সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** আশুলিয়ায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে যেভাবে ছড়াল আগুন *** আশুলিয়ায় কাভার্ড ভ্যান থেকে ৬ লাশ উদ্ধার *** জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রথম স্ত্রীসহ থানায় এমপি নজরুল *** সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে বাড়ল ২০ টাকা *** কমলাপুর রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে আগুন *** শিল্পকলা একাডেমির সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, পল্লবীতে বাসে আগুন *** ন্যাম ভবন থেকে সাতক্ষীরার এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার *** সমালোচনার মুখে হাফেজদের উপহার দেওয়া সেই বই ফেরত নিলেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী *** অপ্রতিমের মা ড. নাহিদার চব্বিশের সেই ফেসবুক পোস্ট কেন আলোচনায়, কী লিখেছিলেন তিনি *** পাকিস্তান কি সৌদি আরবকে রক্ষা করতে যুদ্ধে জড়াবে

জুলাই–আগস্টে ভুয়া শহীদ দেখিয়ে মামলাকারীরা এবার উল্টো ফাঁসছেন

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ১২:৩১ অপরাহ্ন, ১৯শে জুলাই ২০২৬

#

ফাইল ছবি

২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের রাজনৈতিক সহিংসতা ও আন্দোলনকে ঘিরে দায়ের হওয়া শত শত হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও আহত হওয়ার মামলার উল্লেখযোগ্য একটি অংশে ভয়াবহ অসংগতি ও জালিয়াতির প্রমাণ মিলছে। পুলিশের বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা, পিবিআই, সিআইডি এবং বিশেষ তদন্ত ইউনিটের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—কোথাও জীবিত ব্যক্তিকে নিহত দেখানো হয়েছে, কোথাও বহু আগে মারা যাওয়া ব্যক্তিকে আন্দোলনে নিহত দাবি করা হয়েছে, আবার কোথাও দুর্ঘটনা, পারিবারিক বিরোধ বা সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘটনায় নিহত ব্যক্তিকে ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবে দেখিয়ে মামলা করা হয়েছে।

তদন্তে এমনও প্রমাণ মিলেছে যে, কিছু মামলা দায়েরের পর আসামিদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের চেষ্টা হয়েছে। এসব ঘটনায় এখন উল্টো বাদীদের বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, এ পর্যন্ত অন্তত ১২৫টি মামলায় মিথ্যা তথ্য, জাল কাগজপত্র বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। আরও বহু মামলা যাচাই-বাছাই চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং সংশ্লিষ্ট আদালতেও এসব তদন্ত প্রতিবেদন পাঠানো হচ্ছে।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায়। রোজভিউ হোটেলের ব্যবস্থাপক রাহাত হাসান বিপু ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট গণপিটুনিতে আহত হয়ে মারা যান। পরে তার স্ত্রী রুবিনা আক্তার যাত্রাবাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় দাবি করা হয়, তিনি জুলাই আন্দোলনের সময় নিহত হয়েছেন। এতে দেড় শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, ওই দিন সকালে সায়েদাবাদ এলাকায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে তিনজনকে গণধোলাই দেওয়া হয়েছিল। রাহাত ছিলেন সেই তিনজনের একজন।

অর্থাৎ তার মৃত্যুর সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। তদন্তে আরও উঠে আসে, মামলার আসামিদের তালিকা থেকে কয়েকজনের নাম বাদ দিতে আদালতে পৃথক আবেদনও করা হয়েছিল। তদন্তকারীদের ধারণা, এর পেছনে অর্থ লেনদেনের বিষয় থাকতে পারে।

একই ধরনের ঘটনা নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারেও। দুস্তারা ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি বাবুল মিয়া মারা যান ২০২৩ সালে। কিন্তু তাকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট আন্দোলনে নিহত দেখিয়ে হত্যা মামলা করা হয়। মামলায় ১৩১ জনকে আসামি করা হয়। তদন্তে পুলিশ নিশ্চিত হয়, যাকে কেন্দ্র করে মামলা, তিনি আন্দোলনের অনেক আগেই মারা গেছেন। ফলে মামলাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়।

রাজধানীর উত্তর-পূর্ব থানা এলাকায় আরও বিস্ময়কর একটি ঘটনা সামনে আসে। জানে আলম নামে এক ব্যক্তিকে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়েছে—এমন অভিযোগ এনে আদালতে হত্যা মামলার আবেদন করা হয়। শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, যাকে নিহত বলা হয়েছে তিনি জীবিত এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন।

তদন্তকারীরা বলেন, একটি সংঘবদ্ধ চক্র মামলার এজাহারের কপি আসামিদের মোবাইলে পাঠিয়ে টাকা দাবি করত। কেউ টাকা দিলে তার নাম বাদ দেওয়ার জন্য আদালতে হলফনামাও জমা দেওয়া হতো। যদিও আদালত এসব আবেদন গ্রহণ করেননি।

আশুলিয়ার একটি মামলায় দেখা যায়, অজ্ঞাত একজনকে ভুয়া নাম, ঠিকানা ও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ‘জুলাই শহীদ’ বানানো হয়েছে। তদন্তে বাদীরও কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে এই মামলাতেও আসামিদের নাম বাদ দেওয়ার জন্য একাধিক হলফনামা আদালতে জমা পড়ে। তদন্তে অর্থ লেনদেনের তথ্যও পাওয়া যায়।

