শনিবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১১ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** প্রাথমিকে নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের নিয়ে যা বললেন শিক্ষামন্ত্রী *** শেখ হাসিনার বিষয়টি ঢাকা ও দিল্লির ওপর ছেড়ে দিল ওয়াশিংটন, তারেক রহমানের প্রতি আস্থার ইঙ্গিত *** জাতিসংঘ সফর শেষে দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী *** যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ *** স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রটির মালিকানা নিয়ে যা গন্ডগোল, তা কোর্টে নির্ধারণ হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী *** মধ্যরাতে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুর: এমপির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ প্রসঙ্গে যা বলল ডিএমপি *** জাসদের কার্যালয় থেকে আ.লীগ সন্দেহে অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী আটক *** জাসদ কার্যালয় থেকে সাংবাদিক নেতা আবু জাফর সূর্য আটক *** মিরপুরে স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রের গেটে ত্রিপল টানিয়ে চলছে টিকাদান, ভোগান্তিতে শিশু-মায়েরা *** স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র ভাঙচুরে পুলিশের গাফিলতি ছিল কি না, তদন্ত হচ্ছে: ডিএমপি কমিশনার

সুখবর এক্সপ্লেইনার

নিজেকে কারাগারে পাঠাতে ইউএনওর কাছে আবেদন, ৫ মাসের কারাদণ্ড

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০৮:০০ অপরাহ্ন, ২রা জুলাই ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

জহুরুল ইসলাম তিন দিন ধরে একই পথ হেঁটেছেন। প্রতিদিনই তিনি গেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে। কিন্তু তার হাতে ছিল না কোনো দরখাস্ত, যেখানে জমির বিরোধ, ভাতার আবেদন বা সরকারি সহায়তার কথা লেখা আছে। তার একটাই অনুরোধ—তাকে যেন কারাগারে পাঠানো হয়। কারণ, তিনি আর মাদকের নেশা করতে চান না। কিন্তু নিজের সঙ্গে লড়াই করে আর জিততে পারছেন না।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার জাহানাবাদ গ্রামের ৫০ বছর বয়সী এই মানুষটির গল্প অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হতে পারে। কিন্তু যারা দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্তি নিয়ে কাজ করেন, তাদের কাছে এটি এক ধরনের অসহায় আত্মসমর্পণের গল্প। এমন এক মানুষের গল্প, যিনি বুঝে গেছেন যে নেশা তাকে ধীরে ধীরে পরিবার, সমাজ এবং নিজের কাছ থেকেই দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। তাই শেষ আশ্রয় হিসেবে তিনি রাষ্ট্রের কাছেই বন্দিত্ব চেয়েছেন।

গতকাল বুধবার (১ জুলাই) ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জহুরুল ইসলামকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় পাঁচ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ১০০ টাকা অর্থদণ্ড এবং অর্থ অনাদায়ে আরও সাত দিনের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। পরে তাকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দিন জহুরুল ইউএনও কার্যালয়ে এসে জানান, তিনি আর মাদক সেবন করতে চান না। কিন্তু কোনোভাবেই নেশা ছাড়তে পারছেন না। কর্মকর্তারা তার আন্তরিকতা যাচাই করতে তাকে পরদিন আসতে বলেন। দ্বিতীয় দিনও তিনি একই অনুরোধ নিয়ে হাজির হন। এরপরও তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তৃতীয় দিন আবারও একই আবেদন জানালে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তাকে সাজা দেওয়া হয়।

উপজেলা প্রশাসনের ভাষ্য, শুধু জহুরুল নন, তৃতীয় দিন তার পরিবারের এক সদস্যও উপস্থিত ছিলেন। তিনিও অনুরোধ করেছিলেন, জহুরুল যেন কারাগারে গিয়ে অন্তত কিছুদিন মাদক থেকে দূরে থাকতে পারেন। সেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই আদালত আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

জহুরুলের জীবনের আরেকটি তথ্যও সামনে এসেছে। এর আগে একটি মাদক মামলায় তিনি ছয় মাস কারাভোগ করেছিলেন। কিন্তু কারামুক্ত হওয়ার পরও নেশা ছাড়তে পারেননি। অর্থাৎ কারাগারের আগের অভিজ্ঞতাও তাকে স্থায়ীভাবে সুস্থ করে তুলতে পারেনি। তবু এবার তিনি আবার কারাগারকেই বেছে নিয়েছেন। কারণ হয়তো তার কাছে আর কোনো পথ খোলা ছিল না।

এই ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই জহুরুলের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন। তাদের ভাষ্য, একজন মানুষ যখন নিজেই রাষ্ট্রের কাছে সাহায্য চাইতে এসেছেন, তখন সেই সাহায্যের ধরন কী হওয়া উচিত ছিল—সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।

অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, দেশে যখন সরকার পরিচালিত মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা রয়েছে, তখন একজন দরিদ্র মাদকাসক্তকে সেখানে ভর্তির উদ্যোগ নেওয়া যেত কি না। তাদের মতে, একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি বিবেচনা করতে পারতেন।

আবার কেউ কেউ প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে আইনের সীমার মধ্যেই দেখছেন। তাদের যুক্তি, ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রচলিত আইন অনুসারেই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে তারা মনে করেন, কারাগারে পাঠানোর পরও বন্দির জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি বড় প্রশ্ন—মাদকাসক্তি কি শুধু অপরাধ, নাকি এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্যসমস্যা?

