সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৬ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** চার এসপিকে বদলি-পদায়ন *** এমপি নজরুলের গ্রেপ্তারে স্পিকারকে চিঠি দিচ্ছে পুলিশ, দ্বিতীয় স্ত্রীর চিরকুটের তদন্ত চলছে *** বাড়ছে হুতিদের হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির মুখে ইরানের হুঁশিয়ারি *** জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের পথে প্রধানমন্ত্রী *** সাগরে শক্তিশালী হচ্ছে লঘুচাপ, ৬ অঞ্চলে ৬০ কিমি ঝড়ের আভাস *** আশুলিয়ায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে যেভাবে ছড়াল আগুন *** আশুলিয়ায় কাভার্ড ভ্যান থেকে ৬ লাশ উদ্ধার *** জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রথম স্ত্রীসহ থানায় এমপি নজরুল *** সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে বাড়ল ২০ টাকা *** কমলাপুর রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে আগুন

সুখবর এক্সপ্লেইনার

‘ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয়’

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০৯:২০ অপরাহ্ন, ৯ই জুন ২০২৬

#

ফাইল ছবি

জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে তীব্র বিতর্কের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে সরাসরি রাজনৈতিক আক্রমণ শানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ‘ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয়।’ তার এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে উত্তপ্ত আলোচনা হয়। একই সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা, ব্যবস্থাপনা, ঋণ বিতরণ, নিয়োগ ও পদোন্নতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তদন্তের ঘোষণা দেন তিনি।

আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধি অনুযায়ী ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবি জানিয়ে একটি নোটিশ আনেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। ওই নোটিশের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করেন।

সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন বলা হচ্ছে আপনারা ব্যাংকের মালিক না। জামায়াতে ইসলাম ব্যাংকের মালিক না। আবার বলছে ইসলামের ওপর হাত দেবেন না। ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামও ইসলাম নয়।’ তিনি আরও বলেন, একসময় ধর্মীয় আবহ তৈরি করে যে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছিল, এখন সেই নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কায় একটি মহল অস্থির হয়ে উঠেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও। তিনি দাবি করেন, আরডিএস প্রকল্পের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিতরণ করা হয়েছে এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নির্বাচনী উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত ১১ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়। নাবিল গ্রুপকে ৭০০ কোটি টাকার ঋণ দেওয়ার পর সেই অর্থ যথাযথভাবে ফেরত না আসার অভিযোগও তোলেন তিনি। একই সঙ্গে একটি গ্রুপকে প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন ছাড়াই ৪০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার কথাও জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগের আরেকটি বড় অংশ ছিল ব্যাংকের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের পর প্রায় ৯ হাজার কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয় এবং নতুন করে ৬ হাজার নিয়োগ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ১৩ হাজার পদোন্নতি দেওয়া হয়, যার অনেকগুলো নিয়মবহির্ভূত ছিল বলে তিনি দাবি করেন। এসব বিষয়ে তদন্তের আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, অনিয়মের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ইসলামী ব্যাংক ও জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্কের প্রশ্ন। দীর্ঘদিন ধরেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে যে, ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে জামায়াতপন্থী ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, শেয়ার মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় জামায়াতঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের প্রভাব নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যদিও দলটির নেতারা বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

রাজনীতিতে জামায়াতের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়। দলটির শিকড় পাকিস্তান আমলের জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত। স্বাধীনতার আগে পূর্ব পাকিস্তানে দলটি পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নেয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের তৎকালীন শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করার অভিযোগ ওঠে। স্বাধীনতার পর দলটির রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলেও পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তারা আবার সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করে।

মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াতের একাধিক শীর্ষ নেতা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি হন। দলটির সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং পরে সেই রায় কার্যকর হয়। দেশের সর্বোচ্চ আদালত তার বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছিলেন।

এ ছাড়া জামায়াতের সাবেক নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামান ও নির্বাহী পরিষদের সদস্য আবদুল কাদের মোল্লাসহ একাধিক নেতা যুদ্ধাপরাধ মামলায় দণ্ডিত হন। তাদের কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। এসব বিচারকে কেন্দ্র করে দেশে ব্যাপক রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সহিংসতার ঘটনাও ঘটে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের রাজনীতিতে জামায়াতের সবচেয়ে বড় সংকট হলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ঘিরে বিতর্ক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটির ভূমিকা নিয়ে স্পষ্ট আত্মসমালোচনা বা রাজনৈতিক দায় স্বীকার না করায় জামায়াত এখনও জনমতের একটি বড় অংশের সন্দেহ ও সমালোচনার মুখে রয়েছে। তাদের মতে, দলটি গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে ঐতিহাসিক বিতর্ক থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি।

অন্যদিকে জামায়াতের নেতারা বরাবরই দাবি করে আসছেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল এবং তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের অনেকগুলোই বিতর্কিত। দলটির বর্তমান নেতৃত্ব বলছে, তারা একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে দেশের রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে চায় এবং অতীতের বিতর্কের বাইরে জনগণের সমর্থন অর্জনের চেষ্টা করছে।

সংসদে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, প্রকৃত ও বৈধ শেয়ারহোল্ডারদের কাছে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি দাবি করেন, শেয়ার কেনাবেচা, মালিকানা পরিবর্তন এবং অর্থপাচারের অভিযোগগুলোও তদন্তের আওতায় আনা হবে। বিশেষ করে দেশের বাইরে অর্থ পাচারের অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে তদন্ত হওয়া উচিত বলে মত দেন তিনি।

তার বক্তব্যে উঠে আসে এস আলম গ্রুপের প্রসঙ্গও। তিনি বলেন, অর্থ পাচারের অভিযোগ থাকলে সেসব অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান তুলে ধরে তিনি জানান, বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নতুন করে ইসলামী ব্যাংক ও জামায়াতের সম্পর্কের প্রশ্নকে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকটির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট হয়েছে। তবে বিরোধী দল ও জামায়াতপন্থী মহল এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করছে। ফলে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক আগামী দিনগুলোতেও দেশের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250