শুধু হত্যার ঘটনাই নয়, তদন্তে আরও বেরিয়ে এসেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা, পারিবারিক মারামারি, অগ্নিদগ্ধ হওয়া, এমনকি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিরোধের ঘটনাকেও জুলাই আন্দোলনের সহিংসতা হিসেবে দেখিয়ে মামলা করা হয়েছে।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) একটি তদন্তে দেখা গেছে, পাওনা টাকা আদায়ের বিরোধকে রাজনৈতিক মামলার রূপ দেওয়া হয়েছে। আরেকটি ঘটনায় স্ত্রী তালাক দেওয়ায় ক্ষুব্ধ এক ব্যক্তি নিজের ছেলেকে দিয়ে সাবেক স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে ফাঁসাতে জুলাই আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট মামলা করান। তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।

মূলধারার বিভিন্ন গণমাধ্যমেও গত কয়েক মাসে এমন একাধিক ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন জেলায় আন্দোলনের ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়—এমন ব্যক্তিদেরও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে আসামি করা হয়েছে। কোথাও বিদেশে অবস্থানকারী ব্যক্তিকে ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত দেখানো হয়েছে। কোথাও বহু বছর আগে মারা যাওয়া ব্যক্তির নাম এজাহারে এসেছে। আবার কোথাও একই ব্যক্তিকে একাধিক জেলার একাধিক হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে, যদিও অভিযোগের সময় তিনি অন্যত্র অবস্থান করছিলেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিকভাবে চার ধরনের উদ্দেশ্য এসব ভুয়া মামলার পেছনে কাজ করেছে। প্রথমত, চাঁদাবাজি ও অর্থ আদায়। তদন্তে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো মামলা করে আসামিদের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়। এজাহারের কপি পাঠিয়ে মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা দাবি করা হয়েছে। কোথাও কোথাও সেই টাকা লেনদেনের তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি। স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আসামি করে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।

তৃতীয়ত, ব্যক্তিগত বিরোধ নিষ্পত্তি। জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, পারিবারিক কলহ, দেনাপাওনা কিংবা বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনাকেও রাজনৈতিক সহিংসতার মামলায় যুক্ত করার নজির মিলেছে।

চতুর্থত, ক্ষতিপূরণ বা বিশেষ সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, কোথাও কোথাও আন্দোলনে শহীদ বা আহত হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া গেলে সম্ভাব্য সরকারি সুবিধা বা সামাজিক সহানুভূতি পাওয়ার আশাও কাজ করেছে।

তদন্তকারী এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুখবর ডটকমকে বলেন, অনেক মামলায় ভিকটিম, বাদী, ঘটনার স্থান—সবকিছুই মিথ্যা। কিছু ক্ষেত্রে যিনি বাদী হিসেবে পরিচিত, তিনি পরে দাবি করেছেন, তিনি মামলা করেছেনই না। আবার কোথাও প্রকৃত বাদীর পরিচয়ই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আল নোমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট থেকে পাওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে ভুয়া বাদীর তথ্য এসেছে। সব জেলার পুলিশ সুপার এবং তদন্ত সংস্থাগুলোকে এ ধরনের মামলার তথ্য পাঠাতে বলা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে ভুয়া মামলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুয়া মামলা শুধু নিরপরাধ মানুষকে হয়রানিই করে না, প্রকৃত ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথও কঠিন করে তোলে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা বলছেন, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় মিথ্যা তথ্য দিয়ে মামলা করা নিজেই একটি গুরুতর অপরাধ। এ ধরনের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ভবিষ্যতেও একই প্রবণতা অব্যাহত থাকবে।

সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বিভিন্ন সময় বলেছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে নির্দোষ ব্যক্তিকে হয়রানি করা যাবে না। তিনি মনে করেন, প্রতিটি অভিযোগের সঙ্গে ডিজিটাল প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং ফরেনসিক তথ্য মিলিয়ে দেখা উচিত।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক সুখবর ডটকমকে বলেন, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দায়ের হওয়া মামলার ক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভুয়া মামলা শনাক্ত হওয়ার পর শুধু চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিলেই হবে না; যিনি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন, তাকেও বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, জুলাই–আগস্টের সহিংসতায় প্রকৃত নিহত ও আহত ব্যক্তিদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু সেই ট্র্যাজেডিকে ব্যবহার করে কেউ যদি ব্যক্তিগত লাভ, রাজনৈতিক প্রতিশোধ বা চাঁদাবাজির হাতিয়ার হিসেবে মামলা ব্যবহার করে, তাহলে তা প্রকৃত ভুক্তভোগীদের প্রতি অন্যায়। একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া ভুয়া মামলাগুলোর বাইরে আরও অনেক মামলা পুনঃতদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। যেসব মামলায় জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখানো হয়েছে, ভুয়া বাদী ব্যবহার করা হয়েছে, অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে নিরপরাধ ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে পৃথক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি মিথ্যা মামলা দায়েরকারীদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা না গেলে ভবিষ্যতে যে কোনো বড় রাজনৈতিক বা সামাজিক সংকটকে কেন্দ্র করে একই ধরনের অপব্যবহার আবারও ঘটতে পারে। তাই জুলাই–আগস্টের সহিংসতার বিচার যেমন জরুরি, তেমনি সেই ঘটনাকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা ভুয়া মামলা ও চাঁদাবাজির চক্র ভেঙে দেওয়াও এখন বিচারব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

জুলাই–আগস্টে ভুয়া শহীদ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250