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্য গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, মাদকাসক্তি মূলত একটি দীর্ঘস্থায়ী ও পুনরাবৃত্তিপ্রবণ রোগ। শুধু কয়েক মাস মাদক থেকে দূরে রাখলেই একজন মানুষ স্থায়ীভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন না। প্রয়োজন চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, পরিবারভিত্তিক সহায়তা, মানসিক পুনর্বাসন এবং সমাজে পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ।

দেশে মাদকাসক্তদের চিকিৎসার জন্য সরকারি ব্যবস্থাও রয়েছে। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সরকারি মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র বহু বছর ধরে সেবা দিয়ে আসছে। এছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন বিভাগে সরকারি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি হাসপাতালের মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগেও অনেক ক্ষেত্রে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রয়োজনের তুলনায় এসব সেবার পরিধি এখনও সীমিত। শয্যাসংখ্যা কম, প্রশিক্ষিত জনবলও পর্যাপ্ত নয়। ফলে বহু মানুষ চিকিৎসার সুযোগ পেলেও অনেকেই সেই সেবার বাইরে থেকে যান।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক সংস্থা এবং বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ বলে ধারণা করা হয়। এর মধ্যে নিয়মিত চিকিৎসা নেন খুব অল্পসংখ্যক মানুষ। অনেকেই চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারেন না। আবার অনেক পরিবার সামাজিক লজ্জার ভয়ে চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে চান না। ফলে সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে।

মাদকাসক্তির কারণে শুধু একজন ব্যক্তি নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো পরিবার। অনেক পরিবারে উপার্জন বন্ধ হয়ে যায়। পারিবারিক সহিংসতা বাড়ে। সন্তানদের লেখাপড়া ব্যাহত হয়। সামাজিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, এটি শুধু একজন রোগীর সংকট নয়; এটি একটি পারিবারিক ও সামাজিক সংকট।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন ব্যক্তি যখন নিজে থেকে চিকিৎসা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন, তখন সেটিকে অত্যন্ত ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। কারণ চিকিৎসার অন্যতম বড় শর্তই হলো রোগীর নিজের ইচ্ছা। এমন মানুষকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনতে পারলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও তুলনামূলক বেশি থাকে।

জহুরুল ইসলামের ঘটনা তাই অনেকের কাছে একটি হারিয়ে যাওয়া সুযোগের কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে। যদি তাকে সরকারি কোনো চিকিৎসা বা পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হতো, তাহলে হয়তো বিষয়টি ভিন্নভাবে আলোচিত হতো। অবশ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন কোনো উদ্যোগ বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।

বিশ্বের অনেক দেশ এখন মাদকাসক্তিকে শাস্তিমূলক নয়, বরং জনস্বাস্থ্যগত দৃষ্টিভঙ্গিতে মোকাবিলার চেষ্টা করছে। সেখানে চিকিৎসা, পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক পুনর্গঠনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কারণ গবেষণা বলছে, শুধু কারাদণ্ড দিয়ে মাদকাসক্তির পুনরাবৃত্তি পুরোপুরি ঠেকানো কঠিন।

দেশেও মাদকবিরোধী অভিযান এবং আইনি ব্যবস্থা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পরিধি আরও বাড়ানো। বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের জন্য সহজলভ্য সরকারি চিকিৎসা নিশ্চিত করা, পরিবারকে কাউন্সেলিং দেওয়া এবং সুস্থ হওয়ার পর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা না গেলে অনেকেই আবার পুরোনো জীবনে ফিরে যেতে পারেন।

জহুরুল ইসলাম এখন কারাগারে। পাঁচ মাস পর তিনি মুক্ত হবেন। কিন্তু মুক্তির পর তার জন্য কী অপেক্ষা করছে? একটি নতুন জীবন, নাকি আবার সেই পুরোনো নেশার অন্ধকার?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু জহুরুলের কাছে নেই। উত্তরটি রাষ্ট্রের কাছেও আছে, সমাজের কাছেও আছে। কারণ একজন মানুষ যখন নিজের দুর্বলতার কাছে হার মেনে শাস্তি নয়, মুক্তি খুঁজতে রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়েন, তখন সেই কড়া নাড়ার শব্দ আসলে একজন ব্যক্তির নয়—এটি হাজারো মাদকাসক্ত মানুষের নীরব আর্তনাদ, যারা শাস্তির আগে একটি সুযোগ চায়, চিকিৎসার সুযোগ, সুস্থ হয়ে নতুন করে বেঁচে ওঠার সুযোগ।

মাদকসেবী

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

প্রাথমিকে নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের নিয়ে যা বললেন শিক্ষামন্ত্রী

🕒 প্রকাশ: ০৭:২২ অপরাহ্ন, ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

শেখ হাসিনার বিষয়টি ঢাকা ও দিল্লির ওপর ছেড়ে দিল ওয়াশিংটন, তারেক রহমানের প্রতি আস্থার ইঙ্গিত

🕒 প্রকাশ: ০৭:০৭ অপরাহ্ন, ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘ সফর শেষে দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী

🕒 প্রকাশ: ০৬:২১ অপরাহ্ন, ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

পুলিশ পরিচয়ে ছেলের কণ্ঠ নকল, বাবার কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে গ্রেপ্তার ২

🕒 প্রকাশ: ০৬:১৪ অপরাহ্ন, ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ

🕒 প্রকাশ: ০৬:০৫ অপরাহ্ন, ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

Footer Up 970x250