ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
চট্টগ্রাম নগরের দুই নম্বর গেট এলাকার একটি হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ড—যেখানে ‘উল্লাস’ আর সংগীতের আবহেই এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে—দেড় বছর তদন্ত শেষে সেই ঘটনার চিত্র উঠে এসেছে পুলিশের অভিযোগপত্রে। ছিনতাইকারী সন্দেহে শাহাদাত হোসেন নামের ওই যুবককে বেঁধে রেখে নেচেগেয়ে মারধর করা হয়। পরে তার নিথর দেহ অটোরিকশায় করে আধা কিলোমিটার দূরে নালার পাশে ফেলে রাখা হয়।
গত ৮ এপ্রিল পাঁচলাইশ থানা-পুলিশ চট্টগ্রাম আদালতে এ ঘটনায় অভিযোগপত্র জমা দেয়। এতে এক কিশোরসহ পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন ফরহাদ আহমেদ চৌধুরী (৪৩), আনিসুর রহমান (২০), মেহেদী হাসান (২৭) ও মো. মাজেদ (২২)। ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরের বিরুদ্ধে আলাদা দোষীপত্র দেওয়া হয়েছে।
নিহত শাহাদাত হোসেনের বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার পাঁচবাড়িয়া ইউনিয়নের নদনা গ্রামে। তিনি চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানার বিআরটিসি এলাকায় বয়লার কলোনিতে বসবাস করতেন এবং ফলমণ্ডির একটি দোকানে কাজ করতেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের একটি মামলা ছিল।
২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট দুপুরে তিনি কর্মস্থলের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হন। সন্ধ্যায় স্ত্রীর সঙ্গে তার শেষবার কথা হয়। এরপর গভীর রাত পর্যন্ত বাসায় না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
পরদিন, ১৪ আগস্ট পাঁচলাইশের প্রবর্তক মোড় এলাকায় নালার পাশ থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবি দেখে তার বাবা মো. হারুন লাশটি শনাক্ত করেন। এরপর অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পাঁচলাইশ থানায় মামলা দায়ের করা হয়।
তদন্তে উঠে এসেছে, শাহাদাতকে স্টিলের পাইপে হাত বেঁধে রাখা হয়েছিল। তাকে ঘিরে কয়েকজন তরুণ গান গাইছিলেন, কেউ বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। আর সেই ‘উৎসবমুখর’ পরিবেশেই চলছিল বেধড়ক মারধর।
ঘটনার প্রায় এক মাস পর, ২১ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দেখা যায়, কয়েকজন তরুণ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান গাইছেন, কেউ বাঁশি বাজাচ্ছেন, আর মাঝখানে বাঁধা অবস্থায় এক যুবককে পেটানো হচ্ছে। ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং জনমনে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।
ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার চার দিনের মাথায় পুলিশ ফরহাদ আহমেদ চৌধুরী, আনিসুর রহমান এবং এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করে। পরে ওই কিশোর আদালতে জবানবন্দি দিয়ে ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে। সে জানায়, ১৫ থেকে ২০ জন মিলে ছিনতাইকারী সন্দেহে ওই যুবককে মারধর করে এবং একপর্যায়ে সে নিজেও এতে অংশ নেয়।
অভিযোগপত্রে ২০ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন খিচুড়ি বিক্রেতা মীর নাজমুল হোসেন, যিনি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর রাস্তায় পুলিশের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছিল।
১৩ আগস্ট রাত ১১টার দিকে দুই নম্বর গেট এলাকায় শাহাদাতকে ট্রাফিক সিগন্যালের সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয় বলে তিনি জানান। তার ভাষায়, ঘটনাটি ছিল প্রকাশ্য এবং অনেকের সামনেই সংঘটিত।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পাঁচলাইশ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এস এম সফিউল আজম মুন্সী বলেন, ভিডিও ফুটেজ এবং জবানবন্দির ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, ছিনতাইকারী সন্দেহে শাহাদাতকে নেচেগেয়ে মারধর করা হয়। পরে তার লাশ অন্যত্র ফেলে রাখা হয়।
তিনি আরও জানান, সোহান ও আসিফ উল মেজবাহ নামের আরও দুজনকে শনাক্ত করা গেলেও তাদের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা না পাওয়ায় অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি। ঠিকানা পাওয়া গেলে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই এই ঘটনাকে ‘মানবিকতার চরম অবক্ষয়’ বলে উল্লেখ করেছেন।
ফেসবুকে একজন ব্যবহারকারী লেখেন, “একজন মানুষকে পিটিয়ে মারছে, আর পাশে দাঁড়িয়ে গান গাইছে—এটা কীভাবে সম্ভব? আমরা কি এতটাই অসংবেদনশীল হয়ে গেছি?” আরেকজন মন্তব্য করেন, “আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই সংস্কৃতি বন্ধ না হলে সমাজে নৈরাজ্য বাড়বে।”
অনেকে আবার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এমন ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ‘মব জাস্টিস’ আরও বাড়তে পারে।
নিহত শাহাদাতের বাবা মো. হারুন, যিনি একজন দিনমজুর, ছেলের হত্যার বিচার দাবি করেছেন। তিনি বলেন, “আমার ছেলেকে যারা পিটিয়ে হত্যা করেছে, তাদের বিচার চাই। আমি দিনমজুর, আমার ছেলেও দিনমজুর ছিল। কী অপরাধে তাকে এমনভাবে মারা হলো? এমন ঘটনা যেন আর কোনো পরিবারের সঙ্গে না ঘটে।”
ঘটনাটি আবারও জননিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে ‘ছিনতাইকারী সন্দেহে’ কাউকে প্রকাশ্যে বেঁধে পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনা সমাজে এক ধরনের ‘মব জাস্টিস’ সংস্কৃতির ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তাদের মতে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উপস্থিতি ও দ্রুত হস্তক্ষেপ না থাকলে সাধারণ মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে, যা শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।
চট্টগ্রামের এই ঘটনা তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, আইনের শাসনের দুর্বলতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সংকটকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, বিচারিক প্রক্রিয়ায় এই ঘটনার কী পরিণতি হয় এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন