ফাইল ছবি
দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একসময় রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা দলটি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তাদের কর্মকাণ্ডে ভিন্ন এক প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে হঠাৎ করেই দলটির নেতা-কর্মীদের প্রকাশ্য উপস্থিতি, ঝটিকা মিছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত প্রচারণা এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সক্রিয় বার্তা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্নটি হলো—আওয়ামী লীগ কি আবারও সক্রিয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বিচ্ছিন্ন নয়; বরং সুপরিকল্পিত পুনর্গঠনের অংশ। দলটির সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের বাইরে অবস্থান করলেও সংগঠনের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ অটুট রয়েছে। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, তিনি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম পুনরায় সচল করার জন্য নির্দেশনা দিচ্ছেন।
গত কয়েক সপ্তাহে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, কুমিল্লা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ছোট ছোট মিছিল ও সমাবেশের খবর গণমাধ্যমে এসেছে। এসব কর্মসূচির বেশির ভাগই ছিল আকস্মিক এবং স্বল্প সময়ের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে দ্রুত কর্মসূচি শেষ করার প্রবণতা দেখা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে ছাত্রলীগ, যুবলীগ কিংবা সহযোগী সংগঠনের সাবেক নেতারাই এসব উদ্যোগে সামনে ছিলেন।
দলটির ভেতরের একাধিক সূত্রের ভাষ্য, এখনই বড় ধরনের কর্মসূচিতে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে চায় না আওয়ামী লীগ। বরং মাঠে নিজেদের উপস্থিতি রয়েছে—এই বার্তাটি কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে পৌঁছে দেওয়াই তাদের প্রধান লক্ষ্য। দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থাকা অনেক নেতা-কর্মীও ধীরে ধীরে সক্রিয় হওয়ার সাহস পাচ্ছেন।
তবে আওয়ামী লীগের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় সংঘটিত প্রাণহানি ও সহিংসতার দায় নিয়ে তাদের অবস্থান। আন্দোলনের সময় নিহতদের পরিবার, মানবাধিকার সংগঠন এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে দায় স্বীকার বা আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু দলটির শীর্ষপর্যায়ে এ বিষয়ে এখনো ভিন্ন ধরনের চিন্তা বিদ্যমান।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মনে করেন, ঘটনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ সত্য এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাদের বক্তব্য, আন্দোলনের সময় যে সহিংসতা ঘটেছে, তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। সেই তদন্তে যাদের দায় প্রমাণ হবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। দলটির অভ্যন্তরীণ আলোচনায় তাই ক্ষমা প্রার্থনার চেয়ে আন্তর্জাতিক মানের তদন্তের দাবি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এখানেই আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সংকট। একদিকে দলটি অতীতের বিতর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, অন্যদিকে দায় স্বীকারমূলক কোনো অবস্থান নিতে অনীহা দেখাচ্ছে। ফলে জনমতের একটি বড় অংশকে পুনরায় নিজেদের দিকে টানতে গেলে তাদের সামনে কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতা অপেক্ষা করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাদেকা হালিম সম্প্রতি এক আলোচনায় বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের পুনরুত্থানের জন্য কেবল সাংগঠনিক শক্তি যথেষ্ট নয়। জনগণের আস্থা পুনর্গঠন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতীতের বিতর্কিত অধ্যায়গুলো নিয়ে জনগণের প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না দিলে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সমর্থক মহলে ভিন্ন ধরনের মনোভাবও দেখা যাচ্ছে। তাদের অনেকের মতে, গত দুই বছরে দলটি একতরফাভাবে অভিযুক্ত হয়েছে এবং নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পায়নি। ফলে তারা মনে করেন, আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা রাজনৈতিকভাবে আত্মসমর্পণের সমতুল্য হতে পারে।
দলটির অভ্যন্তরে এখন আরেকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে—শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে প্রত্যাবর্তন। আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, দেশে ফিরে আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তিনি গুরুত্বসহকারে ভাবছেন। এ নিয়ে দলের তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলে আলোচিত একটি বিষয় হলো, দেশে ফেরার ক্ষেত্রে তিনি ভ্রমণসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে পারেন। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা নেই, তবু সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে নানা আলোচনা চলছে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের একটি অংশ মনে করছেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার উদ্যোগ দলটির সাংগঠনিক মনোবল অনেকটাই বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে দেশে ফেরা যতটা না রাজনৈতিক, তার চেয়ে বেশি আইনি ও কূটনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ ক্ষমতা হারানোর পর তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ, তদন্ত ও মামলা সামনে এসেছে। ফলে দেশে ফিরলেই তাকে একটি জটিল আইনি বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।
আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। ক্ষমতা হারানোর পর দলটির বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আগে যেসব আন্তর্জাতিক মহল আওয়ামী লীগের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত, তাদের অনেকেই এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। ফলে নতুন বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে সক্রিয় কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে দলটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, দেশের রাজনীতিতে কোনো বড় দল দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকে না। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি এখনো দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যমান। ফলে দলটির পুনরায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা অস্বাভাবিক নয়। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা এবং জনমতের চাপ মোকাবিলা করতে না পারলে শুধু সংগঠন দিয়ে রাজনৈতিক সাফল্য অর্জন সম্ভব হবে না।
এদিকে আওয়ামী লীগের ভেতরে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্নটিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ক্ষমতা হারানোর পর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ায় বিভিন্ন এলাকায় বিভক্তি, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মনে করছেন, এসব সমস্যার সমাধান না করলে পুনরুত্থানের প্রচেষ্টা সফল হবে না। সে কারণে বিভিন্ন পর্যায়ে সাংগঠনিক মূল্যায়ন এবং বিতর্কিত নেতাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও আলোচিত হচ্ছে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ মোকাবিলা করতে হবে, অন্যদিকে কর্মী-সমর্থকদের সক্রিয় রাখতে হবে। একই সঙ্গে জনগণের কাছে নিজেদের রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে ব্যাখ্যা করতে হবে।
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগ একাধিকবার সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭৫-পরবর্তী সময়, ২০০১ সালের নির্বাচনের পর কিংবা ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার সময়ও দলটি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেক বিশ্লেষক ভিন্ন ধরনের সংকট হিসেবে দেখছেন। কারণ এবার প্রশ্ন উঠেছে শুধু সংগঠনের নয়, বরং রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতারও।
ফলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নতুন করে মাঠে ফেরার প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর—দলটি অতীতের বিতর্ক মোকাবিলায় কী অবস্থান নেয়, জনমতের সঙ্গে কতটা সংযোগ স্থাপন করতে পারে, আইনি চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে সামলায় এবং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ কোন দিকে এগোয়।
এ মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা না গেলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—আওয়ামী লীগ আবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে ফিরে এসেছে। আর সেই প্রত্যাবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন শেখ হাসিনা। দেশের রাজনৈতিক সমীকরণ আগামী মাসগুলোতে যেদিকেই যাক না কেন, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক ও আলোচনা আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
খবরটি শেয়ার করুন