপির বয়ান শোনা গেলে তা রাজনৈতিকভাবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দেয়।”
সোহরাব হাসান তার বিশ্লেষণে বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক ভাষ্যও পরিবর্তিত হয়। ফলে রাষ্ট্রপতির ভাষণের মধ্যেও সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি মনে করেন, সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চা শক্তিশালী করতে হলে রাষ্ট্রপতির ভাষণকে দলীয় রাজনীতির বাইরে রেখে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের প্রতিফলন ঘটানো প্রয়োজন।
কলামে তিনি আরও মন্তব্য করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপতির ভাষণ অনেক সময় রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হলে এই ভাষণকে জাতীয় ঐক্য ও ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণের দিকনির্দেশনা হিসেবে দেখা জরুরি।
সোহরাব হাসান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে লিখে আসছেন। সাংবাদিকতা জগতে তিনি একজন সাহসী ও বিশ্লেষণধর্মী কলামিস্ট হিসেবে পরিচিত। তার লেখায় সমকালীন রাজনীতির নানা জটিল প্রশ্ন স্পষ্ট ভাষায় উঠে আসে, যা পাঠকদের মধ্যে নতুন আলোচনা তৈরি করে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে সোহরাব হাসানের এই বিশ্লেষণ বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে। তার মতে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হলে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রীয় পদগুলোর ভূমিকা আরও সুস্পষ্ট ও নিরপেক্ষ হওয়া প্রয়োজন।
খবরটি শেয়ার করুন