ফাইল ছবি
কলকাতা থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলাদেশের একটি বহুল আলোচিত হত্যা মামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি দাবি করেছেন, মামলার এক আসামিকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) গ্রেপ্তার করার পর ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে বিষয়টি প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়ে ছিল? সবটাই জানি।’
গতকাল মঙ্গলবার (২ জুন) কলকাতার ধর্মতলায় এক জনসভায় দেওয়া এ বক্তব্যের পর বাংলাদেশেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে হত্যাকাণ্ডের কথা বলেছেন, সেটি কি ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলা—এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে হেরে রাজ্যে মমতার টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। এরপর এটাই ছিল মমতার প্রথম জনসভা। ভারতের কিছু সংবাদমাধ্যম মমতার বক্তৃতা সরাসরি সম্প্রচার করে। ভারতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ক্ষমতাসীন দল বিজেপির নেতা অমিত শাহ। মমতা বক্তৃতায় ‘হোম মিনিস্টার’ (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) শব্দটি বললেও অমিত শাহর নাম উল্লেখ করেননি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার বক্তব্যে সরাসরি শরিফ ওসমান বিন হাদির নাম উচ্চারণ করেননি। তিনি কোনো নির্দিষ্ট মামলার নামও উল্লেখ করেননি। ফলে তিনি ঠিক কোন হত্যাকাণ্ডের কথা বলেছেন, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে তার বক্তব্যে উল্লেখ করা কয়েকটি ঘটনার সঙ্গে শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার বিভিন্ন তথ্যের মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।
ধর্মতলার জনসভায় মমতা বলেন, বাংলাদেশের এক ‘বড় খুনি’ মেঘালয় হয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছিল। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এসটিএফ তাকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল। এরপর ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে ফোন করে বিষয়টি প্রকাশ না করতে অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, ‘আমি এখনো নামটা বলছি না ভদ্রতা করে। বাংলাদেশের লোক উত্তাল হয়ে যাবে, আমি সেটা চাই না।’
বক্তৃতার একপর্যায়ে উপস্থিত সমর্থকেরা তাকে নাম প্রকাশ করার আহ্বান জানালে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। বরং বলেন, ‘না, বলব না দেশের স্বার্থে।’ এরপরই তিনি মন্তব্য করেন, ‘কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়ে ছিল? আজ গভর্নমেন্ট পরিবর্তন হলেও মনে রাখবেন আমি তো সবটাই জানি।’
মমতার এ বক্তব্যের পরপরই আলোচনায় আসে শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলা। কারণ, চলতি বছরের মার্চে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এসটিএফ বাংলাদেশে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান দুই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছিল। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল এবং আলমগীর হোসেন নামে দুই বাংলাদেশি নাগরিককে বনগাঁ সীমান্ত এলাকা থেকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের অভিযোগ আনা হয়েছিল।
পরে ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই অভিযুক্ত শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে তদন্তকারীদের কাছে তথ্য ছিল। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের পর তারা মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন।
এই জায়গাতেই মমতার বক্তব্যের সঙ্গে হাদি হত্যা মামলার কিছু সাদৃশ্য দেখা যায়। মমতা তার বক্তব্যে যে ব্যক্তির কথা বলেছেন, তিনি মেঘালয় হয়ে পশ্চিমবঙ্গে এসেছিলেন এবং তাকে এসটিএফ গ্রেপ্তার করেছিল। হাদি হত্যা মামলার ক্ষেত্রেও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য ও সংবাদ প্রতিবেদনে একই ধরনের বর্ণনা উঠে এসেছে। তবে মমতা নিজে কোথাও হাদির নাম বলেননি। ফলে তিনি এই মামলার কথাই বলেছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ এখনো নেই।
দেশে আলোচিত এই মামলার সূত্রপাত হয় গত বছরের ১২ ডিসেম্বর। সেদিন রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোড এলাকায় রিকশাযোগে যাওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হন ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান বিন হাদি। হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে এসে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় বলে অভিযোগ। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকায় চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে সেখানে তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর তদন্তে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিভিন্ন সময়ে তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকে ফয়সাল করিম মাসুদকে মামলার প্রধান আসামি ও সন্দেহভাজন শুটার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মার্চ মাসে ভারতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে আদালতে হাজির করার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
ভারতে গ্রেপ্তারের পর বাংলাদেশ সরকার অভিযুক্তদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়। পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর মাধ্যমে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় তাদের প্রত্যর্পণের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
এদিকে মামলাটির তদন্ত এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। অধিকতর তদন্তের জন্য একাধিকবার সময় নেওয়া হয়েছে। আদালতে জমা দেওয়ার কথা থাকা তদন্ত প্রতিবেদনও কয়েক দফা পিছিয়েছে। মামলায় ৭৭ জনকে সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য নতুন করে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এনেছে। তিনি যদি সত্যিই শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার কথাই বলে থাকেন, তাহলে তার ‘কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন’ মন্তব্যের অর্থ কী? তিনি কার দিকে ইঙ্গিত করেছেন? তার কাছে থাকা তথ্য কী ধরনের? আর কেনই বা তিনি নাম প্রকাশ করছেন না?
তবে এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। মমতা নিজে কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করেননি। একইভাবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকেও তার বক্তব্যের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার বক্তৃতায় শরিফ ওসমান বিন হাদির নাম উচ্চারণ করেননি। কিন্তু তিনি যে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন, তার সঙ্গে হাদি হত্যা মামলার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মিল রয়েছে। সেই মিল থেকেই বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনা জোরালো হয়েছে। তবে মমতার বক্তব্যের লক্ষ্যবস্তু যে হাদি হত্যাকাণ্ডই ছিল, সেটি এখনো প্রমাণিত বা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত নয়।
খবরটি শেয়ার করুন