ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামের নারীদের পোশাক, চলাফেরা ও পর্দা নিয়ে দেওয়া একটি পুরোনো বক্তব্যের ভিডিও নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি ঘিরে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। বিশেষ করে তার ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরই পুরোনো এই বক্তব্য নতুন করে সামনে এনে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলছেন।
কেউ তার বক্তব্যের সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের সামঞ্জস্য নিয়ে সমালোচনা করছেন, আবার কেউ বলছেন, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত হওয়া উচিত।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে গাজী নজরুল ইসলামকে বলতে শোনা যায়, “মেয়েরা শালীনভাবে চলবে। মাথার যে কাপড়টা, একটা পর্দা মাথার ওপরে রাখবে। আমরা চাই মেয়েরা শালীনভাবে চলুক। যাতে করে তাদের শরীরটা বাইরে বের না হয়।”
একই বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, “মেয়েরা সব কাজ করতে পারবে। তবে মেয়েরা একটু দূরে গেলে রক্তের সম্পর্কের কাউকে অবশ্যই সঙ্গে রাখতে হবে। একা চলাটা ঠিকও না। রক্তের সম্পর্কের পুরুষ হলে ভালো, তবে মেয়ে হলেও সমস্যা নেই।”
বক্তব্যটি কবে এবং কোন অনুষ্ঠানে দেওয়া হয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ভিডিওটি আগে থেকেই অনলাইনে ছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। গতকাল সোমবার রাত থেকে এমপি নজরুল ইসলামকে ঘিরে বিতর্ক শুরু হওয়ার পর এটি নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
সোমবার রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজী নজরুল ইসলামের ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ একটি ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে একটি কক্ষে এক তরুণীর সঙ্গে তাকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায়। ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এর পরপরই অনেক ব্যবহারকারী তার অতীতের বিভিন্ন বক্তব্য খুঁজে বের করে নতুন করে প্রচার করতে থাকেন। নারীদের শালীনতা, পর্দা এবং চলাফেরা নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের ভিডিওটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আজিজুর রহমান বলেন, তাদের ধারণা অনুযায়ী ভিডিওটি ঢাকার একটি বাসার সিসিটিভি ফুটেজ থেকে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে তার এই দাবি সুখবর ডটকমের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওতে থাকা তরুণীর বয়স নিয়েও নানা ধরনের দাবি করা হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, তরুণীর বয়স এমপি নজরুল ইসলামের নাতনির চেয়েও কম। আবার অনেকে দাবি করছেন, তার বয়স এখনো ১৮ বছর পূর্ণ হয়নি। তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য দেয়নি।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে মঙ্গলবার সকালে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সুখবর ডটকমকে বলেন, পরে এ বিষয়ে বক্তব্য দেবেন। এরপর কয়েকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি আর ফোন ধরেননি।
মঙ্গলবার দুপুর ১২টা ১ মিনিটে নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়ে ভাইরাল ভিডিও সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন তিনি। ফেসবুক পোস্টে নজরুল ইসলাম দাবি করেন, গত ১৩ জুলাই তিনি তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম এবং দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়াম বেগমকে নিয়ে রাজধানীর মগবাজারে যান। সেখানে তার দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা মো. মাসুম বিল্লাহর ব্যবসায়িক অফিসে তারা প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা অবস্থান করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় তার গাড়িচালক এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ গাড়ি দেখার কথা বলে বাইরে যান। পরে তিনি ৫ থেকে ৭ জন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে অফিসে প্রবেশ করেন। তাদের জিম্মি করে এক লাখ টাকা আদায় করা হয় বলেও অভিযোগ করেন এমপি।
নজরুল ইসলাম আরও দাবি করেন, তিনি যে ভাড়া করা গাড়ি ব্যবহার করতেন, সেটিও পরে আটকে রেখে কয়েক দফায় আরও টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। তার অভিযোগ, দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর পূর্বশত্রুতা ও পারিবারিক বিরোধের জের ধরে পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
ফেসবুক পোস্টে এমপি লিখেছেন, ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে তার এবং তার স্ত্রীর ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভিডিওটিকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত ১৭ জুন পারিবারিকভাবে এবং তার প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে মাসুম বিল্লাহর বাসভবনে মরিয়াম বেগমের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। যারা তার সামাজিক মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নৈতিক চরিত্র ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে অপপ্রচার চালাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ভিডিও দুটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ফেসবুক ব্যবহারকারী আরিফুল ইসলাম রনি লিখেছেন, “জনপ্রতিনিধিদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা নয়, কিন্তু যারা অন্যের জীবনযাপন নিয়ে নিয়ম-কানুন শোনান, তাদের নিজের আচরণও একই মানদণ্ডে বিচার হবে—এটাই স্বাভাবিক।”
সাবিহা রহমান নামের একজন লেখেন, “নারীদের পোশাক নিয়ে উপদেশ দেওয়া খুব সহজ। কিন্তু সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিজের আচরণে নৈতিকতার উদাহরণ তৈরি করা।” মো. রাশেদুল করিম মন্তব্য করেন, “ভিডিওটি সত্য-মিথ্যা তদন্ত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে। সামাজিক মাধ্যমে বিচার নয়, আইনি তদন্তই হওয়া উচিত।”
অন্যদিকে নুসরাত জাহান মেঘলা লেখেন, “ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনও গুরুতর অপরাধ। যদি এমপির অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে যারা ভিডিও ধারণ ও ছড়িয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।” তানভীর আহমেদ নামে আরেকজন মন্তব্য করেন, “মানুষ এখন শুধু বক্তব্য নয়, বক্তার ব্যক্তিগত জীবনও যাচাই করে। তাই জনপরিসরে দেওয়া প্রতিটি বক্তব্যের সঙ্গে ব্যক্তিগত আচরণের সামঞ্জস্য থাকা জরুরি।”
ভিডিও দুটি ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ এমপির বক্তব্যের সমালোচনা করছেন, আবার কেউ ভিডিও প্রকাশের পেছনে ষড়যন্ত্রের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানাচ্ছেন।
খবরটি শেয়ার করুন